দিনের খবর প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

বিনিয়োগকারীর নগদ লভ্যাংশ বেড়েছে আইনের প্রয়োগে

মুস্তাফিজুর রহমান নাহিদ: পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বেশিরভাগ কোম্পানিই বছরের পর বছর বোনাস লভ্যাংশ দিয়ে আসছে। কোনো ধরনের জবাবদিহিতা না থাকায় তারা এ সুযোগ নিয়ে বিনিয়োগকারীদের ঠকিয়ে আসছিল। কিন্তু এ বছর নিয়মের জাঁতাকলে পড়েছে কোম্পানিগুলো।

নতুন নিয়ম অনুযায়ী কোনো কোম্পানি যদি পরপর দুই বছর নগদ লভ্যাংশ না দেয় তাহলে সেই কোম্পানির অবস্থান হবে ‘জেড’ ক্যাটেগরিতে। পাশাপাশি এসব কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদের শাস্তি ভোগ করতে হবে, যার সুবাদে এ বছর নগদ লভ্যাংশ দেওয়ার হার বেড়েছে।

প্রাপ্ত তথ্যমতে, গত এক সপ্তাহে লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে শতাধিক কোম্পানি। এর মধ্যে ৯০ শতাংশের বেশি কোম্পানিই নগদ লভ্যাংশের ঘোষণা দিয়েছে। এর মধ্যে কিছু কোম্পানি নগদের পাশাপাশি বোনাস লভ্যাংশ দিয়েছে। বাকি কোম্পানিগুলো শুধু বোনাস লভ্যাংশ প্রদান করেছে। ক্যাটেগরি ধরে রাখতে হলে এসব কোম্পানিকে আগামী বছর অবশ্যই নগদ লভ্যাংশ দিতে হবে।

সম্প্রতি বিএসইসি থেকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে যে, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোনো কোম্পানি পরপর দুই বছর নগদ লভ্যাংশ দিতে ব্যর্থ হলে সেটি জেড ক্যাটেগরিভুক্ত হবে। এছাড়া ছয় মাস বন্ধ, টানা দুই বছর লোকসান করলে কিংবা পুঞ্জীভূত লোকসান মূলধনকে ছাড়িয়ে গেলেও ওই কোম্পানি জেড ক্যাটেগরিতে যাবে।

বিএসইসি কর্তৃপক্ষ জানায়, প্রতি বছর এজিএম করতে ব্যর্থ হলেও সেটি জেড ক্যাটেগরিভুক্ত হবে। এছাড়া কোম্পানির ব্যবসায়িক বা উৎপাদন কার্যক্রম অন্তত ছয় মাস বন্ধ থাকলে তা এই ক্যাটেগরিতে চলে যাবে। এর বাইরে বিদ্যমান বিধান ভঙ্গ করলে কমিশনের অনুমতি সাপেক্ষে সেটিকে জেড ক্যাটেগরিতে পাঠাতে পারবে স্টক এক্সচেঞ্জ।

অন্যদিকে কোনো কোম্পানি জেড ক্যাটেগরিভুক্ত হওয়ামাত্র সেটির সব উদ্যোক্তা ও পরিচালকের শেয়ার বিক্রি, হস্তান্তর, বন্ধক প্রদানের ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকবে। পাশাপাশি উদ্যোক্তা ও পরিচালকরা তালিকাভুক্ত অন্য কোনো কোম্পানির পরিচালক বা পুঁজিবাজার সংশ্নিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠানের পরিচালক পদে থাকার যোগ্যতা হারাবেন। এসব কোম্পানির পর্ষদ পুনর্গঠন করতে পর্যবেক্ষক নিয়োগ দেওয়া হবে এবং বিশেষ অডিটের ব্যবস্থা করা হবে। পুনর্গঠিত পর্ষদ পরবর্তী চার বছরে কোম্পানিকে লাভজনক পর্যায়ে উন্নীত করতে না পারলে তা তালিকাচ্যুত করবে স্টক এক্সচেঞ্জ।

অন্যদিকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোনো কোম্পানি বোনাস লভ্যাংশ দিতে হলে তার যৌক্তিক কারণ থাকতে হবে। আর সেই কারণটি ব্যাখ্যা করে মূল্য সংবেদনশীল তথ্য আকারে প্রকাশ করতে হবে। বিএসইসির সিদ্ধান্ত অনুসারে কোম্পানির ব্যবসা সম্প্রসারণ, আধুনিকীকরণ গুণগত মান উন্নয়ন প্রভৃতির জন্য বিনিয়োগ প্রয়োজন হলেই শুধু বোনাস দেওয়া যাবে। তবে পরপর দুই বছর শুধু বোনাস শেয়ার দিতে পারবে না। দিলেই কোম্পানিটি ‘জেড’ ক্যাটেগরিতে চলে যাবে।

বিষয়টি নিয়ে আলাপ করলে পুঁজিবাজার বিশ্লেষক অধ্যাপক আবু আহমেদ শেয়ার বিজকে বলেন, কিছু কোম্পানির আছে যারা বছরের পর বছর বোনাস লভ্যাংশ প্রদান করে। এতে তাদের শেয়ার সংখ্যা বেড়ে যায়। ফলে শেয়ারের চাহিদা এবং দর উভয়ই কমে যায়। এতে বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হন। বিশেষ করে দুর্বল কোম্পানিগুলো এই সুবিধা গ্রহণ করে। এসব কোম্পানি থেকে বোনাসের বদলে নগদ লভ্যাংশ পেলে তা বিনিয়োগকারীর জন্য ভালো। বিনিয়োগকারীরা এ ধরনের কোম্পানি থেকে নগদ লভ্যাংশই প্রত্যাশা করেন।

প্রসঙ্গত, লাগামহীনভাবে বোনাস ইস্যুর কারণে পুঁজিবাজারের সাধারণ বিনিয়োগকারীরা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এ অবস্থায় তাদের স্বার্থে বোনাস শেয়ারের রাশ টেনে ধরতে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ ও ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন (ডিবিএ) দীর্ঘদিন থেকে বোনাস শেয়ার প্রদান বন্ধের দাবি জানিয়ে আসছিল। এর প্রেক্ষিতে বিএসইসি এমন সিদ্ধান্ত নেয়।

প্রসঙ্গত, বোনাস শেয়ার হচ্ছে শেয়ারহোল্ডারদের নগদ লভ্যাংশের পরিবর্তে তার বিপরীতে শেয়ার লভ্যাংশ দেওয়া। বোনাস দেওয়া হলে কোম্পানির মোট শেয়ার সংখ্যা বেড়ে যায়। তাই অকারণে বোনাস দেওয়া হলে তাতে কোম্পানির মুনাফা বাড়ে না। উল্টো একই মুনাফা বেশি-সংখ্যক শেয়ারে ভাগ হয় বলে শেয়ারপ্রতি আয় বা ইপিএস কমে যায়। তাতে লভ্যাংশ দেওয়ার সক্ষমতাও আনুপাতিক হারে কমে আসে।

সাধারণত ব্যবসা সম্প্রসারণ, আধুনিকায়ন, বিএমআরই প্রভৃতির জন্য পুনর্বিনিয়োগ প্রয়োজন হলে কোম্পানি নগদ লভ্যাংশ না দিয়ে বোনাস দিয়ে থাকে। কারণ নগদ লভ্যাংশ দেওয়া হলে সংশ্লিষ্ট অর্থ কোম্পানির তহবিল থেকে বের হয়ে যায়। তাতে পুনর্বিনিয়োগের জন্য তহবিলের কিছুটা সংকট দেখা দেয়। কিন্তু বোনাস দিলে ওই অর্থ কোম্পানির তহবিলেই থেকে যায়। তাই পুনর্বিনিয়োগ সহজ হয়। কিছু অসাধু উদ্যোক্তা বিনিয়োগকারীদের ঠকানো ও নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য বোনাস শেয়ার এর সুযোগের অপব্যবহার করে আসছিল।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..