দিনের খবর বাণিজ্য সংবাদ শিল্প-বাণিজ্য

বিনিয়োগ আকর্ষণে কমছে চট্টগ্রামের গুরুত্ব

সাইফুল আলম, চট্টগ্রাম: দেশের প্রধান বাণিজ্যিক শহর চট্টগ্রামে বন্দর সুবিধাসহ সব ধরনের বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ বিরাজ করছে। নেই কোনো ধরনের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও গোলযোগ। চলছে অনেক অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ। এত সম্ভাবনার পরও ২০১৯ সালে চট্টগ্রাম অঞ্চলের দেশি উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ এবং শতভাগ বিদেশি ও যৌথ বিনিয়োগ নিবন্ধনের পরিমাণ আগের বছরের তুলনায় কমেছে এক হাজার ১৪৪ কোটি টাকা। স্থানীয় বিনিয়োগ নিবন্ধনের পরিমাণ কমেছে আগের বছরের তুলনায় এক হাজার ৮০৬ কোটি ৬৩ লাখ টাকা এবং বিদেশি বিনিয়োগ নিবন্ধন কমেছে এক কোটি ১৫ লাখ ৬৭ হাজার টাকা।

বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) সূত্রমতে, সদ্যবিদায়ী বছরে চট্টগ্রাম অঞ্চলে শিল্প, বাণিজ্য ও ট্রেডিং ব্যবসায় বিনিয়োগ করার জন্য দেশি উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ এবং শতভাগ বিদেশি ও যৌথ বিনিয়োগ নিবন্ধনের পরিমাণ ছিল পাঁচ হাজার ১৩০ কোটি টাকা, যা আগের বছরে ছিল ছয় হাজার ২৭৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে কমেছে এক হাজার ১৪৪ কোটি টাকা।

চট্টগ্রাম অঞ্চলে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ২০১৯ সালের স্থানীয় উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগের জন্য ১২০টি প্রকল্পের বিনিয়োগ নিবন্ধন করা হয়। এসব প্রকল্পের বিপরীতে সম্ভাব্য বিনিয়োগের পরিমাণ চার হাজার ৩৯৯ কোটি ৯৪ লাখ ২৫ হাজার টাকা। এতে কর্মসংস্থান হয় সাত হাজার ৬৪৭ জনের, যেখানে আগের বছর অর্থাৎ ২০১৮ সালে স্থানীয় বিনিয়োগের জন্য ১৬৬টি বিনিয়োগ প্রকল্পের নিবন্ধন হয়েছিল। এসব প্রকল্পের বিপরীতে মোট বিনিয়োগের সম্ভাব্য পরিমাণ ছিল ছয় হাজার ২০৮ কোটি ৫৭ লাখ ৯৪ হাজার টাকা। আর কর্মসংস্থান ছিল ১৫ হাজার ৩৯৭ জনের। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে বিনিয়োগ নিবন্ধনের পরিমাণ কমেছে আগের বছরের তুলনায় এক হাজার ৮০৬ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। একইভাবে কর্মসংস্থানের সুযোগ কমেছে সাত হাজার ৭৫০ জনের।

এছাড়া দেশি-বিদেশি উদ্যোক্তাদের যৌথ বিনিয়োগ ৯টি প্রকল্পের বিপরীতে বিনিয়োগ নিবন্ধন হয়েছিল ৭০৮ কোটি ৩৭ লাখ ৯৬ হাজার টাকা। এতে কর্মসংস্থান হবে ৭০১ জনের, যেখানে ২০১৮ সালে দেশি-বিদেশি উদ্যোক্তাদের যৌথ বিনিয়োগ ৯টি প্রকল্পের বিপরীতে বিনিয়োগ নিবন্ধন ছিল ৪৩ কোটি ১৪ লাখ ৬৮ হাজার টাকা। এতে কর্মসংস্থান ছিল ৬০৮ জনের।

একই সময়ে শতভাগ বিদেশি বিনিয়োগ চারটি বাণিজ্যিক প্রকল্পের বিপরীতে বিনিয়োগ নিবন্ধন নেওয়া হয় ২১ কোটি ৯৫ লাখ ৫৩ হাজার টাকা। এতে কমসংস্থানের সুযোগ হবে ৯৮৯ জনের। গত ২০১৮ সালে শতভাগ বিদেশি বিনিয়োগ চারটি প্রকল্পের বিপরীতে বিনিয়োগ নিবন্ধন নেওয়া হয়েছিল ২৩ কোটি ১১ লাখ ২০ হাজার টাকা। এতে কমসংস্থান ছিল ২৭৫ জনের। অর্থাৎ বিদেশি বিনিয়োগ নিবন্ধন কমেছে এক কোটি ১৫ লাখ ৬৭ হাজার টাকা। আর ২০১৮ সালে অতিরিক্ত বিনিয়োগ (যন্ত্রপাতি অন্তর্ভুক্তি) ১৪৩টির বিপরীতে ছিল এক হাজার ৭৮৯ কোটি ৭৮ লাখ টাকা।

অপরদিকে গত ২০১৮ সালে দেশের মোট বিনিয়োগ হয়েছে এক লাখ ৩৩ হাজার ৩৯৪ কোটি টাকা, যা আগের বছরে ছিল দুই লাখ ১৮ হাজার ৬৫০ কোটি টাকা।

এ অঞ্চলের শিল্প, বাণিজ্য ও ট্রেডিং ব্যবসায় নিয়োজিত ব্যবসায়ীরা জানান, ২০১০ সালের পর থেকে চট্টগ্রামের শিপব্রেকিং, আবাসান, শিল্প ও ভোগ্যপণ্যের বড় ব্যবসায়ীরা আস্তে আস্তে খারাপ পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে থাকেন। বর্তমানে এসব বাণিজ্যিক কিংবা গ্রুপগুলোর অবস্থার পরিবর্তন হয়নি। এ সময় চট্টগ্রামে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও বন্দরসহ অবকাঠামোগত সংকট ছিল। এছাড়া বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ঋণ অনুমোদনের জটিলতার কারণে অনেক সময় বিনিয়োগ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়নি। ফলে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা ঢাকার তুলনায় অনেকটা পিছিয়ে যান। অনেক ক্ষেত্রে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে নীতিনির্ধারকরা বিমাতাসুলভ আচরণ করে।  

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের (সিএমসিসিআই) সচিব মোহাম্মদ সলিম উল্লাহ শেয়ার বিজকে বলেন, ’৯০ দশকের পর চট্টগ্রাম ছিল বিনিয়োগের জন্য আকর্ষণীয় জায়গা। তখন শিল্পের জন্য জমি ছিল, দক্ষ ব্যবসায়ী ছিল, বন্দরসহ সব ধরনের সেবা ছিল এবং নগরায়ণ ছিল কম। ফলে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা উদ্যোক্তারা বিনিয়োগ করেন। আর এখন শিল্পের জন্য জমিসংকট, জমির উচ্চমূল্য ও নগরবাসীর সংখ্যা বেড়েছে, অন্যদিকে কমেছে সেবা প্রদানকারী সংস্থার সক্ষমতা। এখনও গ্যাস সংকট ও অবকাঠামোগত সংকট রয়েছে। এছাড়া বনেদি ব্যবসায়ী পরিবারগুলো বেকাদায় রয়েছে। পাশাপাশি লগ্নি প্রতিষ্ঠানসহ নীতিনির্ধারকদের উদাসীনতা আছে। ফলে সব মিলিয়ে চট্টগ্রামে বিনিয়োগ কম হচ্ছে। তবে আশার বিষয় হচ্ছে, সরকার বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য বন্দরসহ গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহের উদ্যোগ নিয়েছে। এছাড়া দেশের সবচেয়ে বড় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তুলতে কাজ করছে। এতে আবার চট্টগ্রাম আগের মতো বিনিয়োগ আকর্ষণে শীর্ষস্থানে থাকবে।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন
ট্যাগ »

সর্বশেষ..