বাণিজ্য সংবাদ শিল্প-বাণিজ্য

বিনিয়োগ বাড়াতে বাজেটে দিকনির্দেশনা চায় বিসিআই

নিজস্ব প্রতিবেদক: উচ্চ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেট উত্থাপন করেছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। ঘোষিত বাজেট আশাব্যঞ্জক হলেও তা বাস্তবায়নে সরকারকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে বলে মনে করে বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজ (বিসিআই)। এ জন্য প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে যে বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে, সে বিষয়ে দিকনির্দেশনা চেয়েছে সংগঠনটি।

গতকাল আগামী অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেটের বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে সংগঠনটির নেতারা এ দাবি জানান। সংগঠনের সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী (পারভেজ) গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি তুলে ধরেন।

বাজেট প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, বিশ্ব অর্থনীতি এখন কভিডের প্রাদুর্ভাবে বিপর্যস্ত, ঠিক এই কঠিন সময়ে জীবন-জীবিকায় প্রাধান্য দিয়ে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের লক্ষ্য নিয়ে ঘোষিত ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা সাত দশমিক দুই শতাংশ ও মূল্যস্ফীতির লক্ষ্য ধরা হয়েছে পাঁচ দশমিক তিন শতাংশ। আর বাজেট ঘোষণা করা হয়েছে ছয় লাখ তিন হাজার ৬৮১ কোটি টাকার। এ সময়ে এরূপ উচ্চ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে ঘোষিত বাজেট আশাব্যঞ্জক হলেও বাস্তবায়নে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে সরকারকে। প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে যে বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ প্রয়োজন, তার দিকনির্দেশনা চায় বিসিআই। কারণ বিগত কয়েক বছরে বেসরকারি বিনিয়োগ জিডিপির ২৩ শতাংশের কাছাকাছি অবস্থান করছে।

এ সময় তিনি বলেন, বিসিআই বর্তমান পরিষদ মূলত দেশে নতুন উদ্যোক্তা, মাইক্রো ও স্মল শিল্পোদ্যোক্তা সৃষ্টি এবং উন্নয়নে একত্রে কাজ করে চলেছে। এছাড়াও স্থানীয় সব শিল্পের সব ধরনের প্রতিবন্ধকতা নিরসনে বিসিআই কাজ করে চলেছে। একটি দক্ষ ও কর্মঠ যুবসমাজ তৈরি করতে প্রতি উপজেলায় যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করে স্বল্প ও অদক্ষ তরুণদের দক্ষতা বৃদ্ধি করে সার্বিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ত্বরান্বিত করার স্বার্থে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে মাইক্রো ও ক্ষুদ্র শিল্প খাতে তরুণ শিল্পোদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করার ধারাবাহিকতায় বিসিআই বেশকিছু সুপারিশ তুলে ধরে।

এসব সুপারিশের মধ্যে রয়েছেÑকারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণকে উৎসাহিত করার ক্ষেত্রে বিনিয়োগ ও আয়কর অবকাশ প্রদান; পেশাগত ও কারিগরি প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে যদি প্রতিষ্ঠান বা শিল্পে নিয়োগ দেয়া হয়, তাহলে তাদের তাদের মজুরি করমুক্ত রাখা; মাইক্রো ও ক্ষুদ্র শিল্প এবং তরুণ শিল্পোদ্যোক্তাদের জন্য ন্যূনতম ১০ বছর কর অবকাশ প্রদান করা, পরবর্তীতে বিশেষ কর সুবিধা প্রদান করা এবং লভ্যাংশের ওপর কর অবকাশ দেয়া; গবেষণা ও স্কিল ডেভেলপমেন্টের জন্য সব ধরনের বিনিয়োগ করমুক্ত রাখা; ক্ষুদ্র শিল্প এবং নারী উদ্যোক্তাদের সমন্বয়ে খাতভিত্তিক যৌথ প্রতিষ্ঠানগুলোকে রপ্তানিমুখী করার ক্ষেত্রে বন্ডেড-ওয়ারহাউস সুবিধা দান; শিল্পের কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে শূন্য শতাংশ উৎস কর চালু করা; সব ধরনের ইউটিলিটি সেবার ওপর ভ্যাট অব্যাহতি প্রদান এবং প্রতিযোগিতা আইন কার্যকর করা।

বিসিআই জানায়, স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ কিছুটা বাড়ানো হলেও তা জিডিপির এক শতাংশের মধ্যেই রয়ে গেছে। এই বরাদ্দ দিয়ে একদিকে স্বাস্থ্য খাতের চাহিদা মিটানো কঠিন অন্য দিকে বরাদ্দ বাস্তয়নের ক্ষেত্রেও স্বাস্থ্য খাত অনেক পিছিয়ে আছে। এই বাস্তবতায় স্বাস্থ্য খাত বড় ধাক্কা সামলাতে সক্ষমতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ এবং ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের ওপর ১৫ শতাংশ করারোপের প্রস্তাব করা হয়েছে, যেহেতু উক্ত প্রতিষ্ঠানসমূহ অলাভজনক প্রতিষ্ঠান সেহেতু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ এবং ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের ওপর প্রস্তাবিত কর হার পুনর্বিবেচনার প্রস্তাব করছি। করারোপ হলে দেশে উচ্চশিক্ষার ব্যয় বৃদ্ধি পাবে।

মোট আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে তিন লাখ ৮৯ হাজার কোটি টাকা, যা সংশোধিত বাজেটের তুলনায় ১০ দশমিক ৬৫ শতাংশ বেশি; যার মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে তিন লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা, যা বিগত বছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় ৯ দশমিক ৬৩ শতাংশ বেশি। বর্তমান পরিস্থিতিতে বিশাল রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন অনেকটা চ্যালেঞ্জিং হবে আমরা রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের সঠিক দিকনির্দেশনা প্রদানের অনুরোধ করেছি। করনেট বৃদ্ধির জন্য উপজেলা পর্যায়ে কর অফিস স্থাপনের প্রস্তাব পুনর্ব্যক্ত করছে বিসিআই, যার ফলে করের আওতা ও রাজস্ব আয় বাড়ানো সম্ভব।

আয়কর বিষয়ে বিসিআই সভাপতি বলেন, শিল্প ক্ষেত্রে মূসক ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বেশি। শিল্প খাত রপ্তানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা আয় এবং আমদানি হ্রাসের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করে দেশের অর্থনীতিতে অধিক ভূমিকা রাখে বিধায় তাদের প্রণোদনা প্রদান এবং ট্রেডিং কোম্পানির তুলনায় নি¤œহারে করপোরেট করারোপ করার প্রস্তাব করছি। সুষম আঞ্চলিক উন্নয়নের মাধ্যমে অর্থনৈতিক অগ্রগতি অব্যাহত রাখার জন্য শুধু ঢাকা বা চট্টগ্রাম কেন্দ্রিক না করে দেশের উত্তরাঞ্চলসহ প্রত্যন্ত ও অনুন্নত অঞ্চলে বিনিয়োগ ও শিল্পায়ন উৎসাহিত করে কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোগ গ্রহণ করার জন্য বিশেষ রেয়াতি সুবিধা প্রদানের প্রস্তাব করছি। আমরা ব্যক্তিগত করমুক্ত আয়ের সীমা চার লাখ টাকায় উন্নীত করার প্রস্তাব করছি (ভারতে পাঁচ লাখ রুপি)। ব্যক্তিগত করমুক্ত সীমা ও বিদ্যমান আয়করের হার পুনর্নির্ধারণ: মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় আগামী ২০২১-২২ করবছরের জন্য বর্তমান ব্যক্তিগত করমুক্ত সীমা ও বিদ্যমান আয়করের হার পুনর্নির্ধারণের প্রস্তাব করছি।

প্রস্তাবিত বাজেটে পাঁচ শতাংশ অগ্রিম আয়কর (এআইটি) ব্যবসায়িক খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে। আমরা অগ্রিম আয়কর (এআইটি) বিলুপ্ত করার জন্য প্রস্তাব করেছিলাম। কিন্তু এ বিষয়ে বাজেটে কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি। অথচ বাজেটে ২০ শতাংশ পর্যন্ত সর্বোচ্চ আয়কর আরোপ করা হয়েছে। অগ্রিম আয়কর যথাযথ সমন্বয়/রিফান্ড না হওয়ায় পরিচালনা ব্যয় বৃদ্ধি পায়। পদ্ধতিগত জটিলতা নিরসনপূর্বক অগ্রিম আয়কর বাতিল করার প্রস্তাব করছি।

ভ্যাট বিষয়ে তিনি বলেন, ভ্যাট ফাঁকির ক্ষেত্রে ভ্যাটের দ্বিগুণ জরিমানা আরোপের বিধান রয়েছে আগামী বাজেটে এটি কমিয়ে ভ্যাট ফাঁকির সমপরিমাণ জরিমানার বিধান করা হয়েছে। সে সঙ্গে সময়মতো ভ্যাট না দিলে মাসিক দুই শতাংশ হারে সুদের পরিবর্তে এক শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে, যা ইতিবাচক। আমদানি পর্যায়ে ভ্যাটের আগাম কর (এটি) চার শতাংশ থেকে কমিয়ে তিন শতাংশ করা হয়েছে। এ আগাম কর সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করার জন্য প্রস্তাব করছি।

শুল্ক বিষয়ে পারভেজ বলেন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড কর্তৃক জারিকৃত মূলধনি যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ সংক্রান্ত এস.আর.ও. (১১৩-আইন/২০২১/কাস্টমস তারিখ ০৩-০৬-২০২১) অধীনে মূলধনি যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ এক শতাংশ আমদানি শুল্ক প্রদান করে আমদানির সুযোগ থাকলেও প্রজ্ঞাপনে অন্তর্ভুক্ত ও তালিকাভুক্ত না থাকায় সব শিল্প খাতে আবশ্যক মূলধনি যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ বর্ণিত রেয়াতি সুবিধা পাচ্ছে না। সে কারণে “প্রজ্ঞাপনে উল্লিখিত মূলধনি যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশের পাশাপাশি মূসক নিবন্ধিত শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মূসক-৭ ফরমে ঘোষিত অন্যান্য মূলধনি যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশও উক্ত রেয়াতি সুবিধা প্রাপ্য হইবে” প্রজ্ঞাপনে সংযোজন করার অনুরোধ করছি।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..