বাণিজ্য সংবাদ

বিনিয়োগ কেন্দ্র হবে মহেশখালী

সাইফুল আলম, চট্টগ্রাম: কক্সবাজারের মহেশখালী হতে যাচ্ছে বিনিয়োগের কেন্দ্র। এখানে ১০টি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র, তিনটি এলএনজি টার্মিনাল ও চারটি বিশেষায়িত অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। ফলে আধুনিক একটি শিল্পাঞ্চলে রূপ নিতে যাচ্ছে চট্টগ্রামের এ দ্বীপটি। আগামী ১০ বছরে পরিণত হবে দেশের প্রধান পাওয়ার হাবে। অংশীদারির ভিত্তিতে বিনিয়োগে আগ্রহী জাপান, চীন, তাইওয়ান, মালয়েশিয়াসহ অন্যান্য দেশ।

সূত্রমতে, তিনটি ছোট দ্বীপের সমন্বয়ে গঠিত মহেশখালী উপজেলা। এগুলো হলো সোনাদিয়া, মাতারবাড়ী ও ধলঘাটা। সব মিলিয়ে মহেশখালী দ্বীপের আয়তন ৩৬২ দশমিক ১৮ বর্গকিলোমিটার। কক্সবাজার থেকে দ্বীপটির দূরত্ব ১২ কিলোমিটার। উপজেলার উত্তর-পূর্বে চকরিয়া উপজেলা, দক্ষিণ-পূর্বে কক্সবাজার সদর, দক্ষিণ-পশ্চিমে বঙ্গোপসাগর, উত্তর-পশ্চিমে কুতুবদিয়া উপজেলা। উপজেলার উত্তর-দক্ষিণমুখী মহেশখালী চ্যানেল দ্বারা মূল ভূখণ্ড থেকে আলাদা হয়ে বঙ্গোপসাগরে পড়েছে। এ দ্বীপকে কেন্দ্র করে বেশ কিছু বড় প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। আর যেগুলো আগামী পাঁচ থেকে দশ বছরে বাস্তবায়ন হবে। এর মধ্যে রয়েছে ১০টি বিদ্যুৎকেন্দ্র, তিনটি এলএনজি টার্মিনাল ও চারটি বিশেষায়িত অর্থনৈতিক অঞ্চল। এছাড়া সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। জ্বালানি তেল পরিবহন করা হচ্ছে সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং টার্মিনালে। কয়লা খালাসের জন্যও বড় টার্মিনাল হচ্ছে। এছাড়া বিদ্যুৎ সঞ্চালন, রাস্তাঘাট, আবাসনসহ নানা প্রকল্পের মাধ্যমে মাতারবাড়ীকে সিঙ্গাপুরের আদলে একটি অত্যাধুনিক পরিকল্পিত শহর হিসেবে গড়ে তোলা হবে। এর মাঝে ৩৬ হাজার কোটি টাকার প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে এখানে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হবে বলে আশা করছে সরকার।

দেশের বিদ্যৎপ্রাপ্যতা নিশ্চিত করার জন্য সরকার কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে আগ্রহী। এর জন্য প্রয়োজনীয় কয়লা জাহাজে করে আমদানি করতে হবে। ফলে সাগর উপকূলই কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের উপযুক্ত জায়গা। এছাড়া এলএনজিও আমদানি করতে হবে সাগরপথে। কারণ সারা দেশে গ্যাসভিত্তিক যেসব বিদ্যুৎকেন্দ্র ও শিল্প-কারখানা গড়ে উঠেছে, সেগুলো বাঁচিয়ে রাখতে হবে। এসব বিবেচনায় সরকার এ দ্বীপটি বেছে নিয়েছে দেশের অন্যতম শিল্পশহরে পরিণত করতে। ইতোমধ্যে মাতারবাড়ীতে দুটি প্রকল্প বান্তবায়নের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে মন্ত্রিপরিষদ। এ ১০টি প্রকল্পের জন্য ভূমি অধিগ্রহণ করা হবে ছয় হাজার ৪০০ একর।

বাংলাদেশ সরকার ও সরকারের সঙ্গে বিভিন্ন দেশের সমন্বয়ে নেওয়া প্রকল্পগুলোর মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রকল্প আছে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার যৌথ উদ্যোগে নির্মিত হচ্ছে এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াটের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্প। এতে ব্যয় হবে প্রায় ২০০ কোটি ডলার, অর্থাৎ ১৬ হাজার কোটি টাকা। পাশাপাশি একটি ৭০০ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে সিঙ্গাপুরের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ১২৫ কোটি ডলার, অর্থাৎ ১০ হাজার কোটি টাকা। এছাড়া সরকার ও এডিবির অর্থায়নে একটি এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা হবে। এ প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ২০০ কোটি ডলার। আরও কয়েকটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের প্রস্তাবও রয়েছে এখানে। সরকারের পরিকল্পনা যদি যথাসময়ে বাস্তবায়িত হয়, তাহলে মহেশখালীতে ১০ বছরের মধ্যে পাঁচ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে। সবকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র হবে ‘মেগা সাইজ’, অর্থাৎ বড় কেন্দ্র।

বর্ধিত গ্যাসের চাহিদা মেটাতে মহেশখালীতে করা হবে তিনটি এলএনজি টার্মিনাল, যা  স্থাপনে দুই বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় হতে পারে বলে জানা গেছে। বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে সবচেয়ে বড় বেসরকারি কোম্পানি সামিট গ্রুপ মহেশখালীতে একটি এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের জন্য সম্প্রতি প্রাথমিক অনুমোদন পেয়েছে। এর আগে ভারতের শিল্প গ্রুপ রিলায়েন্স এখানে একটি এলএনজি টার্মিনাল করার প্রস্তাব দিয়েছে। সরকার প্রাথমিকভাবে সেটির অনুমোদনও দিয়েছে। এছাড়া চলমান একটি এলএনজি (লিকুইফাইড ন্যাচারাল গ্যাস) টার্মিনাল নির্মাণ শেষ হবে ২০১৮ সালে। এ টার্মিনালে হতে জাতীয় গ্রিডে প্রাথমিক পর্যায়ে প্রতিদিন ৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাস যুক্ত হবে। পরে প্রতিদিন ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস দেওয়ার সক্ষমতা থাকবে।

সমুদ্রের জাহাজ থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে সরাসরি ইআরএল (ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড) পর্যন্ত জ্বালানি তেল সরবরাহে নেওয়া হয়েছে সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং টার্মিনাল (এসপিএম) প্রকল্প। এ প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় হবে চার হাজার ৯৩৫ কোটি ৯৭ লাখ টাকা। এসপিএম টার্মিনাল নির্মাণের পর লাইটার অপারেশনের মাধ্যমে ক্রুড অয়েল ও ফিনিশড পেট্রোলিয়াম প্রডাক্ট আমদানির ক্ষেত্রে সিস্টেম লস কমানো যাবে এবং দেশের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা যাবে। আবার আমদানি করা প্রডাক্ট সহজে, নিরাপদে, অপেক্ষাকৃত কম খরচে ও স্বল্প সময়ে খালাস করা যাবে।

অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের সূত্রে জানা যায়, মহেশখালীতে চারটি অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। কক্সবাজার সদর থেকে সড়কপথে ৪০ কিলোমিটার ও নৌপথে চার কিলোমিটার দূরে মহেশখালী উপজেলার ছোট মহেশখালী, পাহাড় ঠাকুরতলা ও গোরকঘাটা, উত্তর নলবিলা ও  ধলঘাটা মৌজায় চারটি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব করা হয়েছে। এ অঞ্চলগুলোতে যথাক্রমে মহেশখালী ও মাতারবাড়ী কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ সুবিধা পাওয়া যাবে। দেশের দুই সমুদ্রবন্দরের সঙ্গে এর নৌ-যোগাযোগও ভালো। এছাড়া মাতারবাড়ী ইউনিয়নকে একটি অত্যাধুনিক টাউনশিপ হিসেবে গড়ে তোলা হবে। পাশাপাশি মাতারবাড়ীতে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, এলএনজি টার্মিনাল, কয়লা আমদানির জন্য জেটি নির্মাণ, মাতারবাড়ী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন স্থাপন, কক্সবাজার থেকে মাতারবাড়ী পর্যন্ত সমুদ্রর ওপর সেতু নির্মাণ করা হবে।

চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি মাহবুবুল আলম বলেন, চট্টগ্রামকে কেন্দ্র করে সরকারের সব উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে অবশ্যই এর চেহারা বদলে যাবে। সত্যিকারের বাণিজ্যিক রাজধানী রূপে লাভ করবে। পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্য অনেক গুণ বৃদ্ধি পাবে। জাতীয় লক্ষ্যও অর্জিত হবে।

চট্টগ্রামে এক অনুষ্ঠানে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেছেন, সরকার মহেশখালী দ্বীপকে ‘এনার্জি হাব’ হিসেবে গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এখানে কমপক্ষে ১০ হাজার মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে। এজন্য সাগরপথে বিদেশ থেকে কয়লা আমদানি করতে আধুনিক ও উন্নত মানের জেটি তৈরি করা হবে। এখানে কয়েকটি এলএনজি টার্মিনাল হবে। মন্ত্রী আরও বলেন, এর জন্য ৩৬ হাজার কোটি টাকার প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নে জাপান, চীন, মালয়েশিয়াসহ অন্যান্য দেশ অংশীদারির ভিত্তিতে মহেশখালীতে বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

 

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..