প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

বিপর্যয় কাটিয়ে উঠতে পিছিয়ে বাংলাদেশের পুঁজিবাজার

এএএমসিএমএফের প্রতিবেদন

মুস্তাফিজুর রহমান নাহিদ: বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের কোনো বিপর্যয় ঘটলে তা কাটিয়ে উঠতে বেশি সময় লাগে। পুঁজিবাজার-সংশ্লিষ্টদের মতে, সঠিক তদারকি, ভালো শেয়ারের অভাব, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর আশানুরূপ অংশগ্রহণ না থাকা, প্রতিষ্ঠান মালিকদের কাছ থেকে ভালো রিটার্ন না পাওয়া, সর্বোপরি কারসাজিকারীদের দৌরাত্ম্যসহ নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে এ সমস্যার সৃষ্টি হয়।
অ্যাসোসিয়েশন অব অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি অ্যান্ড মিউচুয়াল ফান্ড (এএএমসিএমএফ) ভারতের পুঁজিবাজারের ১০ বছরের অবস্থা নিয়ে গবেষণা করে। ওই গবেষণায় দেখা যায়, ১০ বছরে ভারতের পুঁজিবাজার তিনবার বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়। ভারতের বড় বিপর্যয় ঘটে ২০০৮ সালে; কিন্তু পাঁচ মাসের মাথায় তা আবার তারা কাটিয়ে ওঠে। দেশটির পুঁজিবাজার আরও দুটি বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয় ২০১০ ও ২০১৫ সালের প্রথম দিকে, যা যথাক্রমে আট ও এক মাসের ব্যবধানে কাটিয়ে ওঠে। এ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ভারতীয় পুঁজিবাজার গড়ে মাত্র এক থেকে দুই মাসে মন্দা কাটিয়ে ওঠে।
অন্যদিকে এএএমসিএমএফের প্রতিবেদনে আমেরিকার পুঁজিবাজারের ৩০ বছরের অবস্থায় দেখা যায়, ১৯৮৮-পরবর্তী আমেরিকার পুঁজিবাজারের কর্মক্ষমতা মিশ্র ফল দেয়। তবে ১৯৯০ থেকে ২০০০ সালের মধ্যে উৎপাদনশীল প্রবৃদ্ধি খুবই দ্রুততম। গবেষণায় দেখা যায়, ৩০ বছরের দীর্ঘ সময়ে দুবার বড় বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয় দেশটির পুঁজিবাজার। আমেরিকার পুঁজিবাজারে বড় পতন হয় ২০০০ সালে। বাজারটির প্রত্যাবর্তনে একটু বেশি সময় লাগে, প্রায় ২৪ মাস। বাজারটি আরও একটি পতনের সম্মুখীন হয় ২০০৭ সালে। এ সময়টি বিশ্ব অর্থনীতির সংকটকাল হিসেবে সবাই জানে। এই সংকটও পাঁচ মাসের মধ্যে কাটিয়ে ওঠে। দীর্ঘ সময়ে আরও কিছু কিছুু বাজার পতনের মুখে পড়ে, যা গড়ে সাড়ে ছয় মাসে মন্দা কাটিয়ে ওঠে।
অন্যদিকে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের ২৩ বছরের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, বিপর্যয় কাটিয়ে উঠতে পুঁজিবাজারের দীর্ঘ সময় লাগে। বাংলাদেশের পুঁজিবাজার দুবার বড় বিপর্যয়ের মুখে পড়ে এবং তা কাটিয়ে উঠতে অনেক সময় লাগে। ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশে শেয়ারবাজার প্রথম বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়ে, যা বিনিয়োগকারীর আস্থার ওপর মন্দা সৃষ্টি করে। তা স্বাভাবিক অবস্থার ফিরে আসতে প্রায় চার বছর সময় লাগে। এরপর ২০০৪ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত বাজার ভালো ছিল। আবার ২০১১ সালে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছিল। ওই বিপর্যয় বিনিয়োগকারীদের আস্থায় ব্যাপক অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করেছিল। এখান থেকে স্বাভাবিক ছন্দে ফিরে আসতে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের গড়ে তিন বছর সাত মাস সময় লাগে।
এ প্রসঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম শেয়ার বিজকে বলেন, আমাদের দেশে পুঁজিবাজারে ধস হলে তা কাটিয়ে উঠতে বেশি সময় লাগার জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী বিনিয়োগকারীরা। তারা সঠিক আচরণ না করায় বাজার রিকভারি করতে সময় বেশি লাগে। এছাড়া ব্যাংক খাতে তারল্য সংকট, আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নানা সমস্যাসহ বিভিন্ন কারণে পুঁজিবাজার ঘুরে দাঁড়াতে সময় লাগে।
একই বিষয়ে একটি মার্চেন্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আমাদের দেশের পতন রিকভারি করতে না পারার প্রধান কারণ নিয়ন্ত্রক সংস্থার সঠিক তদারকি করতে না পারা। অন্যদিকে পুঁজিবাজার নিয়ে ঘন ঘন সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করাও একটি বড় কারণ। তাছাড়া আমাদের দেশের পুঁজিবাজার প্রতিনিয়ত কারসাজিকারীদের হাতে বন্দি থাকে। যে কারণে বাজার তার স্বরূপে ফিরতে পারে না।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে দুটি বড় ধস হয় ১৯৯৬ ও ২০১০ সালে। তবে এ দুই পতনের মধ্যে বিনিয়োগকারীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন ২০১০ সালে। এ সময়ে সরকারের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের মার্জিন ঋণ মওকুফ, আইপিওতে কোটা, স্বল্পসুদে ঋণ, কোম্পানির সুশাসন প্রতিষ্ঠাসহ নানা উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। কিন্তু এর কোনো কিছুই পুঁজিবাজারকে স্বাভাবিক অবস্থায় আনতে পারেনি। এর জন্য পুঁজিবাজার-সংশ্লিষ্টরা সঠিক তদারকির অভাবকে দায়ী করেন।

সর্বশেষ..