দিনের খবর প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

বিপিসি চেয়ারম্যানের দুর্নীতি তদন্তে দুদক

শেখ আবু তালেব: বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) চেয়ারম্যান মো. সামছুর রহমানের বিরুদ্ধে দুর্নীতির মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। এ অভিযোগের তদন্তে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এরই মধ্যে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য চেয়ে চিঠিও দিয়েছে দুদক, কিন্তু প্রয়োজনীয় তথ্য দিতে গড়িমসি করছে মন্ত্রণালয়। তথ্য পেতে আবার চিঠি দিয়েছে দুর্নীতি দমন সংস্থাটি। দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে এমন তথ্য।

জানা গেছে, দেশে পেট্রোলিয়াম পণ্য আমদানি, মজুত, বিপণন, বিতরণ ও নিয়ন্ত্রণসংক্রান্ত কাজের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান হচ্ছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। পেট্রোলিয়াম, তেল, লুব্রিক্যান্ট ব্যবসায়ের অবকাঠামোগত উন্নয়নের বিষয়টিও দেখভাল করে প্রতিষ্ঠানটি। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ একটি প্রতিষ্ঠান এটি। ফলে বিপিসিতে কয়েক হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয় প্রতি বছর।

দায়িত্বশীল সূত্রমতে, সচিব পদমর্যাদার মো. সামছুর রহমান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) চেয়ারম্যান। ২০১৮ সালের অক্টোবর থেকে তিনি চেয়ারম্যানের পদে রয়েছেন। বিপিসির চেয়ারম্যান হওয়ায় পদাধিকার বলে তিনি কয়েকটি রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানির চেয়ারম্যান। এর মধ্যে রয়েছে পদ্মা অয়েল কোম্পানি লিমিটেড, যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেড ও ইস্টার্ন লুব্রিক্যান্টস কোম্পানি লিমিটেড। এসবের মধ্যে পদ্মা অয়েল ও ইস্টার্ন লুব্রিক্যান্টস পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত কোম্পানি।

মো. সামছুর রহমানের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, তিনি চেয়ারম্যান হওয়ার পর থেকে পদ্মা অয়েল, যমুনা অয়েল ও মেঘনা পেট্রোলিয়ামে বিভিন্ন পর্যায়ের জনবল নিয়োগে প্রভাব বিস্তার করেছেন। নিজের পছন্দের ব্যক্তিকে নিয়োগ দিয়েছেন অর্থের বিনিময়ে। এসব প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদেও পছন্দের ব্যক্তিকে নিয়োগ দিয়েছেন। এছাড়া এসব প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন পর্যায়ের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের কাছ থেকে অনৈতিকভাবে অর্থ আদায় করেছেন। এমনকি ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের কাছ থেকে মাসিক ভিত্তিতে মাসোহারা নিয়েছেন।

অর্থ না পেলে অন্য কাউকে শীর্ষ পর্যায়ে রদবদলের হুমকি দিচ্ছেন। বিপিসির এক পরিচালকের মাধ্যমে তিনি এসব অনিয়ম করছেন। ওই পরিচালক একসময় নারায়ণগঞ্জ জেলায় এডিসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এসব কাজ তার মাধ্যমেই সম্পন্ন করেন তিনি। সম্প্রতি রাষ্ট্রায়ত্ত এই তিনটি প্রতিষ্ঠানে জনবল নিয়োগেও আর্থিক অনিয়ম হয়। অর্থের মাধ্যমে ভাইবা (সাক্ষাৎকার) ছাড়াই ৩৫ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। এর বাইরে বিভিন্ন চলমান প্রকল্প থেকেও দুর্নীতির মাধ্যমে অর্থ আদায় করেন বিপিসির চেয়ারম্যান।

ইস্টার্ন রিফাইনারি ও সিভিও পেট্রো কেমিক্যাল রিফাইনারির (সাবেক চট্টগ্রাম ভেজিটেবল অয়েল) বিল পরিশোধে অনৈতিকভাবে অর্থ আদায় করেছেন বিপিসি চেয়ারম্যান। সামছুর রহমানের বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে তার ছেলেকে নিয়ে। অভিযোগ উঠেছে, তেল কোম্পানিকে সুবিধা দেওয়ার বিনিময়ে নিজ ছেলেকে ইন্দোনেশিয়ায় কাজের সুযোগ করে দিয়েছেন মো. সামছুর রহমান। ওই ছেলের একটি সামাজিক সংগঠনও রয়েছে। ওই সংগঠনের নামেও বিপিসির বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে অর্থ আদায় করা হয়েছে বিভিন্ন সময়ে। দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে সামছুর রহমানের স্ত্রীর বিরুদ্ধেও।

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চেয়ে বিপিসির চেয়ারম্যানের সঙ্গে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হয়, কিন্তু তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরে বিষয়টি জানিয়ে একাধিকবার এসএমএসও পাঠানো হয়। কিন্তু গতকাল পর্যন্ত তিনি কোনো উত্তর দেননি।

এসব অভিযোগের প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহ করে দুদক। পরে দুদকের পক্ষ থেকে তদন্তের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এজন্য দুদকের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা প্রয়োজনীয় তথ্য দিতে চিঠি দেন জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের জ্বালানি ও খনিজ  সম্পদ বিভাগের সচিবকে। বিপিসির চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের বিষয়টি জানিয়ে এক পৃষ্ঠার তথ্য দেওয়া হয়। এর বিপরীতে মন্ত্রণালয়ের পূর্ণাঙ্গ মতামত চাওয়া হয়।

দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে, গত অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে চিঠিটি ইস্যু করেন দুদকের অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা। কিন্তু এক মাস পেরিয়ে গেলেও পূর্ণাঙ্গ মতামত দেয়নি জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ। এজন্য চলতি মাসে ফের চিঠি দেওয়া হয় দুদকের পক্ষ থেকে।

জানতে চাইলে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সিনিয়র সচিব আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিম শেয়ার বিজকে বলেন, এ বিষয়ে আমি কোনো মন্তব্য করতে পারছি না। এক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন) পারভীন আকতারের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন তিনি। পরে পারভীন আকতারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, বিষয়টি নিয়ে দাফতরিক কাজ চলছে। শিগগিরই মন্ত্রণালয় পূর্ণাঙ্গ মতামত পাঠাবে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিপিসির চেয়ারম্যান পদটি হচ্ছে অতিলোভনীয় পদ। এর আগে রাষ্ট্রায়ত্ত এ প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির ১০ কর্মকর্তাকেও ডেকেছে দুদক। এমনকি অধীনস্থ বিভিন্ন কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছে চেয়ারম্যানের দুর্নীতির বিরুদ্ধে। বর্তমান চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধেও নতুন করে অভিযোগ উঠল।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..