Print Date & Time : 9 March 2021 Tuesday 6:15 am

বিবেকহীন প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে নির্বাচন কমিশন: সুজন

প্রকাশ: November 29, 2020 সময়- 11:28 pm

নিজস্ব প্রতিবেদক : সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানে বর্তমান কমিশনের সব ক্ষমতা থাকলেও তারা নিরপেক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করতে ব্যর্থ হয়েছে। বর্তমান নির্বাচন কমিশন একটি বিবেকশূন্য প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে, যে কারণে নির্বাচন নিয়ে জনগণের আগ্রহ শূন্যের কোঠায় গিয়ে ঠেকেছে। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) আয়োজিত এক গোলটেবিল আলোচনায় এমন মন্তব্য করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

সুজনের উদ্যোগে গতকাল ‘গণতন্ত্র, নির্বাচন ও নির্বাচন কমিশন’ শীর্ষক একটি অনলাইন গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সুজন সভাপতি এম হাফিজউদ্দিন খানের সভাপতিত্বে বৈঠকে লিখিত প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার। সূচনা বক্তব্য রাখেন সংগঠনের কেন্দ্রীয় নির্বাহী সদস্য ড. শাহদীন মালিক। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেনÑ যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ড. আলী রিয়াজ, সুজনের নির্বাহী সদস্য আলী ইমাম মজুমদার, সাংবাদিক আবু সাঈদ খান, সুজনের নির্বাহী সদস্য সৈয়দ আবুল মকসুদ, ড. তোফায়েল আহমেদ, বিচারপতি এমএ মতিন, সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, সাবেক সচিব আব্দুল লতিফ মণ্ডল,  ফটোসাংবাদিক শহীদুল আলম, অধ্যাপক আসিফ নজরুল, সাবেক নির্বাচন কমিশনার এম সাখাওয়াত হোসেন, সুজনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী দিলীপ কুমার সরকার, সহসভাপতি ড. হামিদা হোসেন, জাতীয় কমিটির সদস্য সিআর আবরার, একরাম হোসেন, সদস্য অধ্যাপক মুহাম্মদ সিকান্দর খান, সফিউদ্দিন আহমেদ, আকবর হোসেন প্রমুখ।

ড. বদিউল আলম মজুমদার তার প্রবন্ধে বলেন, ‘আমাদের সংবিধান নির্বাচন কমিশনকে কয়েকটি সুস্পষ্ট দায়িত্ব দিয়েছে। দায়িত্ব পালনের লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশনকে অগাধ ক্ষমতাও দেওয়া হয়েছে। তবে দুর্ভাগ্যবশত সাম্প্রতিক স্থানীয় সরকার ও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকালে বহু অনিয়মের অভিযোগ উঠলেও আমাদের নির্বাচন কমিশন ছিল সম্পূর্ণ নির্বিকার। অবশ্য এটা সত্য, সরকার ও রাজনৈতিক দল, বিশেষত ক্ষমতাসীন দল না চাইলে শক্তিশালী ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশনের পক্ষেও সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠান প্রায় অসম্ভব।’

তিনি বলেন, ‘সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে নূরুল হুদা কমিশনের সব ক্ষমতা থাকলেও তারা নিরপেক্ষতার সঙ্গে নির্বাচন পরিচালনা করতে ব্যর্থ হয়েছে। তাদের অসততা ও পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ নাগরিকের ভোটাধিকার হরণ করেছে। এর মাধ্যমে নির্বাচন প্রক্রিয়ার ওপর জনগণের ব্যাপক আস্থাহীনতা সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া আমাদের রাজনীতি বহুলাংশে বিরোধী দল শূন্য হয়ে পড়েছে, যার দায় অবশ্য আমাদের প্রধান বিরোধী দলও এড়াতে পারে না। ফলে বহু নাগরিকের মধ্যে আজ চরম অসন্তোষ ও হতাশা সৃষ্টি হয়েছে।’

শাহদীন মালিক বলেন, ‘গণতন্ত্রের প্রকৃত ধারণার সঙ্গে আমাদের চারদিকে যে অবস্থা দেখছি, তার কোনো মিল নেই। নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব হলো সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান। কিন্তু তারা সে দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করছে না। গণতন্ত্র, নির্বাচন এসব বিষয় ক্রমাগতভাবে কল্পনার বিষয়ে পরিণত হচ্ছে।’

আলী রিয়াজ বলেন, ‘সংবিধান প্রধানমন্ত্রীর হাতে সব নির্বাহী ক্ষমতা ন্যস্ত করেছে। এর মাধ্যমে এক ধরনের সাংবিধানিক একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। নির্বাহী বিভাগের এই যে ক্ষমতা তৈরি হয়েছে, এটা নিয়ে আলোচনা না করে শুধু কমিশন নিয়ে আলোচনা করলে হবে না।’

এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘নির্বাচন কমিশনের শক্তি হলো আদালত। কিন্তু আমরা আদালতকে কমিশনের সহযোগিতায় এগিয়ে আসতে দেখিনি। সংবিধান অনুযায়ী একটি আইনের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ হওয়ার কথা। কিন্তু এখন সেটা হচ্ছে না। তাই নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের আইন প্রণয়ন করে যাতে তাদের নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়, সেদিকে আমাদের জোর দিতে হবে।’

আবু সাঈদ খান বলেন, ‘এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতায়ন, স্থানীয় সরকার শক্তিশালীকরণ এবং নির্বাচনী আইন পরিবর্তন করে এলাকাভিত্তিক নির্বাচনী ব্যবস্থার পরিবর্তে সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থা প্রবর্তন করে একটা মিশ্র নির্বাচনী ব্যবস্থায় যাওয়া দরকার।’

আলী ইমাম মজুমদার বলেন, ‘নির্বাচনের প্রধান অংশীদার সরকার। কমিশন গঠনের জন্য যেসব সার্চ কমিটি গঠন করা হয়, সেগুলোতে সরকার যাকে চায়, সেরকম লোকই বেরিয়ে আসে। সরকার না চাইলে সুষ্ঠু নির্বাচন করা খুবই দুরূহ।’

সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, ‘নির্বাচন, গণতন্ত্র এসব এখন কবি গান-ঘেঁটু গানের বিষয়ে পরিণত হয়েছে। যেখানে বহুদলীয় গণতন্ত্র নেই, সেখানে এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা করা অর্থহীন। বর্তমান নির্বাচন কমিশন একটি বিবেকশূন্য প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। তাদের বিবেকশূন্যতার কারণে নির্বাচন নিয়ে জনগণের আগ্রহ শূন্যের কোঠায় গিয়ে ঠেকেছে।’

তোফায়েল আহমেদ বলেন, ‘জানতাম, সামরিক শাসকরা বিরাজনীতিকরণ করে। কিন্তু একটি বেসামরিক সরকার যে এভাবে বিরাজনীতিকরণ করতে পারে, এখন আমরা তাও দেখতে পাচ্ছি। আমি সবাইকে বলব, সামনে স্থানীয় সরকারের যে নির্বাচনগুলো আছে, সেগুলোতে গণতন্ত্রকে ফিরিয়ে আনার সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।’

আসিফ নজরুল বলেন, ‘কমিশন ও প্রশাসন দলীয় অঙ্গসংগঠনে পরিণত হয়েছে। কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে তারা আবার ভালোমতো কাজ দায়িত্ব পালন করেছে। আমাদের নির্বাচনকালে নিরপেক্ষ সরকার গঠনের কথা জোরেশোরে বলতে হবে।’

এম হাফিজউদ্দিন খান বলেন, ‘আমরা অনেক কথা বলছি, কিন্তু যারা শোনার তারা শুনছেন না, বা শুনলেও গুরুত্ব দিচ্ছেন না। তাই একটা ব্যাপক গণআন্দোলন সৃষ্টি করা দরকার। তাহলে হয়তো কিছু হতে পারে। এজন্য আমাদেরই নেতৃত্ব দিতে হবে।’