মত-বিশ্লেষণ

বিলুপ্তির পথে দেশীয় প্রজাতির মাছ

জাফরুল ইসলাম: বাংলাদেশ এমন একটা দেশের নাম, যে দেশটার পরিচয় ছিল প্রাচীনকালে বদ্বীপ হিসেবে। কারণ এদেশের মধ্য দিয়ে ছোট-বড় অসংখ্য নদী বয়ে গেছে। এ দেশের মানুষ তাই নদী-তীরবর্তী অঞ্চলে যুগের পর যুগ ধরে বসবাস করে আসছে। কারণ নদী তাদের জীবন-জীবিকার প্রধান উৎস। নদীর পানি দিয়ে তারা চাষাবাদ করে এবং অবসর সময়ে এসব নদীতে মৎস্য আহরণের মাধ্যমে বাড়তি অর্থ উপার্জন করে আসছে। এই বাড়তি উপার্জনের কারণে তাদের জীবন-জীবিকা এসেছে অনেক পরিবর্তন। একটা সময় যখন এদেশের মানুষ দুই বেলা খেতে পারত না, তারা আজ শুধু ভালো খাওয়াই নয়, রীতিমতো পাকা বাড়ি নির্মাণ করছে। কিন্তু আজ যখন বাংলাদেশের মৎস্য সম্পদের দিকে তাকায় তখন সেখানে একরকম সংকটের অগ্রিম চিহ্ন দেখতে পাওয়া যায়। আমরা জানি প্রাণীর দেহে ভিটামিন খনিজ ইত্যাদির যেমন চাহিদা রয়েছে, ঠিক তেমনি আমিষ নামক অতিমূল্যবান উপাদানের প্রয়োজন রয়েছে। আর এই চাহিদা পূরণ করতে পারে মৎস্য বা মাছ। কারণ মাছে রয়েছে প্রচুর আমিষ, আমাদের অতি প্রয়োজনীয়। একটা সময় এদেশে মানুষদের বলা হতো মাছে-ভাতে বাঙালি। সেই সময় এদেশের গ্রামাঞ্চলে যেসব হাওর বা ডোবা ছিল সেগুলোতে প্রচুর মাছ পাওয়া যেত। বাড়িতে যদি  ভাত নাও থাকত, তবুও মাছের কমতি ছিল না। এমনও সময় সে সময় অতিবাহিত হয়েছে ভাত না খেয়ে শুধু মাছ খেয়ে থাকতে হয়েছে, মৎস্য আহরণ ছিল সহজ বিষয়। সেই সময় প্রচুর দেশি মাছ পাওয়া যেত। যেগুলোর মধ্যে রয়েছেÑপাবদা, পুঁটি, শিং, কৈ, মাগুর, চিংড়ি ইত্যাদি। আজ আমরা এসব মাছ তেমন দেখতে পাই না। যদিও কালেভদ্রে দেখা যায়, সেগুলোর অধিকাংশ বাণিজ্যিকভাবে চাষাবাদ করা হয়। ফলে দেশি মাছের প্রকৃত স্বাদ পাওয়া যায় না। বর্তমান প্রজš§ আজ এসব দেশি জাতের মাছের কথা ভুলে যেতে চলছে। তাদের কাছে যখন দেশি মাছের কথা আলোচনা করা হয় তখন তারা এমন ভাব করে যেন এই নামগুলো এই প্রথম শুনছে। আর এমনটা তো করবে আজ আর বাজারে দেশি মাছগুলো দেখতে পাওয়া যায় না। যার ফলে বাঙালিদের যে একটা পরিচয় ছিল মাছে-ভাতে বাঙালি ওইটা আজ অন্তঃসারশূন্য বাক্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো, কীভাবে এই মাছগুলো বিলুপ্তির দিকে ধাবিত হচ্ছে? আসলে এই মাছগুলো এমনি এমনি বিলুপ্তি হচ্ছে না বরং বিলুপ্তি করা হচ্ছে। আজ আমরা অধিক ফলনের আশায় অতিমাত্রায় কীটনাশক ব্যবহার করছি। যেগুলো বৃষ্টির পানির মাধ্যমে নদী-খালে গিয়ে পৌঁছায়। আর এমনটা হওয়ার ফলে মাছগুলো মারা যায়। অন্যদিকে এসব মাছ যখন ডিম ফুটে বাচ্চা বের করবে ঠিক সে সময় এই মাছগুলো আহরণ করা হচ্ছে। এর ফলে এ মাছগুলো ডিম অবস্থায় ধরা পড়ছে। মাছগুলোর এমন ধরা পড়ার ফলে সম্ভাবনাময় অনেক মাছগুলো অকালে প্রাণ দিতে হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে আবার অতি ক্ষুদ্র মাছ আহরণ করা হয়; যার ফলে এই মাছগুলোর বিলুপ্তি নিশ্চিত। তাই এমন কাজ থেকে নিজেদের বিরত রাখা এখন সময়ের দাবি। কারণ ভবিষ্যতে আমরা আমাদের সংস্কৃতিকে গলাটিপে হত্যা না করিÑ এই প্রত্যাশা ব্যক্ত করি।

শিক্ষার্থী, আরবি সাহিত্য বিভাগ

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..