প্রচ্ছদ শেষ পাতা সাক্ষাৎকার

বিশ্ববাজারে আমাদের পণ্যের চাহিদা রয়েছে

এহসানুল হাবীব এস্কোয়্যার নিট কম্পোজিট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। এস্কোয়্যার গ্রুপের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। তিনি নতুন প্রজন্মের উদ্যোক্তাদের একজন। তার মতো উদ্যোক্তারা দেশের রফতানিভিত্তিক তৈরি পোশাকশিল্পকে এগিয়ে নিতে সহায়তা করছেন। যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিবিএ সম্পন্ন করেছেন। দেশে ফিরে এস্কোয়্যার গ্রুপে যোগ দেন। অল্প সময়ের মধ্যে সফল উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। তিনি টেক্সটাইলের সর্বশেষ উন্নয়নের খোঁজ রাখতে গভীর আগ্রহী। উন্নত বিশ্বের ব্যবস্থাপনা, বিপণন ও প্রযুক্তিগত জ্ঞান কাজে লাগিয়ে এস্কোয়্যার গ্রুপ এবং এর অঙ্গপ্রতিষ্ঠানগুলোকে এক ধাপ এগিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছেন। শেয়ার বিজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি কথা বলেছেন এস্কোয়্যার নিট কম্পোজিটের নানা দিক নিয়ে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন হাসানুজ্জামান পিয়াস

শেয়ার বিজ: আপনার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পাঠককে কীভাবে পরিচয় করিয়ে দেবেন?

এহসানুল হাবীব: এস্কোয়্যার গ্রুপের একটি অঙ্গপ্রতিষ্ঠান এস্কোয়্যার নিট কম্পোজিট লিমিটেড। শতভাগ রফতানিমুখী তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান। আমাদের গ্রুপের যাত্রা ১৯৭৪ সালে। আর টেক্সটাইল খাতে আসি ১৯৯৩ সালে ডায়িং ইন্ডাস্ট্রির মধ্য দিয়ে। এস্কোয়্যার ডায়িং ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৯৩ সালে। ২০০০ সালে এস্কোয়্যার নিট কম্পোজিট লিমিটেড। এটি ২০১৫ সালে পাবলিক লিমিটেড কোম্পানিতে রূপান্তরিত হয়। তাছাড়া আমরা নতুন একটি ইউনিটে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি। এজন্য বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে আইপিও’র মাধ্যমে পুঁজিবাজারে যাচ্ছি। শুরু থেকে প্রতিষ্ঠানটি সফলতার সঙ্গে ব্যবসা করে আসছে। এছাড়া বিশ্ববাজারে আমাদের পণ্যের চাহিদাও রয়েছে।

শেয়ার বিজ: বর্তমান বিশ্বে নিট পণ্যের চাহিদা ও বাংলাদেশের অবস্থান কেমন?

এহসানুল হাবীব: বিশ্বের সব দেশে নিট পণ্যের চাহিদা রয়েছে। বিশ্ববাজার লক্ষ করলে দেখা যায় নিট পণ্য রফতানিতে প্রথম স্থানে চীন, এরপরই রয়েছে বাংলাদেশ। দিন দিন এগিয়ে যাচ্ছে আমাদের এ খাত। আমাদের দেশের ভিশন-২০২১-এ রফতানির লক্ষ্যমাত্রা ৫০ বিলিয়ন ডলার নির্ধারণ করা হয়েছে। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে উদ্যোক্তাদের এগিয়ে আসতে হবে। সে অনুযায়ী তৈরি পোশাকের চাহিদা বাড়ছে। এতদিন আমরা বাংলাদেশ থেকে যে পণ্য রফতানি করতাম, সেগুলো ‘লো মিড রেঞ্জের’ পণ্য। এখন ‘মিড অ্যান্ড আপার’ রেঞ্জের দিকে যাচ্ছে। আগে আমরা শুধু গেঞ্জি বা শার্ট রফতানি করতাম। বর্তমানে এর সঙ্গে এখন ফ্যাশন ওয়ার্কও করা হয়। এতদিন বিদেশ থেকে ক্রেতারা নিজস্ব ডিজাইন নিয়ে আসতেন। আমরা ওই ডিজাইন কপি করে পণ্য তৈরি করে রফতানি করতাম। এখন আমরা নিজেরাই ডিজাইন করে ক্রেতাদের কাছে তুলে ধরছি। ভালো সাড়া পাচ্ছি।

শেয়ার বিজ: এস্কোয়্যার নিটের বর্তমান ক্রেতা দেশগুলো কোনগুলো?

এহসানুল হাবীব: আমরা মূলত ইউরোপিয়ান বাজারেই বেশি রফতানি করছি। ডেনমার্ক, নরওয়ে ও সুইডেনে বেশ কিছু ক্রেতা আছে। চাহিদাও দিন দিন বাড়ছে। আমাদের নর্থ আমেরিকান মার্কেটে উপস্থিতি কম। এর বাইরে আমাদের কিছু নন ট্রেডিশনাল বাজার আছে; যেমনÑচায়না ও রাশিয়া। আমরা অস্ট্রেলিয়ার বাজারে প্রবেশের চেষ্টা করছি। যেসব ব্র্যান্ড আমাদের ক্রেতা তালিকায় রয়েছে, তার মধ্যে সি অ্যান্ড এ, বেস্ট সেলার, অস্টিন, এসপিরিট, মাসকট, সেলিও, নেক্সট, টি জেইস, পুল অ্যান্ড বিয়ার প্রভৃতি অন্যতম।

শেয়ার বিজ: আপনারা কমপ্লায়েন্স কমপ্লাই করতে পারছেন?

এহসানুল হাবীব: বর্তমানে ভালো ক্রেতা পেতে হলে, ভালো রফতানি করতে গেলে কমপ্লায়েন্স ঠিক রাখা জরুরি। কমপ্লায়েন্স ঠিক না থাকলে ভালো ক্রেতাদের সঙ্গে কাজ করা সম্ভব নয়। ক্রেতাদের সঙ্গে আমরাও চাচ্ছি আমাদের ফ্যাক্টরিগুলো কমপ্লায়েন্ড থাকুক। কমপ্লায়েন্সের পাশাপাশি আমরা বর্তমান কারখানার সঙ্গে নতুন প্রজেক্টেও পরিবেশবান্ধব মেশিনারিজ ও গ্রিন কনসেপ্টকে মাথায় রেখে নতুন ভবন স্থাপনের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। পরিবেশের ওপর যেন কোনো বিরূপ প্রভাব না পড়ে, সেটি নিয়ে কাজ করছি। যেমন আমাদের সম্পূর্ণ পাওয়ারের একটা বড় অংশ রিনিউঅ্যাবল এনার্জি; যেমনÑসোলার পাওয়ার, হুইল পাওয়ারের মাধ্যমে আমাদের নতুন প্রজেক্টে কমপ্লাই করার চেষ্টা করছি। এনার্জি ইফিসিয়েন্সির দিকেও আমাদের বিশেষ নজর আছে। আগে একটা টিউবলাইট জ্বালাতে ৩৮ ওয়াট লাগতো, এখন সেটি ১০ ওয়াটের এলইডি লাইটের মাধ্যমে করা হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে খরচ একটু বেশি হলেও ভবিষ্যতে এর সুফল পাওয়া যাবে বলে আমি করি।

শেয়ার বিজ: এস্কোয়্যার নিট কম্পোজিট ‘হাইএন্ড’ কোনো পণ্য তৈরি করে কী?

এহসানুল হাবীব: আমাদের প্রধান পণ্য নিট কাপড় ও কাপড়জাত পণ্য। এর বাইরে আমরা কিছু নন ট্র্যাডিশনাল বা হাইএন্ড প্রডাক্ট রয়েছে। যেগুলো স্টোরে যায় না। ইউরোপের বিভিন্ন জায়গায় কর্মীদের পোশাক হিসেবে রফতানি করা হয়। ওই পোশাকগুলো বিশেষভাবে তৈরি করা হয়। পণ্যের মান অনেক ভালো। অনেক টেকসই কাপড়ের পোশাকের জন্যই এটি হাইএন্ড। কারণ শ্রমিকদের ব্যবহারে সহজে যেন নষ্ট না হয়, ঘামে ভিজলে বা রোদ-বৃষ্টিতে যেন কাপড়ের কোনো সমস্যা না হয়, সেভাবেই কাপড়গুলো তৈরি করা হয়।

শেয়ার বিজ: প্রতিষ্ঠানের কোন অর্জনকে বড় সফলতা হিসেবে দেখেন?

এহসানুল হাবীব: প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে বড় অর্জন ক্রেতা সন্তুষ্টি। আমাদের অর্জন বলতে এটাই। ক্রেতা যদি সন্তুষ্ট হন, কাপড় কিনতে আগ্রহী হন, তবেই আমরা সফল। আমাদের ফ্যাক্টরি কমপ্লায়েন্ড করলাম, কর্মীদের সন্তুষ্ট করলাম, প্রতিষ্ঠানকে সুন্দর করলাম কিন্তু ক্রেতা সংকট হলে ব্যবসা ভালো হবে না। যে কোনো প্রতিষ্ঠানেরই সফল হতে হলে ক্রেতা চাহিদা থাকা দরকার। সে হিসেবে আমাদের ক্রেতারা যেভাবে আমাদের সাহায্য করছেন। যেভাবে পণ্যের অর্ডার করছে, তাতে আমার মনে হয় এটাই সবচেয়ে বড় অর্জন।

শেয়ার বিজ: প্রতিষ্ঠানের জন্য বর্তমান চ্যালেঞ্জ কী?

এহসানুল হাবীব: চ্যালেঞ্জ তো প্রতিনিয়তই থাকে। বিশ্ববাজারে দাম পড়ে যাচ্ছে। ব্রেক্সিট হওয়ায় ইউরোপে মূল্যের দরপতন হয়েছে। আর তাদের ওই বিষয়টা আমাদের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে। তাদের অভ্যন্তরীণ ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে। যেমনÑআগে একটা টি-শার্ট তিন পাউন্ডে কিনতে পারতো; কিন্তু এখন আড়াই পাউন্ডে কিনতে চায়। ওই চাপটা আছে। আর অভ্যন্তরীণ কিছু চ্যালেঞ্জও আছে। যেমন ক্রেতারা চান খুব কম সময়ে পণ্য সরবরাহ করতে। আগে ক্রেতাদের কাছ থেকে অর্ডারের পর পণ্য তৈরির সময় পাওয়া যেত ১২০ থেকে ১৮০ দিন। কিন্তু এখন ৬০ দিনে চলে এসেছে। চ্যালেঞ্জ হলো, সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা। এছাড়া অবকাঠামোগত কিছু সমস্যাও আছে। যেমন বিদ্যুৎ, গ্যাসের ঊচ্চমূল্য। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের সঙ্গে আমাদের পার্থক্য হচ্ছে, তাদের সরকার অনেক এগিয়ে এসেছে। আমাদের এ প্রতিষ্ঠানে প্রচুর জনবল রয়েছে। সরকারের এখানে এগিয়ে আসা দরকার। তাছাড়া ব্যাংক ইন্টারেস্টও অন্য দেশের তুলনায় বেশি। এসব চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করছি।

শেয়ার বিজ: রানা প্লাজার মতো দুর্ঘটনা এ খাতে কেমন প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করেন?

এহসানুল হাবীব: এটি অনেক বড় একটা দুর্ঘটনা। একটা টার্নিং পয়েন্টও বলতে পারেন। ওই সময়ের পর থেকে ফ্যাক্টরিগুলো যেভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে, যেভাবে সবাই সচেতন হয়েছে, যে পরিমাণ কমপ্লায়েন্স কমপ্লাই করছেÑতা অতুলনীয়। ইউরোপ-আমেরিকার মতো অনেক উন্নত দেশের তুলনায় আমাদের দেশের প্রতিষ্ঠানগুলো ভালো কমপ্লায়েন্স মেনে চলছে।

শেয়ার বিজ: এস্কোয়্যার নিট নিয়ে আপনার স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা কী?

এহসানুল হাবীব: কীভাবে আরও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে পারি, কীভাবে বিশ্বে আরও সুযোগ সৃষ্টি করা যায়- সে লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছি। কীভাবে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো যায়, সেটা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করেই নতুন প্লান্ট স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। যেখানে দেশের প্রায় ১০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হবে। যা আমাদের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সঙ্গে দেশের জন্যও ভালো কিছু বয়ে আনবে।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..