প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে মুরগি খামারে সফল মোর্শেদ

মেহেদী হাসান, রাজশাহী : রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলার কিসমতমাড়িয়া গ্রামের বাসিন্দা মাহমুদ মোর্শেদ। তারা বাবা মোল্লা আব্দুল ওয়াহেদ ছিলেন উপজেলা চেয়ারম্যান। সেই সুবাদে আব্দুল ওয়াহেদ চার ছেলে ও তিন মেয়েকে বেশ শিক্ষিত করেছেন, শিখিয়েছেন স্বাবলম্বী হওয়ার মূলমন্ত্র। চার ভাইয়ের মধ্যে সবচেয়ে ছোট মোর্শেদ। পড়াশোনা শেষ করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগ থেকে। ২০০২ সালে বিএফএ ও এমএফএ ডিগ্রি নিয়ে নেমে পড়েন ক্ষেত-খামারে। সমাজের মানুষের টিপ্পনী উপেক্ষা করে মনোযোগ দেন চাষাবাদে। আম বাগান, মাছ চাষ ও ফসলের ক্ষেত হয়ে ওঠে মোর্শেদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। অবশেষে মুরগির খামারেও সফল হলেন মোর্শেদ।

সরেজমিনে গিয়ে তার পোলট্রি সেক্টরের বিষয়ে বেশ আলাপ-আলোচনা করা হয়। বাবার আম বাগানের ভেতর বিঘা দুয়েক জমির ওপর করেছেন পোলট্রি খামার। সাদা লেয়ার ও লাল লেয়ার পুষছেন এখানে। বর্তমানে তার খামারে দুই হাজার ৮০০ লাল লেয়ার রয়েছে। ডিম দিচ্ছে ৯৩ শতাংশ মুরগি। বাজারে এসব ডিমের প্রতিটি পাইকারি হিসেবে তিনি বিক্রি করছেন ১০ টাকা দরে। সে হিসেবে প্রতিদিন প্রায় দুই হাজার ৬০০ ডিম পাচ্ছেন তিনি। আর বাজারদর হিসেবে ২৬ হাজার টাকা আসছে ডিম থেকে।

তিনি জানান, দুই হাজার ৮০০ মুরগিকে প্রতিদিন প্রায় সাত বস্তা খাবার খাওয়াতে হয়। প্রতিবস্তা খাবার দুই হাজার ৮০০ টাকা হিসেবে তাতে খরচ হয় প্রায় সাড়ে ১৯ হাজার টাকা। ২৬ হাজার টাকার মধ্যে ১৯ হাজার খরচ হলে প্রতিদিন তার পকেটে ঢুকছে প্রায় সাত হাজার টাকা। তবে এ সাত হাজারের মধ্যে হাজার দুয়েক টাকা অন্যান্য খরচ করার ফলে তার টেকে পাঁচ-ছয় হাজার টাকা।

মাহমুদ মোর্শেদ বলেন, লেয়ার মুরগিতে এখন বেশ লাভ হচ্ছে। ডিমের দাম যদি সাড়ে ৯ টাকা থেকে ১০ টাকার মধ্যে থাকে, তাহলে প্রতিটি খামারি লাভবান হতে পারবেন। আমি সবকিছু (খাবার, ভ্যাকসিন, মেডিসিন) নগদ টাকায় কিনি। ধরুন, কোম্পানি রেটে দুই হাজার ৮০০ টাকা বস্তা খাদ্য পাই আমি। এ খাদ্য অন্যান্য খামারিরা তিন হাজার টাকা দরে কিনে। ডিলার প্রতিবস্তায় লাভ নেয় ২০০ টাকা। যদি মাসে ২০০ বস্তা খাবার কিনতে হয়, আর ২০০ টাকা করে বাড়তি হয়, তাহলে প্রায় ৪০ হাজার টাকা ডিলারের পকেটে গেল। তিনি বলেন, লাভের অংশ যদি ডিলারের পকেটে যায়, তাহলে খামার টিকিয়ে রাখতে পারবেন না। এ কারণেই রাজশাহীর অনেক ছোট খামার বন্ধ হয়ে গেছে।

পোলট্রি সেক্টরের সমস্যার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ডিম-মুরগির দামে ওঠানামা এ সেক্টরের সবচেয়ে বড় সমস্যা। সবচেয়ে বড় বিষয় শক্তিশালী সিন্ডিকেট রয়েছে, যারা খাদ্যের দাম বৃদ্ধি করে প্রান্তিক পোলট্রি খামারিদের পথে বসিয়েছে। আগে ডিলাররা খাবার, ওষুধ বাকিতে দিত, কিন্তু এখন আর তারা দেয় না। ফলে পুঁজি খাটিয়ে ব্যবসা করা ছাড়া যারা বাকিতে ব্যবসা করত, সে খামারগুলো বন্ধ হয়ে গেছে।

পোলট্রিতে লাভের টাকায় কৃষির অন্যান্য সেক্টরে বিনিয়োগ করেন কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার ১৫ বিঘার মতো পুকুর আছে। বছরের পুরোটা সময় জুড়ে পোলট্রির টাকা দিয়ে মাছের খাবার ও গরুর খামারে বিনিয়োগ করি। মাছ ধরি বছরে একবার। ৯ থেকে ১০ কেজি ওজনের মাছ হলে, সেগুলো তুলে ঢাকায় বিক্রির জন্য পাঠিয়ে দিই। একবারে পাঁচ লাখ কিংবা সাত লাখ টাকা আসে। এদিকে পোলট্রি থেকে বছরে ১২ থেকে ১৩ লাখ টাকা আসে। সবমিলিয়ে বছরে ২০ লাখ টাকা লাভ হয়।

একজন কৃষি উদ্যোক্তা হিসেবে আশেপাশের মানুষদের সহযোগিতা কতটুকু করতে পারেনÑএমন প্রশ্নে মোর্শেদ বলেন, আমি আমার আশেপাশের গরিব মানুষদের গাভি কিনে দিই। আর গাভির বাচ্চা হওয়ার পর অর্ধেক টাকা আমি নিই। পরে গাভি দিয়ে দিই। আশেপাশের অন্তত ১০ থেকে ১২ পরিবারের পাশে দাঁড়াতে পেরেছি। আমার খামারে মোট তিনজন কাজ করেন। তাদের প্রত্যেকের মাসিক বেতন ১২ হাজার টাকা। এই খামারের সঙ্গে থেকে অনেকেই স্বাবলম্বী হয়েছেন। আমি চাই আমার খামারটা আরও বাড়াতে, যাতে অনেক মানুষের কর্মসংস্থান করতে পারি। কৃষির সেক্টরভিত্তিক বিনিয়োগে যেমন নিজে লাভবান হওয়া যায়, তেমনি আশেপাশের মানুষেরও কর্মসংস্থান হয়।

জানতে চাইলে জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মো. জুলফিকার আখতার হোসেন বলেন, এখন ডিম-মুরগির দাম বেড়েছে। আগের বন্ধ হওয়া খামার এখন চালু হচ্ছে। আমরা প্রতিনিয়ত খামারিদের পরামর্শ প্রদান করছি। তাদের প্রয়োজনে সবসময় প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর পাশে আছে।