প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্প প্রতিষ্ঠানের যোগাযোগ বৃদ্ধি ব্যাপক সুফল দেবে

ড. এম মুহিবুর রহমান: বিশ্ববিদ্যালয়ের মূলত দুটি উদ্দেশ্য রয়েছে। এক. শিক্ষাদানের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষিত জনগোষ্ঠী হিসেবে তৈরি করা। দুই. গবেষণার মাধ্যমে নতুন জ্ঞান তৈরি করা। কিন্তু বর্তমান যুগের চাহিদা হলো—এ জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে দেশের কল্যাণে সম্পদ বৃদ্ধি করা, যার জন্য উদ্ভাবনীমূলক গবেষণা সবচেয়ে জরুরি। বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় বাস্তবায়নাধীন উচ্চশিক্ষা মানোন্নয়ন প্রকল্পের একাডেমিক উদ্ভাবনী ফান্ড উপাংশে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় মানসম্মত শিক্ষা ও গবেষণার জন্য সহায়ক সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে প্রায় ৪০০ কোটি টাকার ১৯৬টি উপ-প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছে। সন্তোষজনক বাস্তবায়নের পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্বব্যাংক প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধিসহ অতিরিক্ত আরও ১২৫ মিলিয়ন ডলার দিয়েছে। এ অতিরিক্ত অর্থ থেকে একাডেমিক উদ্ভাবনী ফান্ডের তৃতীয় রাউন্ডের জন্য ২৪০ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্প-প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কোলাবরেটিভ গবেষণার জন্য একাডেমিক উদ্ভাবনী ফান্ডে ৯৮ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এ অর্থ দ্বারা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের প্রতি উপ-প্রকল্পে আট কোটি টাকা পর্যন্ত অর্থায়ন করা হচ্ছে। গবেষণালব্ধ জ্ঞানকে সাধারণ মানুষের কল্যাণে সম্পদে রূপান্তর করার কৌশল উদ্ভাবন করাই হবে এ ধরনের উপ-প্রকল্পের লক্ষ্য। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় রয়েছেন বিজ্ঞ-পরিপক্ব গবেষক এবং তরুণ শিক্ষার্থী। আগামী দিনের চাহিদা সম্পর্কে তরুণদের রয়েছে সঠিক ধারণা। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় রয়েছে গবেষণাগার। অন্যদিকে শিল্প-প্রতিষ্ঠানগুলোয় রয়েছে বর্তমান বাজারের চাহিদা, উৎপাদনের মানোন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা এবং উৎপাদন প্রক্রিয়ার সমস্যা সম্পর্কে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা। অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠানে গবেষণা সহায়ক আধুনিক যন্ত্রপাতি রয়েছে। সুতরাং বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত প্রচেষ্টায় গবেষণার মাধ্যমে আর্থিকভাবে লাভজনক জ্ঞান অর্জনের সুযোগ রয়েছে। এ আর্থিক লাভের অংশ সাধারণ মানুষও সরাসরি পেতে পারে। যেমন গবেষণার মাধ্যমে একটি ওষুধের উৎপাদন খরচ কমানো সম্ভব হলে কম মূল্যে সেটি বাজারে পাওয়া যাবে।

শিল্পপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা করার জন্য দেশে প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবলের অভাব বোধ করেন ব্যবসায়ী ও শিল্পমালিকরা। টেক্সটাইল ও তৈরি পোশাক কারখানা পরিচালনার জন্য পার্শ্ববর্তী দেশগুলো থেকে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার বা ফ্যাশন ডিজাইনার আনতে হয়। সরকার এ সমস্যা মোকাবিলায় এরই মধ্যে পদক্ষেপ নিয়েছে। টেক্সটাইল কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীত করা হয়েছে। বেসরকারি খাতে ফ্যাশন ডিজাইন ও টেকনোলজি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে টেক্সটাইল টেকনোলজির ডিগ্রি প্রোগ্রাম চালু করা হয়েছে। তবে ‘ফরোয়ার্ড লিংকেজ’-এর উদ্দেশ্যে প্রয়োজনীয় গবেষণার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোয় উদ্যোগের অভাব রয়েছে। কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে টিকে থাকতে হলে উৎপাদিত পণ্যের মানোন্নয়ন, আগামী দিনের চাহিদা অনুযায়ী নতুন পণ্য উদ্ভাবন এবং উৎপাদন ব্যয় কমানোর জন্য গবেষণা চালিয়ে যেতে হয়। যেমন, তৈরি পোশাক ও বস্ত্র শিল্পের ক্ষেত্রে ন্যানো প্রযুক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে ‘স্মার্ট টেক্সটাইল’ উদ্ভাবনের জন্য বিভিন্ন দেশে গবেষণা চলছে। যেসব বস্ত্রে ভাঁজ পড়ে না, আগুন ধরে না বা যেগুলোয় ময়লা আটকে থাকে না—এ ধরনের বস্ত্রের চাহিদা রয়েছে। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশগুলোয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো এ লক্ষ্যে গবেষণার জন্য বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করছে। সরকারও অর্থ জোগান দিচ্ছে। যথাসময়ে এ উদ্ভাবনী প্রতিযোগিতার জন্য উদ্যোগ নেওয়া না হলে অদূর ভবিষ্যতে আমাদের অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিশ্বের উন্নত দেশগুলোয় এমনকি আমাদের প্রতিবেশী ভারত বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণালব্ধ তথ্য-উপাত্ত উদ্যোক্তাদের কাছে বাজারজাত করা, গবেষকদের মেধাস্বত্ব সংরক্ষণ ও পেটেন্ট করার উদ্দেশ্যে সহায়তার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা রয়েছে। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পাঙ্গনের মধ্যে যোগাযোগ ও সহযোগিতামূলক সম্পর্ক তৈরি করার জন্য চালু রয়েছে বিভিন্ন প্রোগ্রাম। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় অনেক বিজ্ঞানী উন্নতমানের গবেষণা করছেন এবং তাদের অনেক উদ্ভাবনীমূলক আবিষ্কার রয়েছে। কিন্তু বেশিরভাগ আবিষ্কার পেটেন্ট করা হচ্ছে না। এ গবেষকদের সহায়তা দেওয়ার জন্য আমরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় টেকনোলজি ট্রান্সফার অফিস বা টিটিও প্রতিষ্ঠা করার উদ্যোগ নিয়েছি। এ লক্ষ্যে উপ-প্রকল্প প্রস্তাব আহ্বান করা হয়েছে এবং কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রস্তাব পাওয়া গেছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা সংশ্লিষ্ট শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করবেন এবং যৌথভাবে গবেষণার ক্ষেত্র ও বিষয় চিহ্নিত করে উপ-প্রকল্প তৈরি করবেন। গবেষণাকর্ম সম্পাদন করতে অভিজ্ঞ পিএইচডিধারী বিজ্ঞানীকে পোস্টডক্টরাল গবেষণা ফেলো হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হবে। মেধাবী ও যোগ্য বিজ্ঞানীদের আকর্ষণ করার জন্য মাসিক ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা ফেলোশিপ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশি বিজ্ঞানীদের এ ফেলোশিপ আকর্ষণ করতে সমর্থ হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অভিজ্ঞ শিক্ষকও ছুটি নিয়ে পোস্টডক্টরাল ফেলো হিসেবে উপ-প্রকল্পের আওতায় গবেষণা করতে পারবেন।

অন্যান্য দেশের তুলনায় আমরা বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানে যোগাযোগ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একটু পিছিয়ে আছি। তৈরি পোশাকের ক্ষেত্রে আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলোই আমাদের প্রাথমিক প্রতিদ্বন্দ্বী। ভবিষ্যতে কী ধরনের কাপড়ের জনপ্রিয়তা বাড়বে, তা জানা জরুরি। ধারণা করা হচ্ছে, সামরিক বাহিনীর জন্য তাপ, আগুন ও পানি প্রতিরোধক অর্থাৎ সেলফ ডিফেন্স পোশাকের চাহিদা বাড়বে। এ ব্যাপারে নতুন টেকনিক প্রণয়নে শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান ও ভারতে এরই মধ্যে গবেষণা শুরু হয়েছে। আমাদের ইন্ডাস্ট্রি এ ব্যাপারে সজাগ বলে মনে হয় না। সে মোতাবেক কোনো কাজ শুরু হয়নি। আমাদের শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোয় রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট সেক্টরের উন্নতি না হলে একটা পর্যায়ে এসব শিল্পের অগ্রগতি থেমে যাবে। এ অবস্থায় অতীতে পাটসহ বেশ কয়েকটি খাতের শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়েছে। এতে দেশের আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি বেকারের সংখ্যাও বাড়ে। এ সমস্যা সমাধানে শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সহযোগিতামূলক গবেষণা ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা এরই মধ্যে এ প্রকল্প নিয়ে বেশ আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে হয়তো আমাদের পরিকল্পনার ঘাটতির জন্য বাংলাদেশের বড় তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় অর্থাৎ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে টিটিও প্রতিষ্ঠার জন্য প্রকল্প প্রস্তাব জমা পড়েনি। তবে পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয় টিটিও প্রতিষ্ঠা করতে চায়। কেন্দ্রীয়ভাবে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনেও এ ধরনের একটি অফিস প্রতিষ্ঠা করার সম্ভাবনা বিবেচনা করা যায়।

ফার্মাসিউটিক্যাল সেক্টর থেকে বেশ ভালো সাড়া পাওয়া গেছে। আগে থেকেই যোগাযোগের জন্য এ খাতে ভালো সাড়া পাওয়া গেছে। তারা এ প্রোগ্রামে কাজ করতে বেশ আগ্রহী বলে মনে হয়েছে। টেক্সটাইল খাতেও অনেক গবেষণার সুযোগ আছে। তৈরি পোশাক শিল্পমালিকরাও আগ্রহ ব্যক্ত করেছেন। সংশ্লিষ্ট শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে আগ্রহী করতে আরও উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

গবেষণা করতে গেলে নতুন সমস্যা দেখা দেবে, এটিই স্বাভাবিক। আমাদের কাজ হলো উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে উদ্ভূত সমস্যার সুন্দর সমাধান। সমস্যা এলেই তার সমাধানে বিজ্ঞানীরা আগ্রহী হন। যদি কোনো ধরনের নেতিবাচক দিক আসে, তাহলে শিক্ষক-বিজ্ঞানীরা তার সময়োপযোগী সমাধান করবেন বলে আশা করি।

 

লেখক: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের সাবেক অধ্যাপক

বাংলাদেশ সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে চলমান হায়ার এডুকেশন কোয়ালিটি এনহ্যান্সমেন্ট প্রজেক্টের ভারপ্রাপ্ত প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন