দিনের খবর মত-বিশ্লেষণ

বিশ্বায়ন ও বিয়ে সংস্কৃতি

ফারহানা ইয়াসমিন: সমাজ ও সভ্যতা সংস্কৃতির মাধ্যমে উদ্ভাসিত হয়, কারণ সংস্কৃতি মানব অস্তিত্বের প্রতীক ও সভ্যতার ফল। গাছ যেমন তার ফল দ্বারা স্বীকৃত হতে পারে, তেমনি একটি সমাজকে তার সংস্কৃতির রূপরেখা দ্বারা চিহ্নিত করা যায়। বিশ্বের অন্যতম আলোচিত বিষয় হলো বিশ্বায়ন। এটি বিশ্ব সমাজবিজ্ঞানীদের মূল ফোকাসে পরিণত হয়েছে। এটি একটি সর্বমোট প্রক্রিয়া। প্রখ্যাত তাত্ত্বিক ও সমাজবিজ্ঞানী রোনাল্ড রবার্টসন একে বিশ্বের সংকোচনের এবং আন্তঃনির্ভরতা বলে অভিহিত করেছেন। বর্তমান বিশ্ব তথ্যপ্রযুক্তি জগতের। তথ্যপ্রযুক্তির এই অগ্রগতি বিশ্ব সম্প্রদায়কে বিশ্বায়ন নামক প্রক্রিয়া শুরু করার একটি সুযোগ এনে দিয়েছে। প্রকৃতপক্ষে বিশ্বের প্রতিটি অংশের সঙ্গে অন্যের অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্তঃনির্ভরতা বিশ্বায়নের মূল চাবিকাঠি।

বিশ্বায়ন সংস্কৃতিতেও একটি নতুন মাত্রা যুক্ত করেছে। কয়েক দশক আগে মানব সংস্কৃতিতে যে মানসিকতা ছিল, তা এখন আর লক্ষণীয় নয়। সময় ও বিশ্বায়নের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে লোকেরা নতুন সংস্কৃতিকে স্বাগত জানায় এবং পুরনোটিকে বিদায় জানায়। একইভাবে বিয়ে সংস্কৃতিতে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে।

গত শতকের আশি বা নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশের মুসলিম বা হিন্দু বিয়ে আজকের অনুষ্ঠান থেকে খুব আলাদা ছিল। সেই সময়ে বিয়ের অনুষ্ঠানে আত্মীয়রা প্রধান অতিথি ছিলেন, তারপর ছিলেন প্রতিবেশী ও বন্ধুরা। বাড়িতে বাড়িতে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো। যারা ভাড়া বাসায় থাকতেন, তাদের বিয়ে ছাদে বা উঠানে কোনো আত্মীয় বা প্রতিবেশীর বাড়িতেই হতো। বিয়ে হলুদ থেকে শুরু হতো। ‘হলুদ বাটো, মেহেদি বাটো …’ প্রভৃতি গানের পাশাপাশি কাঁচাহলুদ বাটা হতো। অর্থাৎ একদিকে গান বাজত, অন্যদিকে কাঁচা হলুদ ও মেহেদিপাতা বাটা হতো।

এরপর ছাদে বা উঠানে একটি প্রীতিভোজ অনুষ্ঠিত হতো। নবদম্পতিকে তাদের ঘরোয়া জীবনে প্রয়োজনীয় জিনিস উপহার দেয়া হতো। কনের সাজসজ্জাও ছিল সাধারণ। গাছের তাজা ফুল খোঁপায় দেয়া হতো, সাধারণ কটন বা জামদানির শাড়ি বা বেনারসি শাড়ি বিয়ের দিন কনেকে পরানো হতো, চোখে কাজল লাগানো হতো। কনে সাজানোর ভার পড়ত আত্মীয় বা প্রতিবেশীদের মধ্যে যে ভালো সাজাতে পারত তার ওপর। বিয়েতে এই যে আত্মীয়-প্রতিবেশীদের সমাগম, তারা কিন্তু নিজেরাই কাজ ভাগ করে নিতেন। এমনকি কোমরে গামছা বেঁধে তারা নেমে পড়তেন খাবার পরিবেশনের কাজেও। ফলে যে পরিবারে মেয়ের বিয়ে তাদের ওপর চাপ অনেক কমে যেত। বিয়েতে অর্থ খরচের বাহুল্য তেমন চোখে পড়ত না। অথচ আনন্দের কোনো কমতি ছিল না। প্রতিটির মেয়েরই জীবনে সাধ থাকে বিয়ের দিনটিতে তাকে যেন রাজরানীর মতো লাগে। তখনকার সেই সাজে মেয়েটি কিন্তু তৃপ্ত ছিল, তার স্বপ্ন ভঙ্গ হতো না। বিদায়বেলা দেখা যেত কান্নার সমাগম।

তবে চিত্রটি বর্তমান দশকে পরিবর্তিত হচ্ছে। বাংলাদেশের শহরগুলোয় অনেক বিল্ডিং ও অ্যাপার্টমেন্ট নির্মিত হয়েছে। এতে জায়গা পাওয়া না গেলে বা গেলেও অনেকে কমিউনিটি সেন্টার ভাড়া করছেন। এতে কোনো সমস্যা নেই, তবে সমস্যাটি অন্য কোথাও। হিন্দি সিরিয়াল ও বলিউডের প্রভাবের ফলে অনেক অভিজাতরা একটি নতুন সংস্কৃতি শুরু করেছেন, যেমনÑহলুদ নাইট, মেহেদি নাইট, ডিজে গান। হিন্দু বিয়ের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। হিন্দু বিয়ের আগে মেয়েটিকে হলুদ দিয়ে গোসল করানো হতো। এখন গায়েহলুদের জন্য আলাদা অনুষ্ঠান হয়, মেহেদি পরানোর জন্য আলাদা অনুষ্ঠান হয় এবং পার্লারে যাওয়া বাধ্যতামূলক। কেবল পাত্রী নয়, বর ও দুই পরিবারের আত্মীয়স্বজন, বন্ধু ও পরিচিতি সবাই পার্লারে গিয়ে ভিড় করে। তারপরে রয়েছে ব্রাইডাল শো, ফটোগ্রাফি, ভিডিও ও রিসেপশন পার্টি। ডিজিটাল অগ্রগতির কারণে এই সংস্কৃতিটি কেবল শহরগুলোয় নয়, গ্রামেও ছড়িয়ে পড়েছে। আস্তে আস্তে বিয়ে সংস্কৃতি তার নিজস্বতা হারাচ্ছে। আর একই সঙ্গে এই বিয়ে সংস্কৃতি কৃত্রিমতায় ডুবে যাচ্ছে।

বর্তমানে বাংলাদেশে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা মানবীয় মর্যাদার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আজকাল প্রতিযোগিতা চলছেÑকে বিয়েতে কত বড় ও কত বেশি জমকালো আয়োজন করতে পারে এবং বেশি অর্থ ব্যয় করতে পারে। তবে আসলেই কি এত কিছুর দরকার আছে?

প্রশ্ন হচ্ছে, সুখের স্তর কি আগের চেয়ে বেড়েছে? মনে হয় না। কারণ অনেক বাবা-মা এত অর্থ ব্যয় করার প্রতিযোগিতায় নিঃস্ব হয়ে যান। তারা তাদের মেয়ে বা ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে জমকালো বিয়ে নামক এই প্রতিযোগিতায় ঝাঁপিয়ে পড়েন। তবে এর কি কোনো দরকার আছে? পরিবার, আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধব নিয়ে ছোটখাটো আয়োজন করলে কি মর্যাদা বা আভিজাত্যের ক্ষতি হয়? নিকটতম ও পছন্দের লোকদের আশীর্বাদ যা সর্বাধিক প্রয়োজন, তা দিয়ে বিয়ের যাত্রা শুরু করা কি যায় না? যদি বাবা-মা সত্যিই ধনী হন, তবে জীবনের এই বিশেষ মুহূর্তটিকে কি আরও ভালো কাজের মাধ্যমে আরও স্মরণীয় করে তোলা যায় না?

বিশ্বায়নের কারণে আমরা ক্রমাগত আমাদের নিজস্ব ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি থেকে দূরে সরে যাচ্ছি। তাই জমকালো বিয়ের ব্যবস্থা করার আগে দুবার চিন্তা করুন এবং আপনার দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করুন।

শিক্ষার্থী, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..