মনিরুল হক : ঢাকার একটা ছোট অফিস রুম, ২০২৫ সালের রাত। রিমা, ২৫ বছরের এআই স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠাতা, ল্যাপটপের স্ক্রিনে চোখ টিপে দেখছেন চীনের বাইটড্যান্সের নতুন জেনারেটিভ এআই মডেলের খবর। তার ছোট টিম ছয় মাস ধরে একটা চ্যাটবট বানাচ্ছে কৃষকদের জন্য, কিন্তু ফান্ডিং নেই, ডেটা নেই, স্কিলড ডেভেলপার নেই। ‘কেন আমরা এত পিছিয়ে?’Ñরিমা ভাবেন। পাশের ভারতে একটা স্টার্টআপ এক কোটি ডলার ফান্ড তুলেছে, সিঙ্গাপুরে সরকার এআই হাব বানাচ্ছে। বাংলাদেশ একটা জাতীয় এআই স্ট্র্যাটেজি ২০২০ সাল থেকে ধুলো খাচ্ছে। এই গল্প রিমার মতো হাজারো যুবকের, যারা বিশ্বের এআই দৌড়ে দৌড়াতে চায়, কিন্তু দেশের পিছিয়ে পড়া রাস্তায় আটকে আছে। সারা বিশ্ব এআই নিয়ে উড়ছে, কিন্তু বাংলাদেশ পিছিয়ে। সরকারি, বেসরকারি এবং একাডেমিয়া কেন এই সুযোগকে গুরুত্ব দেয় না? ভারত, চীন, সিঙ্গাপুর ও পাকিস্তানের সঙ্গে তুলনা করে দেখি এই হতাশার গল্প এবং কয়েকটা আলোর রেখা।
কল্পনা করুন একটা ম্যারাথন দৌড়ে চীন ও আমেরিকা সামনে ছুটছে, ভারত পাশে, সিঙ্গাপুর ছোট হয়েও লিডার। বাংলাদেশ পেছনে হাঁটছে, জুতো ছেড়ে দিয়েছে। গ্লোবাল এআই ইনডেক্সে ২০২৫ সালে বাংলাদেশ ৮৩ দেশের মধ্যে ৭৫ নম্বর, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার সামান্য ওপরে। চীন ২ নম্বর, ভারত ১০-এর মধ্যে, সিঙ্গাপুর শীর্ষ ৫-এ। এআই অ্যাডপশনে আমেরিকা-চীনের গ্যাপ বাড়ছে, তৃতীয় বিশ্ব পিছিয়ে পড়ছে।
বাংলাদেশে ২০২০ সালে জাতীয় এআই স্ট্র্যাটেজি ঘোষণা হয়, ‘এআই ফর অল’-স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও কৃষিতে ফোকাস। কিন্তু ছয় বছর পরও বাস্তবায়ন নেই। আইসিটি ডিভিশন ১৮ মন্ত্রণালয়কে টার্গেট দেওয়ার কথা বলেছিল, কিন্তু হাই-পারফরম্যান্স কম্পিউটিং সেন্টার নেই, ডেটা ইনফ্রাস্ট্রাকচার দুর্বল। সরকার এটুআইয়ের মাধ্যমে কিছু পাইলট প্রোজেক্ট করেছেÑচ্যাটবট কৃষক সহায়তা, কোভিড ট্র্যাকার; কিন্তু স্কেল নেই। বেসরকারি খাতে স্টার্টআপগুলো ফান্ডিংয়ের অভাবে কুঁজো হয়ে আছে। একাডেমিয়া? বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় এআই কোর্স আছে, কিন্তু রিসার্চ হাব নেই। সরকার কেন এই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেয় না? বাজেটে এআইয়ের জন্য কম বরাদ্দ, পিপিপি মডেল দুর্বল। বেসরকারি উদ্যোক্তারা বলেন, ‘ফান্ডিং নেই, ডেটা অ্যাক্সেস নেই, স্কিলড মানুষ নেই।’ এই অবহেলায় বাংলাদেশ এআইয়ের ২৫ বিলিয়ন ডলার জিডিপি বুস্ট হারাচ্ছে।
দিল্লির একটা স্টার্টআপ অফিসে রাত ২টা। রাহুলের টিম চ্যাটজিপিটির বাংলা ভার্সন বানাচ্ছে কৃষকদের জন্য। ২০২৪ সালে ভারত এআই স্টার্টআপে আট বিলিয়ন ডলার ফান্ড তুলেছে। সরকার ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে ন্যাশনাল এআই মিশন চালু করেছেÑকৃষি, স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় এআই। কৃষি এআই অ্যাপ তিন মিলিয়ন কৃষককে ফসলের পূর্বাভাস দেয়। বেঙ্গালুরু এআই হাব, ইনফোসিস-টিসির মতো জায়ান্টরা এক লাখ কর্মীকে এআই ট্রেনিং দেয়। একাডেমিয়া আইআইটি-গুলোতে গ্লোবাল রিসার্চ। ফল? ভারত গ্লোবাল এআই ইনডেক্সে ১০-এর মধ্যে। বাংলাদেশ কেন শেখে না এই মডেল? সরকারের বাজেট ভারতের ১/১০ও নয়।
বেইজিংয়ের ল্যাবে ২০৩০ সালের স্বপ্ন দেখে হাজারো সায়েন্টিস্ট। চীন ১৫০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে এআই সুপার পাওয়ার হচ্ছে। বাইটড্যান্স (টিকটক) ১১ শতাংশ গ্লোবাল এআই কোম্পানি, হুয়াওয়ে ও আলিবাবা কুয়েন মডেল লঞ্চ। সরকার মেড ইন চায়না ২০২৫ এআইয়ে ফোকাস। বেসরকারি হাইকুয়ান রিসার্চ ৩০০ মডেল ওপেন-সোর্স করে। একাডেমিয়া টসিংহুয়া বিশ্বের শীর্ষে। ফল? চীন গ্লোবাল এআই ইনডেক্সে ২। বাংলাদেশের স্টার্টআপগুলো চীনের মতো ফান্ডিং পেলে কী হতো? সরকার কেন পিপিপি তৈরি করে না ।
সিঙ্গাপুরের রাস্তায় এআই ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট কনজেশন ২০ শতাংশ কমিয়েছে। ন্যাশনাল এআই স্ট্র্যাটেজি ২০১৯ থেকে চালু, ১ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ। স্মার্ট নেশন প্রোগ্রাম স্বাস্থ্য স্ক্রিনিং অ্যাপে ডায়াগনোসিস দ্রুত করে। এআই অ্যাপ্রেন্টিসশিপ ১ হাজার চাকরি তৈরি। বেসরকারি গ্রাব, সিঙ্গাপুর এয়ারলাইনস এআই ব্যবহার করে। ফল? গ্লোবাল এআই ইনডেক্সে শীর্ষ ৫। বাংলাদেশের জনসংখ্যা সিঙ্গাপুরের ৩০০ গুণ, কেন আমরা এআই হাব হতে পারি না? সরকার কেন হাই-টেক পার্কে এআই স্যান্ডবক্স বানায় না ।
ইসলামাবাদের স্টার্টআপে আশা। পাকিস্তান ন্যাশনাল এআই পলিসি ২০২৩ চালু, এক বিলিয়ন ডলার ফান্ড। করাচি এআই হাব, আইইটিগুলোতে এআই কোর্স। স্টার্টআপগুলো কৃষি এআই বানাচ্ছেÑগ্লোবাল ইনডেক্সে বাংলাদেশের নিচে, কিন্তু দ্রুত এগোচ্ছে। আমরা কেন পিছিয়ে? একাডেমিয়ায় এআই ল্যাব নেই।
কিন্তু আশা আছে। ঢাকার ২২ নম্বরে রিমার স্টার্টআপ ‘কৃষি বোট’ কৃষকদের পোকা-রোগের পূর্বাভাস দেয়, এটুআইয়ের সাহায্যে ১০ হাজার কৃষক সংযুক্ত। চট্টগ্রামের ‘হেলথএআই’ গ্রামীণ ডাক্তারদের সাহায্য করে। বুয়েটের শিক্ষার্থীদের এআই চ্যালেটজে বাংলা মডেল তৈরি। বেসরকারি ৯৭.এআই ভাইভ সিস্টেমস গ্লোবাল ক্লায়েন্ট পায়। স্টার্টআপ বাংলাদেশ ১৫০+ স্টার্টআপে ৫৭ মিলিয়ন ডলার দিয়েছে; কিন্তু এগুলোয় ফ্লাশ ইন দ্য প্যান স্কেল নেই। সরকার কেন এদের বড় করতে সাহায্য করে না? বেসরকারি কেন স্কেলিংয়ে বিনিয়োগ করে না? একাডেমিয়া কেন রিসার্চ পাবলিশ করে না ।
সরকারের এআই স্ট্র্যাটেজি কাগজে সীমাবদ্ধ। হাই-টেক পার্ক আছে, কিন্তু এআই স্যান্ডবক্স নেই। বাজেটে ০.০১ শতাংশ এআইয়ের জন্য। পিপিপি দুর্বল। বেসরকারি উদ্যোক্তারা শর্ট-টার্ম লাভে আটকে, এআইয়ে বিনিয়োগ করে না। একাডেমিয়া থিওরি পড়ে, রিয়েল-ওয়ার্ল্ড প্রজেক্ট নেই। ফল আমরা পাকিস্তানেরও পেছনে।
সিঙ্গাপুরের রাস্তায় এআই ট্রাফিক কনজেশন কমিয়েছে। ন্যাশনাল এআই স্ট্র্যাটেজি স্বাস্থ্যস্ক্রিনিং দ্রুত করে। অ্যাপ্রেন্টিসশিপ এক হাজার চাকরি তৈরি। আমরা কেন শেখি না । ভারতের কৃষক অ্যাপ এআইয়ে ফসলের পূর্বাভাস পায়, তিন মিলিয়ন সাহায্য পেয়েছে। সরকার ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন বিনিয়োগ। বাংলাদেশের কৃষক কেন অপেক্ষা করবে?? আলিবাবার কুয়েন ৭০০ মিলিয়ন ডাউনলোড, ৩০০ মডেল ফ্রি। সরকারের ১৫০ বিলিয়ন বিনিয়োগ। আমাদের স্টার্টআপ কেন এমন সাপোর্ট পায় না ।
পাকিস্তান এক বিলিয়ন ফান্ড, করাচি হাব। আমরা কেন পিছিয়ে? রিমার ‘কৃষি বোট’ ১০ হাজার কৃষককে সাহায্য করেছে। বুয়েটের ছেলেরা বাংলা এআই বানাচ্ছে। ৯৭.এআই গ্লোবাল ক্লায়েন্ট পায়। এগুলোকে বড় করুন, দেশ বদলে যাবে।
রিমা জানালার বাইরে দেখেন ঢাকার আলো। ‘আমরা পারব,’ তিনি ভাবেন। সরকারি, বেসরকারি, একাডেমিয়া-এখনই হাত মিলিয়ে এআই বিপ্লবে যোগ দিন। তা না হলে বিশ্ব আমাদের ছেড়ে যাবে।
প্রিন্ট করুন








Discussion about this post