সুশিক্ষা

বিশ্ব শিক্ষক দিবসের ভাবনা

আজ বিশ্ব শিক্ষক দিবস। ১৯৯৫ সাল থেকে দিবসটি উদ্যাপিত হয়ে আসছে। শিক্ষা ও উন্নয়নে শিক্ষকদের অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ দিবসটি পালন করা হয়। এ উপলক্ষে গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের চার শিক্ষক বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা, শিক্ষকদের চাওয়া-পাওয়া, ভাবনা ও যোগ্য নেতৃত্ব তৈরিতে ছাত্রসমাজের করণীয় নিয়ে কথা বলেছেন। কথাগুলো জানাচ্ছেন অনিক আহমেদ

বাস্তবমুখী ও গবেষণাধর্মী শিক্ষাব্যবস্থা চাই
দুঃখের বিষয়, বাংলাদেশে সম্মানের মানদণ্ড হিসেবে অর্থকে মূল্যায়ন করা হয়। তাই ছাত্রছাত্রীদের অনেকের কাছে শিক্ষা অর্জনের মূল লক্ষ্যে রয়েছে অর্থ উপার্জন। অথচ নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে না পারলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আমরা একটি টেকসই ও উন্নয়নমুখী বাংলাদেশ রেখে যেতে পারব না। জাতি হিসেবে আমাদের সব অর্জন ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে। বাস্তবমুখী ও গবেষণাধর্মী শিক্ষাই পারে রাষ্ট্রকে সুদৃঢ় ভিত্তি তৈরি করে দিতে। এ কারণে অযোগ্যদের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ না দিয়ে যোগ্য শিক্ষার্থীদের শিক্ষকতা পেশায় আসতে উদ্বুদ্ধ করলে এতে জাতিই লাভবান হবে। বিশ্ব শিক্ষক দিবসের এ মহান দিনে আমার প্রত্যাশা, বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় আবার সুদিন ফিরে আসবে এবং সঠিক শিক্ষায় শিক্ষিতরা শিক্ষকতা পেশায় আসবেন। সে সঙ্গে শিক্ষার্থীদের কাছে প্রত্যাশা, তারা ধনী হওয়ার শর্টকাট পথ না খুঁজে যেন জ্ঞানার্জনের মাধ্যমে তাদের ভাগ্য ও রাষ্ট্রের পরিবর্তন ঘটাতে আন্তরিক হন।

মাহমুদুল হাসান
প্রভাষক, সমাজবিজ্ঞান ও সমাজকর্ম বিভাগ

আইকনিক শিক্ষকের অভাব লক্ষণীয়

বিশ্ব শিক্ষক দিবস হচ্ছে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি দিবস। শিক্ষকরা হচ্ছেন মানুষ গড়ার কারিগর। শিক্ষা ও উন্নয়নে শিক্ষকদের অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ দিবসটি পালন করা হয়। শিক্ষক দিবসে আমার প্রত্যাশা বা প্রার্থনা, আমার শিক্ষার্থীরা যেন জ্ঞান ও প্রজ্ঞায় আমাকে ছাড়িয়ে যায়। ঘুণে ধরা এ সমাজটা একেবারে ধ্বংস হওয়ার আগেই এর হাল ধরতে হবে শিক্ষার্থীদের। ছাত্রসমাজকে লোভ, মোহের স্রোতে না ভেসে অন্যায়ের প্রতিরোধ করতে হবে। বিত্ত নয়, চিত্তের মালিক হতে হবে। বর্তমানে শিক্ষার্থীদের সামনে আইকনিক কোনো শিক্ষক নেই। সেই শূন্যতা থেকেই হতাশ হচ্ছে শিক্ষার্থীরা। এজন্য আমি নৈতিক ও আদর্শিক শিক্ষকতার অনুপস্থিতিকেই দায়ী করব। আরেকটি বিষয়ে নজর দিতে হবে, সেটা হলো মেয়ে শিশু, প্রতিবন্ধী, শরণার্থী ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের ব্যবধান অনেক বেশি। এ ব্যবধান দূর করতে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।

ড. মো. ফুয়াদ হোসেন
সিনিয়র প্রভাষক, প্রাণরসায়ন ও অনুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগ

পরীক্ষানির্ভর শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তন জরুরি
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার গতি ও মান নিশ্চিৎকরণ শুধু শিক্ষকদের একক প্রচেষ্টায় সম্ভব নয়। এজন্য শিক্ষার্থীদেরও পরিবর্তন চাইতে হবে। পরিবর্তন মেনে নেওয়ার মানসিকতা তৈরি করতে হবে। শুধু পরীক্ষানির্ভর যে ব্যবস্থা এখন চলছে, তা যে আসলে শিক্ষার কোনো পর্যায়ে পড়ে না সবার আগে এটা শিক্ষার্থীদেরই হৃদয়ঙ্গম করতে হবে। আমাদের শিক্ষার্থীরা তা করতে প্রস্তুত বলে মনে হয় না। আর পরিবর্তনের শুরুটা অবশ্যই করতে হবে প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে। প্রাথমিক শিক্ষাকে যুগোপযোগী ও মানসম্পন্ন না করে মানসম্মত উচ্চশিক্ষা চাওয়ার মানেই হলো অনেকটা গাছের গোড়া কেটে আগায় পানি ঢালার মতো। এটা সম্ভব নয়, আর বাস্তবসম্মতও না। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের দেশের যে কোনো সার্ভিসের তুলনায় সর্বোচ্চ বেতন দিতে হবে, যাতে মেধাবীরা নিজ থেকেই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হন।
আমাদের শিক্ষা বাস্তবমুখী বা কর্মমুখী নয়। আশা করি, সরকার-শিক্ষক সবাই বিষয়টি আমলে নিয়ে সমস্যা সমাধানে উদ্যোগী হবে। ইউরোপের একেকটি বিশ্ববিদ্যালয় যেন একেকটি ফাইভ স্টার হোটেল। আমি স্বপ্ন দেখি, একদিন বাংলাদেশেও এমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হবে, যেখানে একবার প্রবেশ করার পর শিক্ষার্থীদের আর বাড়ি ফিরে যেতে মন চাইবে না। শিক্ষকদের জন্য থাকবে পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা। ফলে তারা আর এ পেশা ছেড়ে অন্য কোনো পেশায় যাবেন না।

মো. মেহেদী হাসান (সরোজ মেহেদী)
প্রভাষক
ভাষা-যোগাযোগ ও সংস্কৃতি বিভাগ

শিক্ষকদের মর্যাদা ফিরিয়ে আনতে হবে
গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটল বলেছিলেন, যারা শিশুদের শিক্ষাদানে ব্রতী, তারা অভিভাবকদের থেকেও সম্মানীয়। মা-বাবা আমাদের বড় করেন ঠিকই; কিন্তু সে জীবনকে সুন্দর করে গড়ে তুলতে সাহায্য করেন শিক্ষক। ছোট বেলায় কাজী কাদের নেওয়াজের ‘শিক্ষাগুরুর মর্যাদা’ কবিতাটি আমরা অনেকেই পড়েছি। আমার এক শ্রদ্ধেয় শিক্ষক বলেছিলেন, যিনি তোমাকে একটি অক্ষর শেখাবেন তিনিই তোমার গুরু, তুমি তাকে শ্রদ্ধা করবে। এ কথা দ্বারা মূলত একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ গঠনে তার প্রয়োজনীয়তা পূরণে শিক্ষকদের অবদানকে স্মরণ করা হয়। যদিও একজন শিক্ষার্থীর জন্য শিক্ষকের ভূমিকা অনস্বীকার্য, তথাপি বর্তমানে ক্যাম্পাসগুলোয় শিক্ষকের সঠিক মূল্যায়ন নেই। তাদের পদে পদে লাঞ্ছিত আর অপমানিত হতে হয়। আর সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, শিক্ষকদের এসব অপমান তাদের ছাত্রদের দ্বারাই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সংঘটিত হয়। দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের পরিস্থিতি চলে আসছে। এটি পরিবর্তনে সংশ্লিষ্টদের দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। অন্যথায় ভবিষ্যৎ প্রজন্ম সঠিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হবে। মানুষ তার নামের সার্থকতা হারিয়ে পশুতে পরিণত হবে। বিশ্ব শিক্ষক দিবসের মহান দিনে সব শিক্ষককে শ্রদ্ধা জানাই। একই সঙ্গে প্রত্যাশা করি, শিক্ষকদের যাবতীয় সমস্যা সমাধানে সংশ্লিষ্টরা আন্তরিক হবেন।

ড. কাজী মো. আল নোমান
সহকারী প্রভাষক (ডেইরি সায়েন্স)
ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিমেল সায়েন্সেস বিভাগ

 

 

সর্বশেষ..