বুস্টার ডোজ কি নিতেই হবে!

ওমিক্রন আফ্রিকা থেকে ইউরোপ, এরপর বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। আমাদের দেশে ১১ ডিসেম্বর জিম্বাবুয়ে-ফেরত বাংলাদেশি দুই নারী ক্রিকেটার ওমিক্রনে আক্রান্ত হয়েছেন। এটা আগের তুলনায় বেশি শক্তিশালী হওয়ায় আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে বিশ্বজুড়ে। এর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে, যা আমাদের দেশের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ।

২০২০ সালের ৮ মার্চ দেশে কভিড রোগী শনাক্ত হওয়ার পর এখন পর্যন্ত মোট শনাক্ত রোগীর ক্ষেত্রে ৯৭ শতাংশ সুস্থ হয়েছে। দেশে এখন পর্যন্ত প্রথম ডোজ ভ্যাকসিন দেয়া হয়েছে ৫৩ দশমিক দুই শতাংশ এবং পূর্ণ ভ্যাকিসন পেয়েছে ২৭ দশমিক দুই শতাংশ মানুষ। আমাদের ৮০ শতাংশ ভ্যাকসিনেশনের যে উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল, তা দ্রুত বাস্তবায়ন করতে না পারলে ভয়াবহ পরিস্থিতির শিকার হতে পারি আমরা।

পূর্ণ ডোজ ভ্যাকসিন গ্রহণের পর সংক্রমণ ও মৃত্যুর ঝুঁকি অনেক কমে যায়। কারণ ভ্যাকসিনকে আমাদের দেহ পরজীবী বা অ্যান্টিজেন হিসেবে চিহ্নিত করে। এটিকে ধ্বংসের জন্য দেহ তার বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি তৈরি করে এবং পাশাপাশি স্মৃতিকোষ এই অ্যান্টিজেনকে মনে রাখে। পরবর্তীকালে একই অ্যান্টিজেনের আক্রমণ হলে স্মৃতিকোষ তাকে চিহ্নিত করে এবং অ্যান্টিবডিকে সক্রিয় করে সেই জীবাণুকে ধ্বংস করার জন্য।

প্রথম ডোজ ভ্যাক্সিন দেয়ার ফলে রক্তের দুই ধরনের শ্বেতরক্তকণিকা সক্রিয় হয়। প্রথমত, বি সেল যা অ্যান্টিবডি তৈরি করে, প্রথম ডোজ টিকা নেয়ার কয়েক সপ্তাহ পর রক্তে প্রচুর অ্যান্টিবডি থাকলেও দ্বিতীয় ডোজ দেয়া না হলে এগুলোর সংখ্যা কমে যায়। অন্যদিকে টি-সেল নির্দিষ্ট প্যাথোজেন চিহ্নিত করে সেগুলোকে অকার্যকর করে দেয়ার দায়িত্ব পালন করে এবং এদের মধ্যে কিছু থাকে ‘মেমোরি টি-সেল’ বা স্মৃতিকোষ, যা দেহে কয়েক দশক টিকে থাকে এবং পরবর্তীকালে একই প্যাথজেনের আক্রমণ হলে তাকে চিহ্নিত করে এবং অ্যান্টিজেনকে সক্রিয় করে, সে জীবাণু ধ্বংস করার জন্য। কিন্তু সমস্যা হলো এ ধরনের ‘মেমোরি টি-সেল’-এর সংখ্যা খুব কম থাকে। দ্বিতীয় ডোজ না পাওয়া পর্যন্ত এদের সংখ্যা বৃদ্ধি করা সম্ভব নয়।

দ্বিতীয় ডোজ ভ্যাকসিন দেয়ার ফলে অ্যান্টিবডি এবং স্মৃতিকোষের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। ফলে প্যাথজেনের বিরুদ্ধে দেহের প্রতিরোধ ক্ষমতা প্রথম ডোজের চেয়ে অনেক বৃদ্ধি পায়।

কভিডের ক্ষেত্রে যাদের দুই ডোজ টিকা নেয়া সম্পন্ন হয়েছে, তাদের তৃতীয় ডোজ টিকা দেয়া হচ্ছে, যাকে বুস্টার ডোজ বলা হচ্ছে। আসলে বুস্টার ডোজ কোনো আলাদা টিকা নয়। আগে দেয়া কোনো প্রাথমিক টিকার কার্যকারিতা উজ্জীবিত করতে যে বাড়তি ডোজ দেয়া হয়, তাকেই ওই টিকার বুস্টার ডোজ বলে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এখন বুস্টার ডোজ দেয়ার তোড়জোড় শুরু হয়েছে ওমিক্রন থেকে বাঁচার জন্য। বিশ্বের উন্নত দেশগুলো ভাবছে, ওমিক্রনের সংক্রমণ থেকে বাঁচতে বুস্টার ডোজ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। আমাদের দেশেও বুস্টার ডোজ দেয়া শুরু হয়েছে। বুস্টার ডোজের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, যাদের এখনও পূর্ণ ডোজ বা প্রথম দুই ডোজ টিকা দেয়া সম্পন্ন হয়নি, তাদের দ্রুত পূর্ণ ডোজ টিকার আওতায় আনা। কারণ দুই ডোজ সম্পন্ন না করেই পূর্ণ ডোজ টিকাপ্রাপ্তদের বুস্টার ডোজ দেয়ার মাধ্যমে করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণ করা বৈজ্ঞানিকভাবে কতটা যুক্তিযুক্ত তার প্রশ্ন থেকেই যায়।

বুস্টার ডোজ দেয়ার প্রধান কারণ হচ্ছে, প্রথম দুই ডোজ টিকা নেয়ার পর একজন মানুষের কতটুকু অ্যান্টিবডি তৈরি হয় এবং তার দ্বারা কত দিন সে দেহকে কভিড থেকে রক্ষা করতে পারবে, তা সুস্পষ্ট নয়। এছাড়া যে মেমোরি কোষ তৈরি হয়, তার সংখ্যা ও কাজ কত দিন পর্যন্ত আমাদের দেহে ভালোভাবে কাজ করবে, এসব সুস্পষ্ট নয়।

দেহে পর্যাপ্ত অ্যান্টিবডি তৈরি ও মেমোরি কোষের সংখ্যা ও কার্যকারিতা বৃদ্ধির জন্যই বুস্টার ডোজ। যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তুলনামূলকভাবে কম এবং বয়স্ক মানুষের জন্য বুস্টার ডোজ বেশি প্রয়োজন। 

ওমিক্রন প্রতিরোধে বুস্টার ডোজ খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। কারণ ওমিক্রন কোনো নতুন ভাইরাস নয়, বরং এটা করোনারভাইরাসের নতুন এক ভ্যারিয়েন্ট। তবে এটি আগের তুলনায় বেশি আক্রমণাত্মক ও শক্তিশালী।

সার্স-কভের নতুন ধরন ওমিক্রনের বিরুদ্ধে কভিড টিকার বুস্টার ডোজ ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ পর্যন্ত সুরক্ষা দিতে পারে বলে দাবি করেছেন গবেষকরা।

তবে কভিডের আগের ধরনগুলোর বিরুদ্ধে বর্তমান টিকা যতখানি কার্যকর, ওমিক্রনের বিরুদ্ধে তার চেয়ে কিছুটা কম কার্যকর হতে পারে বলেও সতর্ক করা হয়েছে। কিন্তু বুস্টার ডোজ গ্রহণ অনেক মানুষের হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ঠেকাতে পারে। পরিপূর্ণ গবেষণা না হওয়া পর্যন্ত ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তা থেকেই যাবে।

বিশেষজ্ঞদের দাবি, টিকা অবশ্যই কভিডের বিরুদ্ধে সুরক্ষা দেবে। কিন্তু বর্তমানে ব্যবহƒত টিকাগুলো ওমিক্রন ধরনের সঙ্গে লড়াই করার মতো করে তৈরি করা হয়নি। তাই চলমান এই অনিশ্চয়তার পরিপ্রেক্ষিতে গবেষকরা টিকার বুস্টার ডোজ গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছেন।

প্রতিবন্ধকতা ছিল, আছে, থাকবে। সব প্রতিবন্ধকতাকে মোকাবিলা করে আমাদের সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। ক্রমান্বয়ে সবাইকে বুস্টার ডোজের আওতায় আনতে হবে।

আরিফুল ইসলাম

শিক্ষার্থী, ফার্মেসি বিভাগ

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন   ❑ পড়েছেন  ৯৯৩  জন  

সর্বশেষ..