Print Date & Time : 28 February 2021 Sunday 6:14 pm

বৃদ্ধাশ্রমে নয়, মা-বাবা থাকুন মনের মণিকোঠায়

প্রকাশ: November 29, 2020 সময়- 10:36 pm

তানভীর আহমেদ রাসেল : বাবা-মা হচ্ছেন সন্তানের জন্য এ পৃথিবীতে সবচেয়ে নিরাপদ ঠিকানা। মা গর্ভে স্থান দিয়েছেন, অসহ্য প্রসববেদনা হাসিমুখে সহ্য করে এ পৃথিবীর আলো প্রত্যক্ষ করিয়েছেন। আবার ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর সন্তানের একমাত্র আশ্রয়স্থলও ছিলেন বাবা-মা। আদর, স্নেহ, শাসন ও ভালোবাসার বাঁধনে আবদ্ধ রেখে তারা সন্তানকে শত কষ্টের বিনিময়ে তিল তিল করে পরম মমতায় বড় করার পাশাপাশি শিক্ষিত করে তোলেন। স্বপ্ন দেখেন তাদের খোকা একদিন মানুষের মতো মানুষ হয়ে তাদের পাশাপাশি দেশ ও দশের মুখ উজ্জ্বল করবে; খোকার আলোয় আলোকিত হয়ে তারা শেষ জীবন আনন্দে পার করবেন। অথচ জীবনের শেষ বয়সে সেই খোকার দ্বারাই অনেক ক্ষেত্রে বাবা-মা অবহেলিত হচ্ছেন, বৃদ্ধাশ্রম নামক অজানা-অচেনা এক কুটিরে ঠাঁই পাচ্ছেন। কিন্তু কেন?

যেসব মানুষের জীবন ও যৌবনের আত্মত্যাগের ওপর ভর করে সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যৎ প্রতিষ্ঠিত হয়, সেই মানুষগুলোই জীবনের শেষ বয়সে এসে বোঝায় পরিণত হন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের চিন্তা-চেতনা, ধ্যান-ধারণা সম্প্রসারিত হওয়ার পরিবর্তে আত্মকেন্দ্রিক এবং সন্তান বা স্ত্রীকেন্দ্রিক হয়ে যাচ্ছে। ইট-পাথরের যান্ত্রিক নগরীতে হাজারো ব্যস্ততার ভিড়ে আমরা সেই বাবা-মাকে ভুলতে বসেছি। অনেক কাজের চাপে আমরা চরম অকৃতজ্ঞ ও অনুভূতিহীন হয়ে মহান আল্লাহর পরম নেয়ামত সেই বাবা-মাকে ভাবনার বাইরে রেখেছি। দিনের পর দিন বাবা-মায়ের খবর নেওয়া হয় না। অথচ শত ব্যস্ততার মাঝেও স্ত্রী, পুত্র ও কন্যার খোঁজখবর সার্বক্ষণিকভাবে নিতে ব্যত্যয় ঘটছে না।

অনেকে কর্মের তাগিদে বাবা-মায়ের কাছ থেকে দূরে কোথাও কর্মরত আছেন। ব্যস্ততার অজুহাতকে মনে ধারণ করে বছরে হয়তো একটি দিনও বাবা-মায়ের জন্য সময় হয় না। অনেকে আবার আধুনিক চাকচিক্যময় জীবনের সব সুযোগ-সুবিধার মধ্যে বাবা-মাকে বড্ড বেমানান ভেবে বা কখনও স্ত্রী-সন্তানের প্ররোচনায় প্রভাবিত হয়ে বাবা-মাকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে দিচ্ছেন। অথচ যে সন্তানকে মানুষ করতে বাবা-মা অজস্র কাঁটার আঘাত হাসিমুখে সহ্য করেছেন, আজ সেই নিষ্ঠুর সন্তান বাবা-মায়ের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের পাশাপাশি তাদের নির্বাসন দিচ্ছেন বৃদ্ধাশ্রম নামক এক অজানা কুটিরে। অথচ জীবনের শেষ সময়টুকুতে তারা নাতি-নাতনিদের সঙ্গে কাটাতে চান। তাদের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে চান, কিন্তু এক বুক কষ্ট নিয়ে হতভাগ্য বাবা-মায়ের দিন কাটে অপ্রত্যাশিত এক নিবাসে। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনের সুরা বনি ইসরাইলের ২৩ নম্বর আয়াতে স্পষ্ট হুশিয়ার করে বলেছেন, ‘তাদের মধ্যে একজন অথবা উভয়ই যদি তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হন, তবে তাদের উহ্ শব্দটিও বলো না এবং তাদের ধমক দিও না এবং তাদের সঙ্গে শিষ্টাচারসহ কথা বলো।’

আমাদের জানা উচিত, প্রকৃতি একদিন যথোপযুক্ত প্রতিফল দেবে। শিক্ষিত ও তথাকথিত সভ্য সমাজের আধুনিকতার মোহে আবিষ্ট হয়ে যারা অশিক্ষিত ও অক্ষম বাবা-মায়ের চেয়ে সন্তানকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন, একদিন সেই সন্তান দ্বারাই তারা অবহেলিত হবেন। এমন অনেক বাবা-মা আছেন যারা ছিলেন কৃষক, ভিখারি ও দিনমজুর। দিন-রাত এক করে সন্তানকে উচ্চশিক্ষিত করে জীবনের শেষ বয়সে এসে তারা সন্তান দ্বারাই লাঞ্ছিত হচ্ছেন।

প্রতিটি মানুষের জীবন একটি নির্দিষ্ট সময়ে বাঁধাÑশৈশব থেকে কৈশোর, পরবর্তীকালে যৌবন, অবশেষে বার্ধক্য। আমাদের সবার বৃদ্ধ বাবা-মায়ের প্রতি বিশেষ নজর দেওয়া উচিত। মাঝে মাঝে তাদের শিশুসুলভ আচরণকে পরম মমতায় গ্রহণ করা উচিত, তুচ্ছতাচ্ছিল্যে নয়। বাবা-মায়ের ঠিকানা বৃদ্ধাশ্রম বা ব্যস্ততার তালিকায় নয়, বরং থাকা উচিত সন্তানের মনের মণিকোঠায়।

বাবা-মায়ের জন্য তৈরি করি এক নিরাপদ ও সুন্দর পৃথিবী। তাদের সেবা করলে মহান আল্লাহ সন্তুষ্ট হন। তাই আসুন বাবা-মায়ের সঙ্গে সদাচরণ করি এবং তাদের খেদমতে দুনিয়া ও আখিরাতের জীবন আলোকিত করি।

শিক্ষার্থী

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়