প্রচ্ছদ শেষ পাতা

বেক্সিমকোকে পাল্টা চিঠি টিআইবির

নিজস্ব প্রতিবেদক: বেক্সিমকো গ্রুপের প্রতিবাদের পর ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) চেয়ারপারসন সুলতানা কামাল এক ফিরতি চিঠিতে দেশের অন্যতম বৃহৎ এই শিল্প গ্রুপকে প্রশংসা করার পাশাপাশি শুদ্ধাচার চর্চার আহ্বান জানিয়েছেন। বেক্সিমকো চেয়ারম্যান সোহেল এফ রহমানকে পাঠানো ওই চিঠিতে সুলতানা কামাল লিখেছেন, কারও প্রতি ব্যক্তিগত ইঙ্গিত করা টিআইবির সংবাদ বিজ্ঞপ্তির উদ্দেশ্যের মধ্যে পড়ে না। পাশাপাশি আপনাকে এই বলে আশ্বস্ত করতে চাই যে, দেশের অর্থনীতিতে অন্য যে কোনো প্রথিতযশা প্রতিষ্ঠানের মতো বেক্সিমকো গ্রুপের ইতিবাচক অবদান টিআইবি সব সময় যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে মূল্যায়ন করে।
বেক্সিমকো গ্রুপের ৪৩০ কোটি পাঁচ লাখ টাকার ঋণ পুনঃতফসিলীকরণের আবেদনে বাংলাদেশ ব্যাংকের সম্মতি দেওয়ার সিদ্ধান্তের একটি খবর গত ১৩ সেপ্টেম্বর এক প্রতিবেদনে প্রকাশ করে ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টার। ওই খবরের প্রতিক্রিয়ায় টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান ওইদিনই একটি বিবৃতি দেন; সেখানে বলা হয়, একদল লুটেরা আইনপ্রণেতা হওয়ার সুযোগ পেয়ে গেছে।
ওই বিবৃতির প্রতিবাদ জানিয়ে ১৫ সেপ্টেম্বর টিআইবি চেয়ারপারসন সুলতানা কামালকে একটি চিঠি দেওয়া হয় বেক্সিমকো চেয়ারম্যান সোহেল এফ রহমানের পক্ষ থেকে। সেখানে বলা হয়, বেক্সিমকোর ভাইস চেয়ারম্যান সংসদ সদস্য সালমান ফজলুর রহমানকে ইঙ্গিত করে টিআইবি যে বিবৃতি দিয়েছে, তা অবমাননাকর। সেই চিঠির জবাবে সুলতানা কামাল গত ১৬ সেপ্টেম্বর সোহেল এফ রহমানকে আরেকটি চিঠি পাঠান।
সেখানে বলা হয়, ব্যক্তিমালিকানাধীন খাতে শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেশের অর্থনীতিতে বেক্সিমকো লিমিটেডের অবদান অনস্বীকার্য। বিশেষ করে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে বেক্সিমকোর সক্রিয় ও বহুমুখী ভূমিকা যৌক্তিক কারণেই সর্বজনবিদিত। বেক্সিমকোর উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি ও এর মাধ্যমে দেশের টেকসই উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান অব্যাহত থাকবে টিআইবি এই প্রত্যাশা করে। একইভাবে জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশলের অন্যতম ক্ষেত্র ব্যক্তিমালিকানাধীন খাতের নেতৃস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে বেক্সিমকোর ব্যবসায়িক মডেল ও চর্চা এ খাতে শুদ্ধাচার প্রতিষ্ঠায় অন্য ছোট-বড়ো সব প্রতিষ্ঠানের জন্য অনুকরণীয় হবে, সেটাও আমাদের কাম্য।
সুলতানা কামাল লিখেছেন, দেশের সার্বিক ব্যাংক খাতের সংকটাপন্ন অবস্থায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ‘প্রত্যাশিত ভূমিকার ঘাটতি’ নিয়ে টিআইবির উদ্বেগ প্রকাশ এবং এ সংকট সমাধানে ব্যাংকের দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরত্ব আরোপ করাই ছিল ওই বিজ্ঞপ্তির উদ্দেশ্য। এক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানিকভাবে বেক্সিমকো বা ব্যক্তিগতভাবে কোম্পানির সম্মানিত ভাইস-চেয়ারম্যান, এমপি মহোদয়ের উদ্দেশে নেতিবাচক মন্তব্য করা টিআইবির নির্বাহী পরিচালক অথবা টিআইবির লক্ষ্য হওয়ার প্রশ্ন ওঠে না।
টিআইবি চেয়ারপারসনের চিঠিতে বলা হয়, বেক্সিমকো গ্রুপের ঋণ পুনঃতফসিলীকরণের সম্ভাব্য সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে গণমাধ্যমে যে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে, সে প্রেক্ষিতে টিআইবি বিশ্বাস করে যে, বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব নীতিমালা ও সিদ্ধান্তের পরিপন্থি ওই সুবিধা দেওয়া হবে আত্মঘাতীমূলক। তাছাড়া এর ফলে ধারাবাহিক উচ্চ প্রবৃদ্ধির বিপরীতে লক্ষাধিক কোটি টাকার খেলাপি ঋণের বোঝা ও ভয়াবহ তারল্য সংকট আরও ঘনীভূত হওয়ার ঝুঁকি সৃষ্টি হবে। এই উদ্বেগ প্রকাশই ছিল টিআইবির মুখ্য উদ্দেশ্য।
সুলতানা কামাল লিখেছেন, জনস্বার্থে নিয়োজিত অন্য সব প্রতিষ্ঠানের মতো বাংলাদেশ ব্যাংক যখন তার নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা যথাযথভাবে পালন করতে ব্যর্থ হওয়ার মুখোমুখি হয়, তখন তার সমালোচনা করা এবং কার্যকর পদক্ষেপের দাবি জানানোকে টিআইবি নৈতিক কর্তব্য বলে মনে করে। চিঠিতে বলা হয়, খেলাপি ঋণকে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণমুখী করা এবং এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্পিত দায়িত্ব পালনে ঘাটতির যে প্রেক্ষিত তৈরি হয়েছে, টিআইবি একটি স্বাধীন কমিশন গঠনের মাধ্যমে এই গুরুতর অবস্থা থেকে উত্তরণের পন্থা নির্ধারণের দাবি জানিয়েছে।
যার মাধ্যমে অতীব প্রয়োজনীয় স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার উদ্যোগ অপরিহার্য হয়ে পড়েছে বলে আমরা মনে করি এবং আমরা বিশ্বাস করি তার ফলে বেক্সিমকোর মতো ব্যক্তিমালিকানাধীন খাতের প্রতিষ্ঠানসহ সব অংশীজনের মধ্যে ব্যাংক খাতের ওপর চলমান আস্থার সংকট দূরীভূত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হবে। বিগত সেনানিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় বিভিন্ন ব্যবসায়িক গ্রুপকে বিপুল অঙ্কের টাকা দিতে বাধ্য করার ঘটনা মনে করিয়ে দিয়ে বেক্সিমকো চেয়ারম্যান তার চিঠিতে প্রশ্ন করেছিলেন, সেই অবৈধ চাঁদাবাজির সমালোচনা টিআইবি কখনও করেছে কি না?
এর উত্তরে টিআইবি চেয়ারপারসন লিখেছেন, আপনার অবগতির জন্য সংক্ষেপে বলতে চাই, সরকারের দায়িত্বে অধিষ্ঠিত কর্তৃপক্ষের পরিচয় বা অবস্থানের ওপর নির্ভর করে টিআইবির কার্যক্রম কোনোভাবেই প্রভাবিত হয় না। সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শাসনকালেও টিআইবি সুশাসনের পরিপন্থি কর্মকাণ্ড ও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের নামে ক্ষমতার অপব্যবহারের বিভিন্ন পদপেক্ষের সমালোচনা করতে পিছপা হয়নি, যে কারণে তৎকালীন শাসকগোষ্ঠীর বিরাগভাজন হতে হয়েছে টিআইবিকে। এছাড়া সে সময় সেনাবাহিনীর একাংশের দুর্নীতিসহ বহুমুখী বিতর্কিত কর্মকাণ্ড নিয়ে টিআইবি একটি পূর্ণাঙ্গ গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল বলে চিঠিতে উল্লেখ করেছেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা সুলতানা কামাল।

সর্বশেষ..