প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

বেনজামিন গ্রাহাম:দ্য ইনটেলিজেন্ট ইনভেস্টর

পূর্বের প্রকাশের পর……….

১৯২০ সালের আগেই ইংল্যান্ডের সবচেয়ে দামি কোম্পানি ছিল সাউথ সি। ওই কোম্পানির কিছু শেয়ার কিনেছিলেন সর্বকালের অন্যতম সেরা চিন্তাবিদ স্যার আইজ্যাক নিউটনও। একবার আকস্মিকভাবে দরপতন শুরু হলে তিনি বেচে দেন সাউথ সি’র সব শেয়ার। বিস্মিত নিউটন শতভাগ মুনাফায় আয় করেন সাকুল্যে সাত হাজার পাউন্ড। শেয়ারের দাম কমার পরও তার কেন লাভ হলো, এটা বুঝতে না পেরে এই মহান পদার্থবিদ নাকি তার এক বন্ধুকে বলেছিলেন, ‘মহাবিশ্বের সব জাগতিক বস্তুর গতি-প্রকৃতি নির্ণয় করা সম্ভব; কিন্তু শেয়ারবাজারের মন কিছুতেই নয়।’ বিপত্তি ঘটলো এর পর। হুট করে বাড়তে শুরু করলো সাউথ সি’র শেয়ারদর। তাড়াহুড়ো করে অন্যদের দেখাদেখি বেশকিছু শেয়ার কিনে পরবর্তীতে বিক্রি করে ধরা খেলেন আনুমানিক ২০ হাজার পাউন্ড। এতে প্রচণ্ড হতাশ হন নিউটন। পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করতে গিয়ে এখন পর্যন্ত যদি ব্যর্থও হয়ে থাকেন, তার মানে এই নয় যে আপনি বোকা; আপনাকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না। এর কারণ হলো, সফল বিনিয়োগকারী হওয়ার জন্য যে মানসিক শৃঙ্খলার প্রয়োজন, তা আপনার নেই। যা ছিল না নিউটনেরও।

কিনেই বেচা বা বেচেই কেনাকে বিনিয়োগ বলে না, বলে ব্যবসা

কোম্পানি নতুন নতুন শেয়ার বাজারে ছাড়বে আর আক্রমণাত্মক বিনিয়োগকারী তা জানতেও পারবেন না, এ হয় না। এটি প্রায় সব সক্রিয় বিনিয়োগকারীরই আগ্রহের বস্তু। তবু নতুন ইস্যুতে (শেয়ার) বিনিয়োগের ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট কোনো মন্তব্য করতে চাই না আমি। কেননা নতুন ইস্যু যে কোনো গুণসম্পন্ন এবং যে কোনো মাত্রায় আকর্ষণীয় হতে পারে। ফলে একে কোনো সীমাবদ্ধ নিয়মের আওতায় আনা কঠিন। নতুন ইস্যুর গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে যা-ই বলবো, দেখবেন তার ব্যতিক্রমটিও বেরিয়ে এসেছে সঙ্গে সঙ্গে। অবশ্য এ পরামর্শ দিতে কোনোই বাধা নেই যে, পুরোনো শেয়ারের চেয়ে নতুন শেয়ার কেনার সময় বাড়তি সতর্কতা কাম্য। ভালোভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও যাচাই-বাছাই না করে কোনোক্রমেই কিনবেন না নতুন ইস্যু। পাশাপাশি ‘পরীক্ষা-নিরীক্ষা’ ও ‘যাচাই-বাছাই’ শব্দের প্রয়োগ অতিরঞ্জিত, আমি জানি। তারপরও পুনরাবৃত্তি করলাম শুধু সতর্কতার ওপর জোর দিতে। লক্ষ করুন, নতুন ইস্যু নিয়ে ভাবনার দুটি প্রধান কারণ রয়েছে। প্রথমত, কোনো কোম্পানি নতুন ইস্যু বাজারে আনার আগে বিপণনে জোর দেবেই। তার মানে সেলসম্যানশিপ কৌশলের ওপর বেশি গুরুত্ব দেবে তারা। কেননা দাম যত বাড়িয়ে বিক্রি করা যায়, কোম্পানির জন্য ততই লাভ। আর কোম্পানির এই ফাটকা লাভের ফাঁদে আক্রমণাত্মক বিনিয়োগকারী যেন না পড়েন, সেজন্য সজাগ থাকা দরকার। লক্ষণীয়, কমন স্টকের নতুন ইস্যু বিক্রি হয় ইনিশিয়াল পাবলিক অফারিংয়ের (আইপিও) মাধ্যমে। এর আন্ডাররাইটিং কমিশন থাকে। তার মানে এর বিল্ট-ইন কমিশনটি পায় আন্ডাররাইটার প্রতিষ্ঠান। ওয়ালস্ট্রিটে এই সংখ্যাটি কম নয়, আনুমানিক ৭ শতাংশ।

শেয়ার বিক্রির আরেকটি কমিশন হচ্ছে বায়ারস কমিশন। এর পরিমাণ চার শতাংশের নিচে এবং তা কমন স্টকের পুরোনো ইস্যু বিক্রির বেলায় প্রযোজ্য। এক গবেষণায় দেখা গেছে, পুরোনো ইস্যুর চেয়ে নতুন ইস্যুতে দ্বিগুণ লাভ করে থাকে ওয়ালস্ট্রিট। দ্বিতীয়ত, সিংহভাগ কোম্পানি নতুন ইস্যু বিক্রি করে বাজার অনুকূলে থাকাকালে। এতে মুনাফার পরিমাণ বাড়ে বিক্রেতার, ক্রেতার নয়। ইউনিভার্সিটি অব শিকাগোর ফাইন্যান্স বিভাগের অধ্যাপক ওয়েন লেমন্ট ও ইউনিভার্সিটি অব নটর ডেমের অধ্যাপক পল শুলজ দেখিয়েছেন, কোম্পানিগুলোর জন্য সবচেয়ে লাভজনক হলো বাজার তুঙ্গে থাকার সময় নতুন ইস্যু ছাড়া।

কয়েকটি মৌলিক বিষয়। সাধারণত দুই ভাবে সংঘটিত হয় কমন স্টকে অর্থায়ন। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কিছু কোম্পানি অতিরিক্ত শেয়ার ছাড়তে পারে তাদের বিদ্যমান বিনিয়োগকারীদের জন্য। সেখানে তাদের জন্য নতুন ইস্যুর মূল্য ধরা হয় চলতি বাজারের নিচে এবং বিদ্যমান বিনিয়োগকারী সেটি সাবস্ক্রাইব করুন না করুন, তার ওই অধিকারের (রাইটস) বিপরীতে একটা আর্থিক মূল্য ধরে রাখে কোম্পানি। আর এভাবেই ইস্যু হয় রাইট শেয়ার। প্রায় সর্বদা নতুন ইস্যু আন্ডাররাইট করে দেয় এক বা একাধিক ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকিং হাউজ। আর সাধারণভাবে এটা ধরে নেওয়া হয়, সাবস্ক্রিপশন রাইটসধারী স্টকহোল্ডাররাই এগুলো কিনবেন। ফলে নতুন ইস্যু বিক্রিতে কোম্পানির যেমন বিপণন প্রচেষ্টা থাকে রাইট শেয়ার ইস্যুর বেলায় তেমনটি নেই বললে চলে। এটি রাইট শেয়ারকে দেখার কোম্পানিসুলভ দৃষ্টিভঙ্গি। এর বিনিয়োগকারীসুলভ দৃষ্টিকোণটি হলো, কোম্পানির আকার-আয়তন বেড়েছে বলে এখন বিনিয়োগকারীকে বাড়তি কিছু পয়সা খরচ করে কোম্পানিতে তার আনুপাতিক মুনাফাস্বার্থ (প্রপোরশনাল ইন্টারেস্ট অব প্রফিট) ঠিক রাখতে হবে। একে ইতিবাচক বা নেতিবাচক আখ্যা দিচ্ছি না। তবে ইউরোপে এ ধরনের পদ্ধতির অনুশীলন বেশ জনপ্রিয়। কমন স্টক অর্থায়নের আরেক উপায়, আগের প্রাইভেট কোম্পানিকে পাবলিক কমন স্টকের আওতায় আনা। এক্ষেত্রেও কোম্পানি স্টক বিক্রিতে আগ্রহ দেখার বাজার অনুকূলে থাকার সময়। প্রধানত অর্থায়ন উৎসের বৈচিত্র্য আনাই এর উদ্দেশ্য। উল্লেখ্য, নতুনভাবে অর্থায়নের প্রয়োজন হলে কোম্পানিগুলো সাধারণত প্রেফারড স্টক বিক্রির মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করে। পাবলিক কমন স্টকে যাওয়া মানে ওই কোম্পানিটি অর্থায়নে বাড়তি বৈচিত্র্য ও নিরাপত্তা চাইছে। ঝামেলা হলো, প্রাইভেট কোম্পানি শেয়ারবাজারে প্রবেশের পর (আকার-আকৃতি অনুযায়ী) এর আচরণ অনেকাংশে নির্ধারিত হয় বাজারের অন্তর্নিহিত গতি-প্রকৃতি দ্বারা। তাই এর উত্থান-পতন একই সঙ্গে বিনিয়োগকারীকে করতে পারে আনন্দিত ও হতাশ। এক্ষেত্রে বিপদ দেখা দেয় মূলত দুদিক থেকে এক. নতুন সংগৃহীত অর্থ যেখানে ব্যবহার হবে অর্থাৎ ব্যবসায় এবং দুই. বাজারে অর্থাৎ ব্যবসা বৃদ্ধির জন্য উত্তোলিত অর্থ যেখান থেকে আসবে সেখানে।

উল্লিখিত বিশ্লেষণের ভিত্তিতে বাজার বিপর্যয়ের সংক্ষিপ্ত পরিণতি পাঠকের সামনে তুলে ধরতে চাই। বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্রে যতগুলো নেতৃস্থানীয় কোম্পানি ছিল তার বড় অংশ একপর্যায়ে পুঁজিবাজারে অন্তর্ভুক্ত হয় অর্থায়ন বাড়ানোর আশায়। প্রথম সারির নামকরা কোম্পানি সব। মানুষজন মুখিয়ে থাকত সেখানে বিনিয়োগের জন্য। কিন্তু কিছুকাল পরেই এদের দশা হয় কাজীর গরুর মতো কাগজে আছে, গোয়ালে নেই। লক্ষণীয়, বাজার উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে এগুলো যখনই বাজারের অতল গহ্বরে নিক্ষিপ্ত হয়েছে তখনই বিনিয়োগকারীর আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু থেকে সরে পড়ে বৃহৎ করপোরেশন আর তাদের স্থান দখল করে নেয় তুলনামূলকভাবে ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠান। তবে বৃহৎ প্রতিষ্ঠানের প্রতি আগ্রহ আবার বাড়ে এবং ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানের প্রতি (দুর্ভাগ্যজনকভাবে) বিনিয়োগকারীর মনে কুসংস্কার সৃষ্টি হয় বাজার যখন একটু উঠতে শুরু করেছে তখন। বুল মার্কেটের একটা শক্তি হলো, এটা ডালে-চালে অর্থাৎ ছোট-বড় সব প্রতিষ্ঠানকে এক কাতারে দাঁড় করাতে পারে। ফলে বুল মার্কেটে ছোট ও বড় সব প্রতিষ্ঠানের প্রতিই কমবেশি আগ্রহ দেখান বিনিয়োগকারীরা। কিন্তু বুল মার্কেট যখন তুঙ্গে থাকে তখন মানুষের একটি স্বাভাবিক প্রবৃত্তি তীব্রভাবে গা-ঝাড়া দিয়ে ওঠে। সেটি হলো, সবকিছু নিজের অধিকারে নেওয়ার বুনো আকাক্সক্ষা। দুঃখজনক, এর পরের ধাপই হলো পতন। লক্ষণীয়, বুল মার্কেটে বাজার দাপিয়ে   এমন কিছু প্রতিষ্ঠানকে স্বাভাবিক অবস্থায় খুঁজে পেতে হয়রান হতে হবে আপনাকে। ১০ বছর পর হয়তো অস্তিত্বও খুঁজে পাবেন না তাদের। আশা করি, এখান থেকে একটা সুন্দর চিত্র পেয়েছেন বাজারে বিপর্যয় সৃষ্টির। বুল মার্কেটে প্রথমে ভাসতে থাকে ফার্স্ট ক্লাস কমন স্টক। মূল্য কম থাকায় তা থেকে লাভবান হন বিনিয়োগকারীরা। প্রথম ক্রেতা ও বিক্রেতার এ লেনদেনের মাধ্যমে বাজার গরম হয়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে একে অতি-উত্তপ্ত করে তোলে একই লাভের প্রত্যাশায় ঘন ঘন ও দ্রুত শেয়ারের লেনদেন। তখন একে বিনিয়োগ বলা যায় না; সেটি পরিণত হয় বাণিজ্যে। খেয়াল করুন, ওই ঘন ঘন ও দ্রুত শেয়ার বাণিজ্যের কারণেই দ্রুত পড়তে থাকে শেয়ারের গুণগত মান। অনেকে আমাকে জিজ্ঞেস করেন, কোন পর্যায়ে বুল মার্কেট পড়ে বেয়ার মার্কেটে পর্যবসিত হবে, তা আপনার জানা আছে কি না। একটি নির্ভরযোগ্য লক্ষণ আমি জানি। সেটি হলো, যখনই দেখবেন (অপরিচিত ও অনির্ভরযোগ্য) ক্ষুদ্র কোম্পানির নতুন ইস্যুর দাম যখন (বাজারের স্বাভাবিক অবস্থার) একটি (ভালো পারফরম্যান্সের দীর্ঘ রেকর্ডযুক্ত) মধ্যম সাইজের কোম্পানির শেয়ারের চেয়ে বেশি দামে বিকোয়, তখনই বুঝবেন বিপদ আসন্ন। আমি সোজাসাপ্টা যেটা বুঝি, শেয়ারের মূল্য বিপর্যয়ের মৌলিক কারণ বিনিয়োগকারীর মনোযোগে ঘাটতি এবং শেয়ার বিক্রয়কারী সংগঠনের (সেলিং অর্গানাইজেশন) ‘লাভ হয় এমন যে কোনো কিছু বিক্রি’র প্রবণতা। এরপর যা ঘটে তা হলো, বিনিয়োগকারীরা আতঙ্কিত হন, ভালোমন্দ নির্বিচারে এড়িয়ে চলেন ছোট ও মাঝারি কোম্পানি। একটা কৌতূহলোদ্দীপক বিষয়, বড় ও খ্যাতনামা ব্যাংককে আমি কখনওই ওয়ালস্ট্রিটের ওই ধরনের বিপজ্জনক বাণিজ্যে অংশ নিতে দেখিনি (কেউ আদৌ করেছে বলে মনে পড়ে না) বললে চলে। সেজন্য আক্রমণাত্মক বিনিয়োগকারীকে যথেষ্ট বুদ্ধি করে চলতে হয়, তিনি যেন বাজে সেলসম্যানের পাল্লায় না পড়েন। নিশ্চয়ই এও তার নজর এড়ায়নি যে, শেয়ারবাজারে সেলসম্যান দুই ধরনেরই আছেÑউপকারী ও ক্ষতিকর।

আরও কিছু বিষয়ে ছাড়াছাড়াভাবে বলি। একজন আক্রমণাত্মক বিনিয়োগকারীর আত্মহত্যার জন্য এখন পর্যন্ত যে সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র আবিষ্কার হয়েছে তা হলো, কিনেই কয়েক ঘণ্টা পর শেয়ারটি বিক্রি করে দেওয়া। প্রসঙ্গত, আরেকটা বিষয় বিনিয়োগকারীরা ভুলে যান বেমালুম। ওই তাৎক্ষণিক (হট সেলিং) বাণিজ্যে আপনার কিছু লেনদেন লাভের মুখ দেখবে, কয়েকটি করবে লোকসান। কিন্তু আপনি লাভ-লোকসান যা-ই করুন, লাভ করবে ব্রোকার। তদুপরি বাজারের গতি-প্রকৃতি অগ্রাহ্য করে নিজ ইচ্ছা-অনিচ্ছায় বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীরা নিজের অজান্তেই কমাতে থাকেন প্রত্যাশিত মুনাফা। কারণটি গাণিতিক। দেখা যায়, কেউ যখন কোনো শেয়ার কিনতে মরিয়া হয়ে ওঠে, শেষ পর্যন্ত ওই শেয়ারই সে কেনে সাম্প্রতিক বাজারমূল্যের ১০ শতাংশ বেশি দামে। এই অদৃশ্য ও অতিরিক্ত পরিশোধিত মূল্যের নামই হচ্ছে ‘মার্কেট ইমপ্যাক্ট’, ব্রোকার বা ব্রোকারেজ হাউজ যে মুনাফার একক অংশীদার। অবশ্যই কোনো ব্রোকারেজ হাউজের স্টেটমেন্টে এই আয় খুঁজে পাবেন না আপনি। কিন্তু এটা নির্মম বাস্তবতা। মনে করুন, কোনো কোম্পানিকে আপনার খুব মনে ধরেছে এবং আপনি দ্রুত সে স্টকের অন্তত এক হাজার শেয়ার কিনতে উদগ্রীব। ধরুন, আপনার এই অত্যুৎসাহ দেখে বিক্রেতা শেয়ারের মূল্য দিল পাঁচ সেন্ট বাড়িয়ে। এ অবস্থায় তাৎক্ষণিক লেনদেনের কারণে আপনার বাড়তি লোকসান হবে ৫০ ডলার; যার পুরোটাই যাবে ব্রোকারের পকেটে। আবার কোনো বিনিয়োগকারী যদি আতঙ্কিত হয়ে সাম্প্রতিক মূল্যের নিচেও শেয়ার বেচতে বেপরোয়া হয়ে ওঠেন, মার্কেট ইমপ্যাক্ট ঘটবে তখনও। অনেকে হয়তো ধারণা করছেন, কতই আর যাবে? অথচ এই মার্কেট ইমপ্যাক্ট কিন্তু শিরিষ কাগজের মতো ঘষে ঘষে আপনার সব মুনাফা নিঃশেষ করতে সক্ষম। তথ্য-উপাত্ত বলে, একবার শেয়ার কেনাবেচায় (স্বাভাবিক দর কষাকষির ক্ষমতার ভিত্তিতে) মার্কেট ইমপ্যাক্ট ঘটে দুই থেকে চার শতাংশ। কেউ রাউন্ড ট্রিপ মারলে অর্থাৎ শেয়ার কিনেই বেচলে বা বেচেই কিনলে মার্কেট ইমপ্যাক্ট দ্বিগুণÑচার থেকে আট শতাংশ। আরেকটি বিষয়, এভাবে কিনেই বেচা বা বেচেই কেনাকে বিনিয়োগ বলে না, বলে ব্যবসা। আর বিনিয়োগ না করে শেয়ার ব্যবসায় নামলে ‘বহু পরিশ্রমের’ দীর্ঘমেয়াদি মুনাফা (ক্যাপিটাল গেইন রেটে সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ কর প্রযোজ্য) পরিণত হয় সাদামাটা আয়ে (যেখানে সর্বোচ্চ ৩৮ দশমিক ৬ শতাংশ হারে কর দিতে হয়)। আর সেক্ষেত্রে এমনকি ব্রেক ইভেনে আসলে চাইলেও গেইন হতে হবে কমপক্ষে ১০ শতাংশ। ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার ফাইন্যান্সের অধ্যাপক ব্র্যাড বারবার ও টিয়ার্নস ওডিন একটি বৃহৎ ডিসকাউন্ট ব্রোকারেজ ফার্মের ৬৬ হাজার বিনিয়োগকারীর ১ দশমিক ৯ মিলিয়ন লেনদেন পর্যবেক্ষণপূর্বক এ মত দিয়েছেন। এ থেকে আক্রমণাত্মক বিনিয়োগকারীর শিক্ষা হলো, সব সময় কিছু একটা করার চেষ্টা নয় (অন্তত শেয়ারবাজারে), মাঝেমধ্যে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তিকেই ভালো মুনাফা দেয় পুঁজিবাজার। আরেকটি বিষয় মনে রাখবেন, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারী বলে কোনো শব্দ নেই। বিনিয়োগকারী মাত্রই দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারী। যিনি দীর্ঘ মেয়াদে বিনিয়োজিত থাকতে পারেন না, তিনি বিনিয়োগকারী নন, ব্যবসায়ী।

একশ্রেণির আক্রমণাত্মক বিনিয়োগকারীর আরেকটি মারাত্মক ধারণাগত ভুল, আইপিও কিনেই বড়লোক হওয়া সম্ভব। উল্লেখ্য, আইপিও হচ্ছে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য কোনো কোম্পানির প্রথম বিক্রীত স্টক। অনেকের আফসোস, ১৯৮৬ সালে মাইক্রোসফট যখন প্রথম আইপিও বাজারে ছাড়ল তখন কয়েকটা আইপিও যদি একবার কিনে রাখতাম। নিশ্চয়ই বিরাট বিনিয়োগ হতো। কেননা সে সময় যারা মাত্র ২১০০ ডলার দিয়ে মাইক্রোসফটের আইপিও কিনেছেন ২০০৩ সালে এসে সাত লাখ ২০ হাজার ডলারের মালিক হয়েছেন তাদের প্রত্যেকে। তবে আমি এর চেয়েও মজার গল্প শোনাতে পারি। অধ্যাপক জে রিটার ও উইলিয়াম শিওয়ার্ট হিসাব করে দেখেছিলেন যে, কোনো ব্যক্তি যদি মাত্র এক হাজার ডলার খরচ করে ১৯৬০ সালের জানুয়ারিতে ছাড়া ওয়ালস্ট্রিটের প্রতিটি কোম্পানির একটা করে আইপিও কিনতেও সমর্থ হয়ে থাকেন, ৫৩৩-এর পর ৩৩টা শূন্য বসিয়ে তার পর ডলার লিখলে যে পরিমাণ অর্থ হয় ২০০১ সালে তার সেই পরিমাণ সম্পদের মালিক হওয়ার কথা। দুর্ভাগ্যবশত তেমন কোনো বিনিয়োগকারীর দেখা মেলেনি; আর দেখা মেলাও প্রায় অসম্ভব।

মানুষের বিনিয়োগ ভাবনার একটা গুরুত্বপূর্ণ দিক নিয়ে গবেষণা করেছিলেন মনোবিজ্ঞানী ডেনিয়েল কানারম্যান ও আমোস টিভরেস্কি। সেখান থেকে তারা সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, কোনো ঘটনা কতবার ঘটল তার পরিসংখ্যানগত দিক বিবেচনায় সাধারণত সিদ্ধান্ত নেন না বিনিয়োগকারীরা। তাদের গৃহীত সিদ্ধান্তের ভিত্তি হলো, অতীতের সংঘটিত ও মস্তিষ্কের স্মৃতিতে রক্ষিত উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর ঘটনাগুলো। যে কারণে সব আক্রমণাত্মক বিনিয়োগকারীই খোঁজ করেন, কোন কোম্পানি হবে পরবর্তী মাইক্রোসফট। কেননা এর ছোট আরম্ভ ও বিরাট মুনাফা দেওয়ার স্মৃতি এখনও তাদের মনে সমুজ্জ্বল। একজন আক্রমণাত্মক বিনিয়োগকারীর মাথায় রাখা উচিত, আইপিও বাজারে বিজয়ী বিরল। আর উচ্চ মুনাফাপ্রাপ্ত যারা আছে, তাদের সবাই হয় বড় ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক নয়তো ফান্ড হাউজ। তাই শুধু বড় কোম্পানির আশপাশে ঘুরঘুর না করে মাঝারি ও ছোট কোম্পানির ব্যাপারেও ভালোমতো খোঁজখবর নেওয়া উচিত আক্রমণাত্মক বিনিয়োগকারীর। আর বাজারের সব বিনিয়োগকারীও যদি বিশেষ কোনো শেয়ারের পেছনে ছোটেন, আপনি ছুটবেন না যতক্ষণ না আপনার মন ও মগজ সায় দিচ্ছে! আর আইপিওতে বিনিয়োগের বেলায় মনে রাখবেন, আইপিও মানে শুধু ইনিশিয়াল পাবলিক অফারিং নয়, এর অন্য ছদ্মনাম হতে পারে ইটস প্রোবাবালি ওভারপ্রাইসড কিংবা ইমাজিনারি প্রফিটস অনলি অথবা ইনসাইডারস প্রাইভেট অপরচুনিটি।