প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

বেনজামিন গ্রাহাম: দ্য ইনটেলিজেন্ট ইনভেস্টর

 

পূর্বের প্রকাশের পর…………

১৯২০ সালের আগেই ইংল্যান্ডের সবচেয়ে দামি কোম্পানি ছিল সাউথ সি। ওই কোম্পানির কিছু শেয়ার কিনেছিলেন সর্বকালের অন্যতম সেরা চিন্তাবিদ স্যার আইজ্যাক নিউটনও। একবার আকস্মিকভাবে দরপতন শুরু হলে তিনি বেচে দেন সাউথ সি’র সব শেয়ার। বিস্মিত নিউটন শতভাগ মুনাফায় আয় করেন সাকুল্যে সাত হাজার পাউন্ড। শেয়ারের দাম কমার পরও তার কেন লাভ হলো, এটা বুঝতে না পেরে এই মহান পদার্থবিদ নাকি তার এক বন্ধুকে বলেছিলেন ‘মহাবিশ্বের সব জাগতিক বস্তুর গতি-প্রকৃতি নির্ণয় করা সম্ভব; কিন্তু শেয়ারবাজারের মন কিছুতেই নয়।’ বিপত্তি ঘটলো এর পর। হুট করে বাড়তে শুরু করলো সাউথ সি’র শেয়ারদর। তাড়াহুড়ো করে অন্যদের দেখাদেখি বেশকিছু শেয়ার কিনে পরবর্তীতে বিক্রি করে ধরা খেলেন আনুমানিক ২০ হাজার পাউন্ড। এতে প্রচণ্ড হতাশ হন নিউটন। পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করতে গিয়ে এখন পর্যন্ত যদি ব্যর্থও হয়ে থাকেন, তার মানে এই নয় যে আপনি বোকা; আপনাকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না। এর কারণ হলো, সফল বিনিয়োগকারী হওয়ার জন্য যে মানসিক শৃঙ্খলার প্রয়োজন, তা আপনার নেই। যা ছিল না নিউটনেরও।

 

যা জানো তা-ই কেনো

একেবারে হোমওয়ার্ক না করে কোনো শেয়ার কেনার উদ্দেশ্যে বাছাই করবেন না কখনোই। ১৯৮০ ও ৯০’র দশকে ওয়ালস্ট্রিটের অন্যতম জনপ্রিয় স্লোগান ছিল, যা জানো তা-ই কেনো (বাই হোয়াট ইউ নো)। তার প্রচারকদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ছিলেন পিটার লিঞ্চ। ১৯৭৭ সাল থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত ‘ফিডেলিটি ম্যাগেলান’ নামক বিখ্যাত মিউচুয়াল ফান্ড পরিচালনা করেছেন পিটার। উল্লেখ্য, ফান্ডটির ট্র্যাক রেকর্ড ওই সময়েই সবচেয়ে ভালো ছিল। বিনিয়োগ প্রসঙ্গে পিটারের মতবাদ ছিল প্রতিদিনের অভিজ্ঞতায় একটু একটু করে অর্জিত জ্ঞান, যা বিশেষজ্ঞরা প্রায় ভুলে যেতে বসেছে, সেই শক্তিতে বলীয়ান হয়ে এখনই আনাড়ি বিনিয়োগকারীদের এগিয়ে চলার সময়। তার যুক্তি ছিল, আপনি প্রতিদিন টুথপেস্ট, টুথব্রাশ, গাড়িসহ বিভিন্ন পণ্য ব্যবহার করেন। আবার বহু কোম্পানির একই পণ্য ব্যবহারের পর আপনি এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, অমুক কোম্পানির টুথপেস্ট কিংবা টুথব্রাশ ভালো। সুতরাং ওই কোম্পানির আসলে কী অবস্থা, তাও আপনার জানতে বাকি নেই। ভালো রেস্তোরাঁ দেখে চিনবেন কীভাবে? পিটার বলতেন, যে রেস্তোরাঁর বাইরে ভিড় বেশি, স্বভাবতই সেটি চালু। তার মানে ওয়ালস্ট্রিটে যে জ্ঞান অর্জনের জন্য বছরের পর বছর সময় লাগে, সেই জ্ঞান আগে থেকেই আছে আপনার এবং প্রতি মুহূর্তে বাড়ছে সেই জ্ঞান। পিটারের মতে, এই জ্ঞান বিশেষজ্ঞ মতের চেয়ে শক্তিশালী এবং ওই জ্ঞানধারী একজন বিনিয়োগকারী বিশেষজ্ঞদের পরাজিত করার মতো জ্ঞান। পিটারের সূত্রটি ভুল বলব না। তবে এটি অসম্পূর্ণ। লক্ষণীয়, বিনিয়োগের জন্য শেয়ার বাছাইয়ের প্রথম ধাপ এটি। আর তার পরের ধাপ হলো, ভালোভাবে খোঁজখবর নেওয়া। সুতরাং পিটারের যোগ করা উচিত ছিল, ‘অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান দিয়ে প্রতিশ্রুতিশীল কোম্পানি চিহ্নিত করুন আর বাছাই করুন বিশ্লেষণপূর্বক’। দুর্ভাগ্যবশত এই মতানুসারী সিংহভাগ বিনিয়োগকারী প্রথম ধাপে উঠে এতই খুশি থাকেন যে, ভুলে যান পরবর্তী ধাপে ওঠার কথা।

পিটার নীতির আরেকটি দুর্বলতা দৃশ্যমান। মনে করুন, আপনি একটি নামকরা প্রতিষ্ঠানের কর্মী। প্রতিষ্ঠানটির ব্যাপারে আপনি আগেই সুনাম শুনেছেন এবং চাকরিতে যোগাদানের পর অভ্যন্তরীণ কর্মকাণ্ড দেখেশুনে আপনার আরো আত্মবিশ্বাস জন্মেছেন যে, বিনিয়োগের জন্য এর শেয়ারে বিনিয়োগ করা উত্তম হবে; কেননা ভবিষ্যতে কোম্পানিটি আরও ভালো করবে বলে আপনার ধারণা। আসলেই কি তা-ই? তাহলে এ ধরনের মতো বিখ্যাত কোম্পানিতে বিনিয়োগ করে বহু এনরন-কর্মী সর্বস্বান্ত হলেন কীভাবে? উল্লেখ্য, বহু এনরন-কর্মী কোম্পানির ভবিষ্যৎ বিষয়ে অন্ধ-ধারণাবরশত অবসরকালে একবারে-প্রাপ্ত পেনশনের প্রায় সমুদয় অর্থ এনরনের শেয়ারেই বিনিয়োগ করেন। একপর্যায়ে এনরন দেউলিয়া ঘোষিত হয়েছিল, আপনারা জানেন। সমস্যা কোথায়? তবে কি অধিক পরিচিত বিষয়াদির ব্যাপারে মানুষের জ্ঞানের মায়া (ইলিউশন অব নলেজ) যতটুকু থাকে, প্রকৃত জ্ঞান ততটা থাকে না? কার্নেগি মেলোন ইউনিভার্সিটির মনোবিজ্ঞানী বারুচ ফিশোফের নেতৃত্বে এ বিষয়ে বিস্তারিত গবেষণা হয় একবার। বারুচ দেখিয়েছেন, একজন মানুষ যখন কোনো একটি বিষয়ের সঙ্গে বেশি পরিচিত হয়ে ওঠে তখনও সে প্রকৃতপক্ষে ওই ব্যাপারে যতটা জানে, তার চেয়েও বাড়িয়ে অতি-আত্মবিশ্বাসবশত সেটি প্রদর্শন করে অন্যদের সামনে। তাই আগে থেকে কোনো কোম্পানিকে ‘জানা’টা বিনিয়োগের জন্য কিছুটা বিপজ্জনক বৈকি। কেননা এক্ষেত্রে যে অতি-আত্মবিশ্বাস তৈরি হয় তার বৈজ্ঞানিক নাম ‘হোম বায়াস’। আর এর শিকার ব্যক্তিরা পরিচিত বিষয়ের দুর্বলতার দিকটি সম্পর্কে অন্ধ হতে থাকেন ক্রমেই। আরও সহজ করে বললে, পরিচিতি আত্মতুষ্টি বা বিরোধিতা বাড়ায়। সেজন্য দেখবেন, টিভিতে যখন পরিচিত কাউকে জেলহাজতে নিয়ে যেতে দেখেন (হয়তো সাদামাটা অপরাধে), সবচেয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেন প্রতিবেশীরা ‘অমুককে এত ভালো জানতাম’, ‘এই ছেলে এই কাজ করতে পারে, এখনও বিশ্বাসই হচ্ছে না আমার’ প্রভৃতি। অন্যরা হয়তো ওই নিউজ দেখে চোখই তুলবে না।

এখন কথা হলো, শেয়ারবাজারে একজন রক্ষণাত্মক বিনিয়োগকারীর কী পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করা উচিত। এটি বিনিয়োগকারীর সাধ ও সাধ্যের ওপর প্রায় পুরোপুরি নির্ভরশীল। তবে একটি বিষয় আছে। রক্ষণাত্মক ভঙ্গিতে বিনিয়োগের ব্যাপারে ‘ডলার-কস্ট অ্যাভারেজিং’ পদ্ধতি অনুসরণযোগ্য। এটি বিশেষ ধরনের ফর্মুলা ইনভেস্টিং (সূত্র মোতাবেক বিনিয়োগ)। এ ধরনের মাসিক ক্রয় পরিকল্পনার প্রচারও দীর্ঘদিন করেছে নিউইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জ। সূত্রটির মূলমন্ত্র হলো, প্রতি মাসে একই পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করে যাওয়া। ধরুন, প্রতি মাসে শেয়ারে বিনিয়োগের মতো ৫০০ ডলার উদ্বৃত্ত অর্থ (পোর্টফোলিও) আছে আপনার হাতে। সেটাকে তিন ভাগে ভাগ করতে হবে এখন। তার এক ভাগে থাকবে ৩০০ ডলার। ১০০, ১০০ করে মোট ২০০ ডলার বাকি দু’ভাগে। একাংশ বিনিয়োগ করুন স্থানীয় শেয়ারবাজারে; একাংশ রাখুন বৈদেশিক শেয়ারবাজার কিংবা ব্যাংকের সেভিং ডিপোজিটের জন্য এবং আরেক অংশ দিয়ে কিনুন বন্ড। তাতে মোটামুটি বিনিয়োগের সব দিকই কাভার হবে। এ অবস্থায় আপনি যদি প্রতি মাসে অব্যাহতভাবে ১০০ অথবা ৩০০ ডলার শেয়ার কেনায় ব্যয় করে যান, তাহলে দেখবেন মাঝেমধ্যে শেয়ার বেশি কিনতে পারছেন, মাঝে মধ্যে কম। কিন্তু ওভাবে ধারাবাহিকভাবে বিনিয়োগ করার চূড়ান্ত ফল লাভজনকই হবে। আসলে ‘ডলার-কস্ট অ্যাভারেজিং’ সিস্টেম একধরনের বিশেষ অটোপাইলট। বাজার বেশি উঁচুতে উঠে গেলেও লোভনীয় শেয়ার বেশি হারে কেনার প্রলোভন দেখিয়ে এটি উত্তেজিত করবে না আপনাকে। আবার যখন পড়তি বাজারে বহু শেয়ার বিষাক্ত, তখনও ব্যবস্থাটি বেশি শেয়ার গ্রহণে বাধা দেয় বিনিয়োগকারীকে। বাজারে কিছু বিনিয়োগকারী দেখা যায়, যদি জিজ্ঞেস করেন, ‘হেলথকেয়ার কেনা ভালো হবে, না হাই-টেক? তারা বলবেন, আই ডোন্ট নো অ্যান্ড আই ডোন্ট কেয়ার (জানি না, ওর পরোয়াও করি না)। বুক ফুলিয়ে চলা এই বিনিয়োগকারীদের বেশিরভাগই ‘ডলার-কস্ট অ্যাভারেজিং’ পদ্ধতির অনুসারী।

সহজে অনুমেয়, বাজার আরোহণের সময় ‘ডলার-কস্ট অ্যাভারেজিং’ লাভজনক। লুসিল টমলিনসন এ বিষয়ে বিস্তারিত গবেষণা করেছিলেন। তিনি ১০ বছরকে পর্যায়কাল ধরে দেখিয়েছেন, ১৯২৯ থেকে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত ‘ডলার-কস্ট অ্যাভারেজিং’ পদ্ধতির অনুসারীরা মুনাফা করেছে দু’টি পর্যায়ে হয় শেয়ার কেনার সঙ্গে সঙ্গে, নয়তো পাঁচ বছর পরে। তার মধ্যে কয়েকটি পর্যায়কালে লভ্যাংশ বাদে বিনিয়োগকারীদের গড় মুনাফা ২১ দশমিক ৫ শতাংশ! (অবশ্যই এটা বাজার ভালো থাকা অবস্থায়; মন্দা বাজারে প্রায় সবারই আয় হয় কম)। লুসিল তার প্রতিবেদনের উপসংহার টেনেছিলেন এভাবে, ডলার-কস্ট অ্যাভারেজিংয়ের মতো সহজ ও কার্যকর ফর্মুলা ইনভেস্টিং বিরল। আর চূড়ান্ত বিচারে ডলার-কস্ট অ্যাভারেজিং জেতে, এটাই মূল শক্তি। অনেকের আপত্তি, পদ্ধতিটি কল্পনা হিসেবে ভালো, বাস্তবে অকেজো। জটিল সমীকরণ না থাকায়ই বোধকরি তারা হতাশ। তর্কে যাব না। সুলেখক, পন্ডিত, বিজ্ঞানী বেনজামিন ফ্রাঙ্কলিনই এর উত্তর দিয়ে গেছেন। তিনি বলতেন, ‘আকস্মিকভাবে পাওয়া সুফল মানুষের কমই জোটে। বরং তার সামগ্রিক জীবনের অর্জিত সাফল্য ছোট ছোট অসংখ্য পদক্ষেপের ওপর নির্ভরশীল’।

ভালো শেয়ার নির্বাচন এবং সাধ্যমতো উপযুক্ত পরিমাণ বিনিয়োগ নির্ধারণের পরই একজন বুদ্ধিমান রক্ষণাত্মক বিনিয়োগকারীর গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে, পোর্টফোলিও’কে হালনাগাদ (আপডেট) রাখা। যারা বেশিদিন হলো শেয়ার বাজারে আসেননি এবং মাত্র বাজারের হালচাল বোঝা শুরু করেছেন, তাদের এক্ষেত্রে বেশি যত্নবান হওয়া উচিত। কেননা আপনার ঝুলিতে যত সার্টিফিকেটই থাকুক, একনজর দেখেই বুঝে নেবেন কোনটা প্রতিশ্রুতিশীল শেয়ার আর কোনটা তা নয়, এটা বিস্তর প্রত্যাশা। তাই পোর্টফোলিও ও বাজার পরিস্থিতি চেক করতে হবে নিয়মিতভাবে। কাজটা বছরে অন্তত একবার করা উচিত। যদি অভ্যেস গড়ে তোলেন, তাহলে দেখবেন নিজে থেকেই বুঝতে পারছেন  কিছু সম্ভাবনাময় কোম্পানির শেয়ার আপনার পোর্টফোলিও থেকে বাদ পড়ে গেছে, তার বদলে এমন কিছু কোম্পানির শেয়ার কিনেছেন আপনি যেগুলো তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিযুক্ত। এ বিশ্লেষণের কাজটা নিজে নিজেই করা ভালো। তবে যদি মনে হয়, গুরুত্বপূর্ণ কোনো কিছু আপনার চোখ এড়িয়ে যেতে পারে অবশ্যই বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নেবেন। শেয়ারবাজারকে ঘিরে বেশ কিছু প্রথম সারির পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ও ব্রোকারেজ হাউজ রয়েছে, যেগুলো আপনাকে বিভ্রান্তিকর কোনো প্রেসক্রিপশন দেবে না বলেই আমার বিশ্বাস। তবে প্রেসক্রিপশন যেমনই হোক, এ অধ্যায়ের শুরুতেই যে চারটি নিয়মের কথা বলেছি, সেগুলোর সঙ্গে মিলিয়ে দেখবেন প্রেসক্রিপশনটি ওই নিয়মের কোনো ব্যত্যয় ঘটায় কি না। ঘটালে বাতিল করে দিন ওই প্রেসক্রিপশন।