প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

বেনজামিন গ্রাহাম: দ্য ইনটেলিজেন্ট ইনভেস্টর

পূর্বের প্রকাশের পর…………

শেয়ারবাজারে কিছু মুহূর্তে চোখ বুজে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন আপনি। কখনও কখনও আবার চোখ-কান খোলা না রাখলে সমূহ বিপদ। কখন চোখ বন্ধ রাখবেন, আর কখন খোলা রাখবেন সে বিষয়ে কিছু উপদেশ ঝেড়েছি। আর এ আলোচনায় বিনিয়োগকারীর সাইকোলজি সম্পর্কে বাক্যালাপ অবধারিত। একজন বিনিয়োগকারীর সবচেয়ে বড় শত্রু হলো তার মেজাজ ও মগজ। কথাটি বর্তমান সময়ে আরও বেশি প্রযোজ্য। মন্দা বাজারে রক্ষণশীল ভাব ধরে নিষ্ক্রিয় হাত গুটিয়ে বসে থাকবেন, তা হবে না। বিনিয়োগ করতে চাইলে ভালো-মন্দ শেয়ার কিনতেই হবে আপনাকে। গায়ে লাগাতেই হবে মন্দা বাজারের উত্তাপ। আমার বিশ্বাস, কারও যদি মোটামুটি চলনসই জ্ঞান-বুদ্ধি থাকে, তিনি যদি আমার কথাগুলো আত্মস্থ করতে সমর্থ হন কাজে আসবে বইটি। সফল বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত গ্রহণের উপযুক্ত মানসিকতা গড়ে তুলতে পারবেন পাঠকরা। আমি কিন্তু বহু সাধারণ বিনিয়োগকারীকে ওয়ালস্ট্রিটে দেখেছি, যারা ফাইন্যান্স, অ্যাকাউন্টিং ও স্টক মার্কেটের ওপর বিশাল ডিগ্রিধারীদের চেয়ে ভালো করেছেন।

 

তীক্ষè স্মরণশক্তি বাজার বিশ্লেষণে ভালো-মন্দ দুটোই

ছয়. শেয়ারদরের ইতিহাস (প্রাইস হিস্ট্রি): পাঠক খেয়াল করে থাকবেন, আমাদের চার কোম্পানির শেয়ারের দরই অতীতে প্রদর্শন করেছে শতাংশীয় অগ্রগতি (পার্সেন্টেজ অ্যাডভান্স)। শেষ ৩৪ বছরে শেয়ারদরের সর্বনিন্ম পয়েন্ট থেকে সর্বোচ্চ পয়েন্ট পর্যন্ত হিসাব করলে দেখা যায়, প্রতি বছরই ঘটেছে শেয়ারের শতাংশীয় মূল্যবৃদ্ধি। যে কোনো সময় একটি শেয়ার ভেঙে দুই বা ততোধিক শেয়ারে পরিণতকরণের সিদ্ধান্ত নিতে পারে কোম্পানি কর্তৃপক্ষ। আমাদের কোম্পানিগুলোর বেলায়ও ঘটেছে একই ঘটনা। তবে প্রতিটি শেয়ার বিভক্তকরণের (স্পিøট) পর পরই সেটিকে পূর্ববর্তী মূল্যের সর্বনিন্মসীমার সঙ্গে সমন্বয় করেছি আমি। লক্ষণীয়, ডাউ সূচকে শেয়ার মূল্যের মানসম্মত সর্বনিন্ম থেকে উচ্চসীমা হচ্ছে ১১’র বিপরীতে ১। আর আমাদের চার কোম্পানির মধ্যে সবচেয়ে কম ব্যবধান এমহার্টের সর্বনিন্ম থেকে উচ্চসীমা হচ্ছে ১৭’র বিপরীতে ১ এবং সবচেয়ে বেশি ব্যবধান এমেরি এয়ার ফ্রেইটের শেয়ারের সর্বনিন্মথেকে উচ্চসীমা দাঁড়ায় ৫২৮’র বিপরীতে ১ পর্যন্ত। এ হিসাব বুঝতে সমস্যা হতে পারে কারও কারও। এজন্য সংক্ষিপ্তভাবে ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন বোধহয়। কোনো শেয়ারের দর ইতিহাস-সংক্রান্ত এ রেশিওটি প্রকৃতপক্ষে শেয়ারের দামের সর্বোচ্চ সীমা বনাম সর্বনিন্ম  সীমার ভাগফল। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ১৯৩৬ সাল থেকে ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত এমেরির সর্বোচ্চ শেয়ারমূল্য ছিল ৬৬ আর সর্বনিন্ম ১/৮ ডলার। এখন সর্বোচ্চ ৬৬-কে সর্বনিন্ম ১/৮ দ্বারা ভাগ করে আমরা পেয়েছি ৫২৮। এই ৫২৮/১ রেশিওই হচ্ছে দামের সর্বনিন্ম থেকে উচ্চসীমার হিসাব। খেয়াল করুন, শেষ ৩৪ বছরে ওই চার কোম্পানির মধ্যে তিনটি কোম্পানির শেয়ারের দামই বেড়েছে কয়েকগুণ। চিন্তিত হবেন? তেমনটা নয়। কারণ পুরোনো কমন স্টকের এক লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হলো, ওই ধরনের শেয়ারের মূল্য বৃদ্ধি ঘটে দ্রুত। মূলত দুভাবে অর্জিত হয় তা। এক. যেহেতু এরা বাজারে বহুদিন ধরে আছে, সেহেতু স্বাভাবিকভাবেই বিনিয়োগকারীর মনে এক ধরনের আস্থা জন্মায় এদের মুনাফা প্রদানের প্রতিশ্রুতি সম্পর্কে। আবার যেহেতু মুনাফার ব্যাপারে বিনিয়োগকারীর মনে আস্থা সৃষ্টি হয়েছে, সেহেতু বাড়ে এর শেয়ার দর। দুই. কোম্পানিটি যদি ভাগ্যক্রমে বুল মার্কেট অতিক্রম করে থাকে, তাহলে বাজার পড়ে যাওয়ার পরও তার শেয়ারে থাকে অতিক্রান্ত বুল মার্কেটের চাঙাভাবের একটা ছোঁয়া। এদিকে লক্ষণীয়, ১৯৬৯-৭০ সালে দর বিপর্যয় ঘটে ওয়ালস্ট্রিটে। সে সময় এল্ট্রা ও এমহার্টের মূল্য সংকোচন ঘটে ৫০ শতাংশেরও বেশি। অন্যদিকে তার চেয়ে কম কিন্তু একেবারে কম নয়, দরপতন জোটে এমারসন ও এমেরির কপালে। তবে ১৯৭০ সালের শেষ দিকে আবার দরবৃদ্ধি ঘটাতে সক্ষম হয় এল্ট্রা ও এমহার্ট। আর একই ঘটনা ঘটাতে এমারসন ও এমেরির সময় লেগে যায় ১৯৭১ সাল পর্যন্ত।

সাধারণ পর্যবেক্ষণ

এমারসন ইলেকট্রিকের বাজারমূল্য বিশাল। এর একার বাজারমূল্য আমাদের চার কোম্পানির মধ্যে বাকি তিন কোম্পানির সম্মিলিত বাজারমূল্যের প্রায় সমান। ১৯৭০ সালে ১ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার ছিল এমারসনের মার্কেট ভ্যালু। বাজারে ছাড়া এমারসনের সম্পূর্ণ কমন স্টকের আয়তন ২০০২ সালে উপনীত হয় প্রায় ২১ বিলিয়ন ডলারে। আমার মতে, তীক্ষ স্মরণশক্তি নামক গুণটি একজন ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালিস্টের জন্য একই সঙ্গে আশীর্বাদ ও প্রতিবন্ধিত্ব। আশীর্বাদ এজন্য যে, ভালো স্মরণশক্তি ছাড়া বাজারের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করা কঠিন। আর প্রতিবন্ধিত্ব এই অর্থে যে, ভালো স্মরণশক্তি অনেক সময় দ্রুত বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নেওয়ার বেলায় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। যেমন: উপর্যুক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে অনেক বিশ্লেষকই হয়তো এমারসন ইলেকট্রিক ও জেনিথ রেডিওর মাঝে মিল দেখতে ও দেখাতে চাইবেন। তবে আমি মনে করি, জেনিথের সঙ্গে তুলনা করা হলে অপমানিত হবে এমারসন। অস্বীকার করছি না, কয়েক বছর আলোকগতিতে প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে জেনিথ। এক ১৯৬৬ সালেই বিক্রি হয়েছে এর আনুমানিক ১ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের শেয়ার। তবু এ বাস্তবতা কীভাবে এড়াই কোম্পানিটি ৪৩ মিলিয়ন ডলার মুনাফা করে ১৯৬৮ সালে; যেটি প্রায় অর্ধেকে নামে ১৯৭০ সালে। আরও আছে। ১৯৬৮ সালে জেনিথের ১ ডলারের শেয়ার বিক্রি হয়েছে ৮৯ ডলারে। একই শেয়ার ২২ দশমিক ৫ ডলারে বিক্রি হয় ১৯৭০ সালের শেষ প্রান্তিকে।

আপাতদৃষ্টিতে এমেরি এয়ার ফ্রেইটই আমাদের উল্লিখিত চার কোম্পানির মধ্যে সবচেয়ে প্রতিশ্রুতিশীল। এক্ষেত্রে আমার প্রধান বিবেচনা ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধি। অবশ্য ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির ওপর শেয়ারের মূল্যকে স্থান দেওয়া হলে আবার এমেরি সবচেয়ে কম আকর্ষণীয়। কেননা এমেরির শেয়ার মূল্য তার সর্বোচ্চ আয়ের প্রায় ৪০ গুণ। সেজন্য প্রবৃদ্ধির দিক থেকে এমেরি-কে যত প্রতিশ্রুতিশীলই মনে হোক, একে নিয়ে অতটা উচ্ছ্বসিত হতে পারছি না। নিঃসন্দেহে এর অতীত প্রবৃদ্ধি মনোহর। তা সত্ত্বেও আমি তেমন আশাবাদী হতে পারছি না আরেকটা কারণে। সেটি হলো, আকারের দিক থেকে খুব একটা বৃহৎ প্রতিষ্ঠান নয় এমেরি। তা ১৯৫৮ সালের নিট আর্নিং থেকেই বোঝা যায়। ওই বছর তাদের নিট আয় হয় মাত্র ৫ লাখ ৭০ হাজার ডলার। এর মানে হলো, প্রকৃতিগতভাবেই খুব বেশি পুঁজির প্রয়োজন এর নেই; সামর্থ্য নেই তা হজমেরও। এরই মধ্যে সাধ্যানুযায়ী বৃহৎ এর মুনাফা ও আয়তন। এখন প্রতিষ্ঠানটির ওপর যত বেশি পুঁজি বিনিয়োজিত হবে, ততই অতিমূল্যায়িত হবে এর শেয়ার এবং যেহেতু এর চাহিদা পূর্ণ, আগামীতে আশানুরূপ হবে না এর মুনাফা। তবু এমেরির একটি বিষয় আমার কাছে বিস্ময়কর মনে হয়। সেটি হলো, ১৯৭০ সালে আয়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বেড়েছে এর বাজারমূল্য। অথচ বিশেষভাবে ওই বছরটিই ছিল অভ্যন্তরীণ বিমান পরিবহন খাতের সবচেয়ে মন্দা বছর। এখান থেকে আরেকটি দুশ্চিন্তা জাগে। বিমান পরিবহন খাত যেভাবে মুখ থুবড়ে পড়েছে পুঁজিবাজারে, তাতে করে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে আগামীতে আরও বেশি প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হতে হবে এমেরি-কে প্রতিযোগিতা ক্ষেত্র সংকুচিত হওয়ায়। সেক্ষেত্রে মুনাফা টিকিয়ে রাখতে ফরওয়ার্ডিং এজেন্টদের ব্যবস্থাপনাগত পরিবর্তন আনা আবশ্যক। পাশাপাশি সামলাতে হবে বিমান সংস্থাগুলোর তরফ থেকে সংস্থান চাপ (অ্যারেঞ্জমেন্ট প্রেশার)। আর অমন পরিস্থিতি এলে এমেরি কেমন পারফরম্যান্স দেখাবে, সে বিষয়ে ভবিষ্যদ্বাণী থেকে বিরত থাকাই বুদ্ধিমান বিনিয়োগকারীর জন্য উত্তম। অবশ্যই এমন সন্দেহের উদ্রেক হওয়ায় সঙ্গে সঙ্গে কোম্পানিটি নিয়ে অধিকতর গবেষণায় ব্যস্ত হবেন আক্রমণাত্মক বিনিয়োগকারী। তবে রক্ষণাত্মক বিনিয়োগকারীর ওই সংশয় দেখেই কেটে পড়ার কথা।

এমহার্টের লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হলো, ওয়ালস্ট্রিটে তালিকাভুক্ত হওয়ার পর শেষ ১৪ বছরে এরা শেয়ারবাজারে যত না ভালো করেছে, প্রকৃতপক্ষে তার চেয়ে অনেক বেশি ভালো করেছে ব্যবসায়। ১৯৫৮ সালে এমহার্টের শেয়ার বিক্রি হয় চলতি আয়ের ২২ গুণ দামে। তখন একই দামে বিক্রি হতো ডাউ সূচকভুক্ত কোম্পানির শেয়ারও। আবার একই বছর ডাউ মুনাফা ১০০ শতাংশ হলে এমহার্টের মুনাফা হয়েছে ৯০ শতাংশ। এদিকে ১৯৭০ সালে ডাউ শেয়ারের মূল্য হ্রাস পায় ৪৩ শতাংশ, সেখানে মাত্র ৩৩ শতাংশ কমে এমহার্টের শেয়ারদর।

এল্ট্রার রেকর্ডও কমবেশি একই রকম। চালু ভাষায় বললে, এমহার্ট ও এল্ট্রার শেয়ারের কোনো ‘সেক্স অ্যাপিল’ বা ‘গ্ল্যামার’ নেই চলতি বাজারে। অথচ পরিসংখ্যানগত তথ্য-উপাত্ত বলছে, অগ্রাহ্য করার মতো নয় এদের পারফরম্যান্স। এ অবস্থায় কোম্পানিদ্বয়ের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে কেউ জানতে চাইলেও জোর দিয়ে বলতে পারবো না কিছু। কারণটা সরল এখনও দরবেশ বা ঋষি হতে পারিনি আমি। তবে এসঅ্যান্ডপি তাদের গবেষণা প্রতিবেদনে আলোচ্য চার কোম্পানির ভবিষ্যৎ সম্পর্কে কী মন্তব্য করেছিল, সেটা তুলে ধরতে পারি এখানে:

১. এল্ট্রা: দীর্ঘমেয়াদি ভবিষ্যৎ আছে এদের। যদিও কোম্পানির কিছু কর্মকাণ্ড পুনরাবৃত্তিমূলক (সাইক্লিক্যাল), এল্ট্রার মূল শক্তি হলো: প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান (কম্পিটিটিভ পজিশন) ও বৈচিত্র্যায়ন (ডাইভারসিফিকেশন)।

২. এমারসন ইলেকট্রিক: এর নিকটবর্তী ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল। দূর ভবিষ্যতেও ভালো করার সম্ভাবনা বিদ্যমান। কেননা এরই মধ্যে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে দৃশ্যমান ব্যবসায়িক কর্মসূচি বৃদ্ধির উদ্যোগ নিয়েছে কোম্পানিটি।

৩. এমেরি এয়ার ফ্রেইট: চলতি বাজারে এমেরির শেয়ারের দাম খানিকটা বেশি। ভবিষ্যতে যথাযথভাবে মূল্যায়নগত সমন্বয় হলে ভালো করবে এমেরি।

৪. এমহার্ট: এরা পুঁজি ব্যয় (ক্যাপিটাল স্পেন্ডিং) নিয়ন্ত্রণে রেখেছিল ১৯৭০ সালে। ফলে ১৯৭২ সালে সামগ্রিকভাবে গ্লাস কনটেইনার ইন্ডাস্ট্রির উন্নয়ন হলে আয় বাড়বে এমহার্টের। তবে এর শেয়ার ৩৪ ডলারের বেশি দাম দিয়ে কেনা সংগত নয়।

এবার উপসংহার। অনেক ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালিস্টের মনে হতে পারে, বাকি দুই কোম্পানির তুলনায় সবচেয়ে আকর্ষণীয় হলো এমারসন ও এমেরির শেয়ার। এরূপ ধারণার প্রাথমিক কারণ, উভয় কোম্পানির মার্কেট অ্যাকশন। দ্বিতীয়ত এদের শেয়ারপ্রতি আয় প্রবৃদ্ধি বাকি দুজনের তুলনায় দ্রুততর। কিন্তু আগেই বলেছি, আমার কষ্টার্জিত পয়সা সীমিত। সুতরাং আমার বিনিয়োগ নীতি রক্ষণশীল। এজন্য মার্কেট অ্যাকশনের যুক্তিটিকে বিনিয়োগকারীর কোনো যুক্তিই মনে করি না আমি। এটা ফাটকাবাজদের খেলার বস্তু হতে পারে। তাদের দ্বিতীয় যুক্তি অকাট্য। তবে সীমাবদ্ধতা আছে। ফলে এক কথায় কেউ জানতে চাইলে, আমি অবশ্যই এমেরি এয়ার ফ্রেইটের অতীত প্রবৃদ্ধি ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার প্রশংসা করবো; কিন্তু তাদের শেয়ার কিনতে যাবো না ৬০ গুণ বেশি দামে*। এ স্বল্প পরিসরে গভীরভাবে কোম্পানিগুলোর সিকিউরিটি অ্যানালাইসিসের সুযোগ নেই। পেলে এমেরি নিয়ে আরও গবেষণা করে স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছা যেতো। কিন্তু যতটুকু তথ্য-উপাত্ত আছে, তার ভিত্তিতে একজন সতর্ক ব্যক্তি হিসেবে আমি এমেরির শেয়ারে বিনিয়োগ করতে নারাজ। এমেরি-কে নিয়ে ওয়ালস্ট্রিটের উচ্ছ্বাসে শরিক হতে পারছি না বলেও দুঃখিত। আর এমারসনের ব্যাপারে আমি অনাগ্রহী সম্পূর্ণ ভিন্ন কারণে। কোম্পানি হিসেবে এমারসন অসাধারণ। সমস্যা হলো, খাত হিসেবে এক সময় চোখের মণি হয়ে থাকা ইলেকট্রনিকস খাত বর্তমান পুঁজিবাজারের চক্ষুশূল। তাছাড়া এমারসনের পারফরম্যান্স নিজ খাতেই ব্যতিক্রম। থাকুক, তা নিয়ে আপত্তি নেই আমার। কিন্তু ব্যতিক্রমীদের নিয়ে সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা হলো, আর কতক্ষণ ব্যতিক্রম থাকতে পারে এরা। উপরন্তু প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত থেকে এমারসনের আর্নিং পাওয়ার ফ্যাক্টর আসলে কত, তা বোঝা যায় না। ওদিকে লক্ষণীয়, আয়ের ২৭ গুণ বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে এল্ট্রার শেয়ার আর ৩৩ গুণ বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে এমহার্ট। তার মানে হলো, বিনিয়োগটি মোটামুটি সুরক্ষিত। নিরাপদ বিনিয়োগ ক্ষেত্র হওয়ার জন্য কোনো কোম্পানির শেয়ারের পেছনে যে পরিমাণ পর্যাপ্ত পুঁজি থাকতে হয়, সেটি আছে এর। ফলে আমার পরামর্শ হচ্ছে, কেউ যদি বিনিয়োগ করতে চান তার উচিত এল্ট্রা ও এমহার্টের শেয়ার কেনা। এখনও আশ্বস্ত না হলে লক্ষ করুন, এল্ট্রা-এমহার্টের পুঁজি ইনপুটের সঙ্গে মুনাফার আউটপুট সংগতিপূর্ণ। এদের রেট অব রিটার্ন সন্তোষজনক এবং শেয়ারপ্রতি আয় সার্বিকভাবে স্থিতিশীল। উভয় কোম্পানির অতীত প্রবৃদ্ধিও আমলযোগ্য বটে।

উপর্যুক্ত বিশ্লেষণের ভিত্তিতে বলা যায়, বিনিয়োগযোগ্য কোম্পানি হতে চাইলে একটি প্রতিষ্ঠানকে সাতটি পরিসংখ্যানগত শর্ত পূরণ করতে হয়। যথাসম্ভব বিস্তারিতভাবে এগুলো আমরা পরবর্তী অধ্যায়ে আলোচনা করবো। তবে পাঠকদের জ্ঞাতার্থে সেগুলোর নামোল্লেখ হতেই পারে এখানে:

এক. কোম্পানির উপযুক্ত সাইজ।

দুই. শক্তিশালী আর্থিক অবস্থান।

তিন. ২০ বছর ধরে অব্যাহতভাবে লভ্যাংশ পরিশোধের রেকর্ড।

চার. গত ১০ বছরে কোনো আয় ঘাটতি নয়।

পাঁচ. গত ১০ বছরে শেয়ারপ্রতি আয়ে কমপক্ষে এক-তৃতীয়াংশ প্রবৃদ্ধি।

ছয়. শেয়ারের দাম নিট অ্যাসেট ভ্যালুর দেড়গুণের বেশি নয়।

সাত. শেয়ারের দাম শেষ তিন বছরের গড় আয়ের ১৫ গুণের বেশি নয়।

(গ্রাহামের বিশ্লেষণ ভুল ছিল না। ১৯৮২ সালের ১ মার্চ এক প্রতিবেদন প্রকাশ করে বিশ্বখ্যাত ফোর্বস ম্যাগাজিন। তাতে উল্লেখ করা হয়, দীর্ঘমেয়াদি ভবিষ্যতের দিক বিবেচনায় ১৯৭২ সালের অন্যতম ফ্যাশনেবল স্টকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বাজে পারফরম্যান্সকারী কোম্পানি হচ্ছে এমেরি। ‘দ্য ইনটেলিজেন্ট ইনভেস্টরে’র চলতি সংস্করণ প্রকাশের পর থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত এক মূল্যস্ফীতির প্রভাবেই ৭২ দশমিক ৮ শতাংশ দর হারায় এমেরি। অবশ্য ১৯৭৪ সালেই মিনেপোলিসের বিনিয়োগ গবেষণা প্রতিষ্ঠান লিউথোল্ড গ্রুপ দেখিয়েছিল, এমেরির স্টক ৫৮ শতাংশ দর হারানোয় তার পিই রেশিও ৬৪ থেকে নেমে এসেছে ১৫-তে। লিউথোল্ডের প্রতিবেদন আরও বলে, ১৯৭২ সালে যেসব বিনিয়োগকারী এমেরি-তে ১ হাজার ডলার বিনিয়োগ করেছিলেন, তাদের সেই বিনিয়োজিত অর্থের মূল্যমান ৮৩৯ ডলারে পরিণত হয় ১৯৯৯ সালে। ইন্টারনেট স্টকের বেলায়ও প্রায় একই ঘটনা ঘটতে দেখা গেছে। এ ধরনের স্টকের সমস্যা হলো, অসীমকাল না হোক, অন্তত কয়েক দশক চলে যায় ওই ধরনের শেয়ার ব্রেক-ইভেন পর্যায়ে আসতে।)