প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

বেনজামিন গ্রাহাম: দ্য ইনটেলিজেন্ট ইনভেস্টর

 

পূর্বের প্রকাশের পর………………….

শেয়ারবাজারে কিছু মুহূর্তে চোখ বুজে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন আপনি। কখনও কখনও আবার চোখ-কান খোলা না রাখলে সমূহ বিপদ। কখন চোখ বন্ধ রাখবেন, আর কখন খোলা রাখবেন সে বিষয়ে কিছু উপদেশ ঝেড়েছি। আর এ আলোচনায় বিনিয়োগকারীর সাইকোলজি সম্পর্কে বাক্যালাপ অবধারিত। একজন বিনিয়োগকারীর সবচেয়ে বড় শত্রু হলো তার মেজাজ ও মগজ। কথাটি বর্তমান সময়ে আরও বেশি প্রযোজ্য। মন্দা বাজারে রক্ষণশীল ভাব ধরে নিষ্ক্রিয় হাত গুটিয়ে বসে থাকবেন, তা হবে না। বিনিয়োগ করতে চাইলে ভালো-মন্দ শেয়ার কিনতেই হবে আপনাকে। গায়ে লাগাতেই হবে মন্দা বাজারের উত্তাপ। আমার বিশ্বাস, কারও যদি মোটামুটি চলনসই জ্ঞান-বুদ্ধি থাকে, তিনি যদি আমার কথাগুলো আত্মস্থ করতে সমর্থ হন কাজে আসবে বইটি। সফল বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত গ্রহণের উপযুক্ত মানসিকতা গড়ে তুলতে পারবেন পাঠকরা। আমি কিন্তু বহু সাধারণ বিনিয়োগকারীকে ওয়ালস্ট্রিটে দেখেছি, যারা ফাইন্যান্স, অ্যাকাউন্টিং ও স্টক মার্কেটের ওপর বিশাল ডিগ্রিধারীদের চেয়ে ভালো করেছেন।

 

বিনিয়োগযোগ্য কোম্পানি খুঁজতে

লক্ষ রাখুন সাত শর্তে

এবার উপসংহার। অনেক ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালিস্টের মনে হতে পারে, বাকি দুই কোম্পানির তুলনায় সবচেয়ে আকর্ষণীয় হলো এমারসন ও এমেরির শেয়ার। এরূপ ধারণার প্রাথমিক কারণ, উভয় কোম্পানির মার্কেট অ্যাকশন। দ্বিতীয়ত এদের শেয়ারপ্রতি আয় প্রবৃদ্ধি বাকি দুটির তুলনায় দ্রুততর। কিন্তু আগেই বলেছি, আমার কষ্টার্জিত পয়সা সীমিত। সুতরাং আমার বিনিয়োগ নীতি রক্ষণশীল। এজন্য মার্কেট অ্যাকশনের যুক্তিটিকে বিনিয়োগকারীর কোনো যুক্তিই মনে করি না আমি। এটা ফাটকাবাজদের খেলার বস্তু হতে পারে। তাদের দ্বিতীয় যুক্তি অকাট্য। তবে সীমাবদ্ধতা আছে। ফলে এক কথায় কেউ জানতে চাইলে আমি অবশ্যই এমেরি এয়ার ফ্রেইটের অতীত প্রবৃদ্ধি ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার প্রশংসা করবো; কিন্তু তাদের শেয়ার কিনতে যাবো না ৬০ গুণ বেশি দামে*। এ স্বল্প পরিসরে গভীরভাবে কোম্পানিগুলোর সিকিউরিটি অ্যানালাইসিসের সুযোগ নেই। পেলে এমেরি নিয়ে আরও গবেষণা করে স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছা যেতো। কিন্তু যতটুকু তথ্য-উপাত্ত আছে, তার ভিত্তিতে একজন সতর্ক ব্যক্তি হিসেবে আমি এমেরির শেয়ারে বিনিয়োগ করতে নারাজ। এমেরিকে নিয়ে ওয়ালস্ট্রিটের উচ্ছ্বাসে শরিক হতে পারছি না বলেও দুঃখিত। আর এমারসনের ব্যাপারে আমি অনাগ্রহী সম্পূর্ণ ভিন্ন কারণে। কোম্পানি হিসেবে এমারসন অসাধারণ। সমস্যা হলো, খাত হিসেবে এক সময় চোখের মণি হয়ে থাকা ইলেকট্রনিকস খাত বর্তমান পুঁজিবাজারের চক্ষুশূল। তাছাড়া এমারসনের পারফরম্যান্স নিজ খাতেই ব্যতিক্রম। থাকুক, তা নিয়ে আপত্তি নেই আমার। কিন্তু ব্যতিক্রমীদের নিয়ে সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা হলো, আর কতক্ষণ ব্যতিক্রম থাকতে পারে এরা! উপরন্তু প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত থেকে এমারসনের আর্নিং পাওয়ার ফ্যাক্টর আসলে কত, তা বোঝা যায় না। ওদিকে লক্ষণীয়, আয়ের ২৭ গুণ বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে এল্ট্রার শেয়ার আর ৩৩ গুণ বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে এমহার্ট। তার মানে হলো, বিনিয়োগটি মোটামুটি সুরক্ষিত। নিরাপদ বিনিয়োগ ক্ষেত্র হওয়ার জন্য কোনো কোম্পানির শেয়ারের পেছনে যে পর্যাপ্ত পুঁজি থাকতে হয়, সেটি আছে এর। ফলে আমার পরামর্শ হচ্ছে, কেউ যদি বিনিয়োগ করতে চান তার উচিত এল্ট্রা ও এমহার্টের শেয়ার কেনা। এখনও আশ্বস্ত না হলে লক্ষ করুন, এল্ট্রা-এমহার্টের পুঁজি ইনপুটের সঙ্গে মুনাফার আউটপুট সংগতিপূর্ণ। এদের রেট অব রিটার্ন সন্তোষজনক এবং শেয়ারপ্রতি আয় সার্বিকভাবে স্থিতিশীল। উভয় কোম্পানির অতীত প্রবৃদ্ধিও আমলযোগ্য বটে।

উপর্যুক্ত বিশ্লেষণের ভিত্তিতে বলা যায়, বিনিয়োগযোগ্য কোম্পানি হতে চাইলে একটি প্রতিষ্ঠানকে সাতটি পরিসংখ্যানগত শর্ত পূরণ করতে হয়। যথাসম্ভব বিস্তারিতভাবে এগুলো আমরা পরবর্তী অধ্যায়ে আলোচনা করবো। তবে পাঠকদের জ্ঞাতার্থে সেগুলোর নামোল্লেখ হতেই পারে এখানে:

এক. কোম্পানির উপযুক্ত সাইজ

দুই. শক্তিশালী আর্থিক অবস্থান

তিন. ২০ বছর ধরে অব্যাহতভাবে লভ্যাংশ পরিশোধের রেকর্ড

চার. গত ১০ বছরে কোনো আয় ঘাটতি নয়

পাঁচ. গত ১০ বছরে শেয়ারপ্রতি আয়ে কমপক্ষে এক-তৃতীয়াংশ প্রবৃদ্ধি

ছয়. শেয়ারের দাম নিট অ্যাসেট ভ্যালুর দেড়গুণের বেশি নয়

সাত. শেয়ারের দাম শেষ তিন বছরের গড় আয়ের ১৫ গুণের বেশি নয়

(* গ্রাহামের বিশ্লেষণ ভুল ছিল না। ১৯৮২ সালের ১ মার্চ এক প্রতিবেদন প্রকাশ করে বিশ্বখ্যাত ফোর্বস ম্যাগাজিন। তাতে উল্লেখ করা হয়, দীর্ঘমেয়াদি ভবিষ্যতের দিক বিবেচনায় ১৯৭২ সালের অন্যতম ফ্যাশনেবল স্টকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বাজে পারফরম্যান্সকারী কোম্পানি হচ্ছে এমেরি। ‘দ্য ইনটেলিজেন্ট ইনভেস্টরে’র চলতি সংস্করণ প্রকাশের পর থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত এক মূল্যস্ফীতির প্রভাবেই ৭২ দশমিক ৮ শতাংশ দর হারায় এমেরি। অবশ্য ১৯৭৪ সালেই মিনেপোলিসের বিনিয়োগ গবেষণা প্রতিষ্ঠান লিউথোল্ড গ্রুপ দেখিয়েছিল, এমেরির স্টক ৫৮ শতাংশ দর হারানোয় তার পিই রেশিও ৬৪ থেকে নেমে এসেছে ১৫-তে। লিউথোল্ডের প্রতিবেদন আরও বলে, ১৯৭২ সালে যেসব বিনিয়োগকারী এমেরিতে ১ হাজার ডলার বিনিয়োগ করেছিলেন, তাদের সেই অর্থের মূল্যমান ৮৩৯ ডলারে পরিণত হয় ১৯৯৯ সালে। ইন্টারনেট স্টকের বেলায়ও প্রায় একই ঘটনা ঘটতে দেখা গেছে। এ ধরনের স্টকের সমস্যা হলো, অসীমকাল না হোক, অন্তত কয়েক দশক চলে যায় ওই ধরনের শেয়ার ব্রেক-ইভেন পর্যায়ে আসতে)

 

রক্ষণাত্মক বিনিয়োগকারীর স্টক নির্বাচন

এ অধ্যায়ে সিকিউরিটি অ্যানালাইসিসের বিস্তৃত টেকনিক নিয়ে আলোচনা করতে চাই। কেননা আমার মনে হয়, তার সময় হয়েছে। এরই মধ্যে দুই ধরনের বুদ্ধিমান বিনিয়োগকারীÑআক্রমণাত্মক ও রক্ষণাত্মকদের পরামর্শ দিয়েছি, উপযুক্ত বিনিয়োগনীতি নির্ধারণ করা যায় কীভাবে। এক ও একাধিক কোম্পানির সিকিউরিটি অ্যানালাইসিস কেমন হওয়া উচিত, আশা করি সে ধারণাও পেয়ে গেছেন পাঠকরা। বাকি রইলো সিকিউরিটি অ্যানালাইসিসের মাধ্যমে কীভাবে বিনিয়োগনীতি বাস্তবায়ন করতে হয়, সেই ইস্যু। সেজন্য চলতি অধ্যায়ে আমাদের আলোচনার বিষয়বস্তু রক্ষণাত্মক বিনিয়োগকারীর স্টক নির্বাচন। আক্রমণাত্মক বিনিয়োগকারীর স্টক নির্বাচন নিয়ে আমরা কথা বলবো পরবর্তী অধ্যায়ে। আগেই বলেছি, হাই-গ্রেড বন্ড ও বৈচিত্র্যময় (ডিভারসিফাইড) কমন স্টক হচ্ছে বৃষ্টির দিনে একজন রক্ষণাত্মক বিনিয়োগকারীর মাথার ছাতা। একই সঙ্গে শেয়ার কেনার বেলায় স্মর্তব্য, যত আকর্ষণীয়ই হোকÑবেশি দামে (চলতি বাজারের যে কোনো ব্যবহারিক মানদণ্ডে) কেনা যাবে না স্টক।

মোটামুটি দুই ধরনের পদ্ধতি অনুসরণ করা যায় পোর্টফোলিওর শেয়ার অংশের বৈচিত্র্য আনয়নে। এক. বিনিয়োগকারী ডাউ সূচক (এ ধরনের কিছু) স্টক দিয়ে সাজাতে পারেন পোর্টফোলিও। দুই. পোর্টফোলিওতে বাছাই করা পরিমাণগতভাবে পরীক্ষিত (কোয়ান্টেটিভলি টেস্টেড) স্টক নিয়েও বাড়ানো যায় বৈচিত্র্য। প্রথম পদ্ধতি অনুসরণ করতে চাইলে ফার্স্ট-ক্লাস ইস্যুর নমুনা ব্যবচ্ছেদ প্রয়োজন। এর মধ্যে নিশ্চয়ই থাকবে অধিক সুবিধাভোগী (ফেভারড) গ্রোথ কোম্পানি ও কম সুবিধাভোগী (লেস ফেভারড) প্রতিষ্ঠান। অধিক সুবিধাভোগী কোম্পানিগুলো সাধারণত হাই-মাল্টিপ্লায়ার কোম্পানি। এদের প্রবৃদ্ধি ও শেয়ারের দাম দুটোই বেশি। এদিকে কম সুবিধাভোগী কোম্পানিগুলো কম জনপ্রিয় বিধায় এদের শেয়ারের দামও তুলনামূলকভাবে কম। তাহলে কীভাবে শেয়ার বাছবেন? আমার মতে, এর সহজতম উপায় হচ্ছে, ডাউ সূচকের মোট ৩০টি স্টক ক্যাটাগরির প্রতিটি থেকে সমান পরিমাণে ইস্যু কিনে ফেলা। এজন্য অমানুষিক শ্রম দিতে বা সাধ্যাতিরিক্ত ব্যয় গুনতে হবে না। ডাউ সূচকের ৯০০-তে যেসব কোম্পানি অবস্থান করছে, তাদের প্রতিটি ক্যাটাগরি থেকে যদি ১০টি করে শেয়ারও কেনা যায়, সাকুল্যে ব্যয় ১৬ হাজার ডলারের বেশি হওয়ার কথা নয়। আবার প্রথম সারির কোনো ইনভেস্টমেন্ট ফান্ডের (তথা মিউচুয়াল ফান্ড) অতীত পারফরম্যান্স নির্ভরযোগ্য হলে তাদের শেয়ারও কিনতে পারেন রক্ষণাত্মক বিনিয়োগকারী। এক্ষেত্রে আরেকটি বিকল্প খোলা। সস্তা ইনডেক্স ফান্ডেও বিনিয়োগ করা যায়। তবে ইনডেক্স ফান্ডের বেলায় নজর রাখতে হবে, ওটার রেট অব রিটার্ন ট্র্যাক রেকর্ড ভালো কি না।

দ্বিতীয় পদ্ধতি অনুসরণের বেলায় বিভিন্ন স্টকে বিনিয়োগের আগে প্রতিটি স্টককে একগুচ্ছ মানদণ্ড দিয়ে যাচাই করে নিতে হবে রক্ষণাত্মক বিনিয়োগকারীকে। সেক্ষেত্রে লক্ষ রাখতে হবে, পছন্দনীয় শেয়ারগুলো যেন কোয়ালিটি (গুণগত) ও কোয়ানটিটি (পরিমাণগত) ক্রাইটেরিয়ায় (নির্ণায়ক) পড়ে। এখানে গুণগত নির্ণায়ক দুটি এক. অতীত পারফরম্যান্স এবং দুই. বিদ্যমান আর্থিক অবস্থানে ন্যূনতম কোয়ালিটি। আর পরিমাণগত নির্ণায়কের ক্ষেত্রে মুখ্য বিবেচ্য হলো: শেয়ারপ্রতি আয় ও অ্যাসেট পার ডলার অব প্রাইসের (প্রতি ডলারের বিপরীতে সম্পদ) ন্যূনতম কোয়ানটিটি।