শাহারুল ইসলাম ফারদিন : দুপুরের সূর্য তখন মাঝ আকাশে। বেনাপোল বন্দরের পাশে একটি চায়ের দোকানে কয়েকজন লাল পোশাক পরিহিত বেনাপোল বন্দরের কুলি বসে আড্ডা দিচ্ছেন। কারও হাতে চা, আবার কারও হাতে পুরোনো একটা টিফিন ক্যারিয়ার; মুখে ক্লান্তি, চোখে মুখে উদ্বেগের ছাপ। একসময় যে বন্দরে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ট্রাকের গর্জন, কুলি-খালাসিদের চিৎকার আর পণ্য ওঠানামায় মুখর থাকত, এখন সেখানে নেমে এসেছে নীরবতা।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে ভারতের সঙ্গে আমদানি-রপ্তানি হঠাৎ কমে যাওয়ায় থমকে গেছে দেশের সবচেয়ে ব্যস্ত স্থলবন্দর বেনাপোল। পণ্য কমে যাওয়ায় কাজ হারিয়েছেন হাজারো শ্রমিক। কেউ কুলি, কেউ ট্রাকচালক, কেউবা খালাসের কাজ করতেন, এখন সবাই একরকম বেকার।
বেনাপোল বন্দর এলাকার কুলি আলমগীর হোসেন (৩৮) বলেন, আগে দিনে দুই-তিনটা ট্রাক খালাস করতাম, ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা আয় হতো। এখন তিন দিনেও একটাও ট্রাক আসে না। বাড়িতে ছেলেমেয়েরা স্কুলে যেতে পারে না, দোকানে বাকিতে চাল-ডাল নিচ্ছি। পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন রবিউল ইসলাম, ট্রাক হেলপার। তিনি বলেন, আমাদের ট্রাক চার দিন ধরে বন্দরেই দাঁড়িয়ে; পণ্য নেই, ভাড়া নেই। বস সাহেবও (কর্তৃপক্ষ) বলছেন, কাজ না হলে বেতন কীভাবে দেব? এখন ভাবি, কীভাবে টিকে থাকব।
একই গল্প বন্দরের শত শত শ্রমিকের মুখে। আগে দিনে তিন শিফটে কাজ হতো, এখন এক শিফটও পুরো হয় না। অনেকেই কাজের অভাবে গ্রামে চলে গেছেন। বেনাপোল বন্দরের ভেতরে ঢুকলে বোঝা যায় না, এটি দেশের সবচেয়ে বড় স্থলবন্দর। আগে যেখানে দিনে দুই হাজারের বেশি ট্রাক ঢুকত, এখন আসে সর্বোচ্চ ১০০। গুদামগুলো ফাঁকা, শ্রমিকদের ভিড় নেই। চায়ের দোকান, হোটেল, ভ্যানচালক সবাই রয়েছেন কষ্টে।
চায়ের দোকানি রফিকুল ইসলাম বলেন, আগে দিনে এক বালতি চা শেষ হয়ে যেত, এখন আধা জগও বিক্রি হয় না। যারা কষ্ট করে চা খেতে আসেন, তাদের অনেকেরই টাকা নেই। তবু আমি দিই, ভাবি হয়তো কাল থেকে কাজ শুরু হবে।
বেনাপোলের মহিলা শ্রমিক সুফিয়া বেগম প্রতিদিন বন্দরে আসেন, যদি কোনো হালকা পণ্য খালাসের কাজ পান। কণ্ঠ কেঁপে উঠছিল কথা বলতে গিয়ে। তিনি বলেন, বাড়িতে তিনটা বাচ্চা। আগে কাজ থাকলে দুধ-বিস্কুট কিনে দিতাম, এখন ওরা শুধু ভাত খায়। সুফিয়া চোখের জল মুছে আবার বলেন, আমরা কাজ ছাড়া কিছু জানি না। কাজ না থাকলে খাওয়া বন্ধ। সরকার যদি একটু সাহায্য করত।
বেনাপোল ক্লিয়ারিং অ্যান্ড ফরওয়ার্ডিং (সিঅ্যান্ডএফ) অ্যাসোসিয়েশনের হিসাব অনুযায়ী, বন্দরের সঙ্গে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে ১২ হাজারেরও বেশি মানুষের জীবিকা নির্বাহ হয়। এর মধ্যে প্রায় আট হাজার শ্রমিক সরাসরি পণ্য ওঠানামার সঙ্গে যুক্ত। তাদের অধিকাংশই দৈনিক মজুরির শ্রমিক, কাজ না থাকলে আয়ও নেই। ফলে বাড়িতে একবেলা খেয়ে থাকতে হচ্ছে অনেক পরিবারকে। কেউ কেউ কিস্তির টাকাও দিতে পারছেন না।
ট্রাকচালক হাসানুল ইসলাম বলেন, আগে মাসে ২৫ হাজার টাকা আয় করতাম, এখন পাঁচ হাজার টাকাও হয় না। কিস্তির লোক এসে গালাগালি করছে। বাচ্চার স্কুলের ফি বাকি। এখন মনে হয় শহর ছেড়ে গ্রামে চলে যাই।
বন্দর সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা বলছেন, ভারতের পেট্রাপোল বন্দরে নতুন প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হয়েছে। কাগজপত্র যাচাইয়ে বিলম্ব, নিরাপত্তা তল্লাশি ও পণ্য পরীক্ষায় কড়াকড়ির কারণে ট্রাক আটকে যাচ্ছে। আগে যেখানে দিনে ২ হাজার ট্রাক পার হতো, এখন তার অর্ধেকও যাচ্ছে না।
বেনাপোল সিঅ্যান্ডএফ অ্যাসোসিয়েশনের নেতা সাবেক সভাপতি মফিজুর রহমান স্বজন বলেন, আমরা প্রতিদিন ক্ষতির মুখে পড়ছি। একদিকে ভারতীয় কড়াকড়ি, অন্যদিকে আমাদের দেশেও কাগজপত্রে দেরি হচ্ছে। সরকার যদি দ্রুত পদক্ষেপ না নেয়, তাহলে শ্রমিকরা পুরোপুরি পথে বসবে।
বেনাপোল বন্দর কর্তৃপক্ষ বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন। বন্দরের উপপরিচালক (ট্রাফিক) রাশেদুল সজীব নাজির বলেন, আমরা ভারতীয় পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করছি। আশা করছি, দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে। দুই দেশের শীর্ষ কর্মকর্তারা বিষয়টি গুরুত্বসহ দেখছেন।
এদিকে বেনাপোল কাস্টমস কমিশনার খালিদ মো. আবু হোসেন বলেন, বাণিজ্যের এই ধীরগতি সাময়িক। আমরা ভারতীয় কাস্টমসের সঙ্গে সমন্বয় করছি। শিগগিরই আগের মতো পণ্যপ্রবাহ শুরু হবে বলে আশা করছি।
প্রিন্ট করুন










Discussion about this post