দিনের খবর সারা বাংলা

বেনাপোল বন্দর ঘিরে সক্রিয় চোরাচালান সিন্ডিকেট

মহসিন মিলন, বেনাপোল (যশোর): দেশের সর্ববৃহৎ স্থলবন্দর বেনাপোলকে ঘিরে শক্তিশালী চোরাচালানি সিন্ডিকেট সক্রিয় হয়ে উঠেছে। তারা ভারতীয় ট্রাক ব্যবহার করে বিভিন্ন ধরনের পণ্য অবৈধভাবে আনছে বন্দরে। আর এতে বন্দরের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী সহায়তা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে সরকার হারাচ্ছে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব।

স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, বেনাপোলের বেশ কিছু চিহ্নিত ট্রাক ড্রাইভার প্রতিদিন অবৈধভাবে রপ্তানি বোঝাই পণ্য নিয়ে ভারতে যায়। ফেরার পথে ভারতের বনগাঁও ও কলকাতার ট্রাকচালকদের সঙ্গে সখ্য করে বাংলাদেশি চালকরা ওষুধ, কসমেটিকস, মাদকদ্রব্য, পোশাক, শাড়ি, থ্রিপিস, খাদ্য দ্রব্যসহ বিভিন্ন পণ্য ভারতীয় ট্রাকের কেবিনে লুকিয়ে বহন করে বেনাপোল বন্দরে নিয়ে আসছে।

জানা গেছে, মাঝেমধ্যে আমদানিকৃত বৈধ মালের সঙ্গেও এসব মালপত্র আনা হচ্ছে। কখনও বন্দরের ট্রাক টার্মিনাল থেকে আবার কখনও বন্দরের অভ্যন্তর থেকে চোরাচালানি এসব পণ্য বাইরে বের করে দেওয়া হচ্ছে। বৈধ আমদানিকৃত পণ্যের সঙ্গে আনা এসব চোরাচালানি পণ্য বহনের কারণে বড় ধরনের হয়রানির শিকার হচ্ছেন দেশের নামি আমদানিকারকরা। এতে ক্ষতিরও আশঙ্কা করছেন আমদানিকারকরা।

গত ৯ নভেম্বর সন্ধ্যায় কাই গ্রুপের ঢাকার আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান অ্যালটেক অ্যালুমিনিয়াম লিমিটেড ভারত থেকে ১২ টন ৯০৮ কেজি অ্যালুমিনিয়াম ইন গুডস আমদানি করে, যার বি/ই নাম্বার সি-৫৩০/৭৮। পণ্য চালানটি কায়িক পরীক্ষা করে ৪৮ লাখ টাকার রাজস্ব পরিশোধ করে বন্দর থেকে ১৪টি ট্রাকে করে খালাস নেয়। এ সময় বন্দরের অভ্যন্তরে থাকা চোরাচালানি সিন্ডিকেট ১৩ বান্ডেল ইন গুডস বোঝাই ঢাকা মেট্রো: ট-১৬-৮১৬৩ নাম্বারের ট্রাক ড্রাইভারের সঙ্গে ভাড়া চুক্তি করে ১৪ বেল কাপড় লোড দেয়।

পরে ড্রাইভার লালন মিয়া মালের কাগজপত্র চাইলে বলা হয় আধা ঘণ্টা পরে দেওয়া হবে। এরই মধ্যে শুল্ক গোয়েন্দা টিম দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে মালের কাগজপত্র চাইলে লালন মিয়ার সহযোগী শাহীনকে খোঁজাখুঁজি করতে থাকে। ততক্ষণে পালিয়ে যায় শাহীন। পরে কাস্টমস বৈধ পণ্যের মধ্যে অবৈধ পণ্য পাওয়ায় সব পণ্য জব্দ করে বলে জানা গেছে।

অন্যদিকে গত ১৮ নভেম্বর ভারত থেকে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠিত আমদানিকারক বিআরবি কেব্ল লি., পিডি লাইফ লি. ও পাওয়ারম্যান বাংলাদেশ লিমিটেডের ছয়টি চালান নিয়ে ডাব্লিউ বি-২৩বি-১২৪৫ নাম্বারের একটি ভারতীয় ট্রাক বন্দরে প্রবেশ করে। পাঁচটি পণ্য চালান বন্দরের ৯ নাম্বার শেডে আনলোড করা হয়। পরে পাওয়ারম্যান বাংলাদেশ লিমিটেডের পাঁচটি ইনট্যাক কাঠের পেটি চালান বন্দরের ৪০ নাম্বার শেডে আনলোডের জন্য যাওয়ার সময় বন্দরের সামনের সড়ক থেকে বিজিবি ভারতীয় ট্রাকটি জব্দ করে। পরে ট্রাকের কেবিন তল্লাশি করে বাজারের ব্যাগে রক্ষিত ক্রিম, চকোলেট, মদ, জিরা, কিশমিশসহ ট্রাকটি জব্দ করে বিজিবি ও কাস্টমস কর্তৃপক্ষ, যার ওজন প্রায় ১৫ কেজি। তল্লাশির সময় ট্রাক ড্রাইভার পালিয়ে যান।

পরে চালানটির পাঁচটি কাঠের পেটি খুলে তল্লাশি করে কোনো অবৈধ পণ্য পাওয়া যায়নি। তবে আমদানিকারকের চালানটি আটক করা হয়। এ ধরনের চোরাচালানি সিন্ডিকেটের কারণে বৈধ আমদানিকারকরা প্রতিনিয়তই নানাভাবে হয়রানির শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন। ফলে অনেক আমদানিকারকই বেনাপোল বন্দর থেকে পণ্য আমদানি না করে চট্টগ্রামে চলে গেছেন বলে জানা গেছে। বিষয়টি তদন্ত করে জরুরি ভিত্তিতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য জোর দাবি জানিয়েছে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো।

ভারত-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের ডিরেক্টর মতিয়ার রহমান বলেন, ‘বৈধ রুটে আমদানি করা ট্রাকে ড্রাইভারের কেবিনের ভেতর থাকা চোরাচালানি পণ্য বহন করা চোরাচালানি সিন্ডিকেটের কারণে কেন বৈধ পণ্য আটক হবে। কেনই বা নামিদামি আমদানিকারকরা হয়রানির শিকার হবে, আমরা এর প্রতিকার চাই। বন্দরের ভেতর প্রতিটি শেডে অবৈধ বহিরাগত লোকজন আছে, তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে।’ 

আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান অ্যালটেক অ্যালুমিনিয়াম লিমিটেডের সিঅ্যান্ডএফ প্রতিষ্ঠান ট্রিম ট্রেডের মালিক জিয়া উদ্দিন বলেন, ‘বন্দর একটি বৈধ বন্ডেড এরিয়া। এখানে কীভাবে চোরাচালানি সিন্ডিকেট গড়ে উঠল। আর সরকারকে ৪৮ লাখ টাকা রাজস্ব পরিশোধ করে কেনই বা আমাদের হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। জরুরি ভিত্তিতে বন্দরের অভ্যন্তরে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে আন-অথরাইজড লোকজনকে আটক করতে হবে।’ 

এ বিষয়ে বেনাপোল কাস্টমস কমিশনার মো. আজিজুর রহমান বলেন, ‘চোরাচালানি সিন্ডিকেটের কারণে বৈধ আমদানিকারকরা প্রতিনিয়তই নানাভাবে হয়রানির শিকার হচ্ছেন বন্দরে। বিষয়টি নিয়ে জরুরি একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে খতিয়ে দেখা হবে। কাস্টমসের পক্ষ থেকে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে চোরাচালানিদের বিরুদ্ধে।’

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..