মত-বিশ্লেষণ

বেসরকারি চাকরিজীবীদের পেনশন সুবিধা

নাজমুল হোসেন: বাংলাদেশ একটি নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশ। এখানে পড়াশোনার মূল লক্ষ্যই হলো কর্মসংস্থান। চাকরি বলতে এখানে সরকারি-বেসরকারি এ দুই সেক্টরের চাকরিকেই বোঝানো হয়। একটা সময় ছিল যখন মেধাবীরা সরকারি চাকরি বাদ দিয়ে বেসরকারি চাকরির প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন। প্রতিভা প্রতিযোগিতার মাধ্যমে কম সময়ে বেতন বাড়ার আশা, আত্মবিকাশের সুযোগ, দ্রুত পদোন্নতি প্রভৃতি ছিল এর মূল কারণ। এভাবে চলেছিলও বেশ কবছর। কিন্তু এতসব সুবিধা কি সব কোম্পানি দেয়?

আমাদের দেশে বড় কোম্পানিগুলোয় হাতেগোনা কয়েকজন উচ্চপদের কর্মকর্তা থাকলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, বড় পদগুলো দখল করে আছেন বিদেশিরা। এদের আবার সুযোগ-সুবিধাও অনেক। তাদের আরাম-আয়েশে কাজ করার জন্য ধাপে ধাপে সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে যথাযথ কর্তৃপক্ষ সর্বদা তৎপর। প্রশ্ন হচ্ছে, আমাদের দেশীয় শ্রমিক-কর্মকর্তাদের বেলায় এ ক্ষেত্রে কেন উল্টো নীতি? এমন আশা নিয়ে তারাও যার যার দায়িত্ব থেকে ঘাম ঝরাচ্ছেন। কিন্তু তাদের বেলায় নেই কর্তাদের কোনো সুদৃষ্টি! নেই সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর কোনো প্রবণতা। তারা মরুক বা বাঁচুক, দিন-রাত খাটুক, প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানিকে আকাশে তুলে দিক এটাই যেন মালিকপক্ষের প্রত্যাশা। কারণে-অকারণে সামান্য ভুলত্রুটিতে নিমিষেই চাকরি চলে যায়। নেই তাদের কোনো জব সিকিউরিটি। এমনকি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের একজন সিইও বা এমডিরও চাকরির নিশ্চয়তা নেই। অন্যদিকে সরকারি একজন পিয়নেরও সে নিশ্চয়তা রয়েছে।

অন্যদিকে সরকারি ও বেসরকারি চাকরিতে প্রবেশে ৩০ বছরের যে সীমাবদ্ধ নীতি, সেটাও এখানে বিরাট সমস্যাÑযা বিশ্বের অন্য কোনো দেশে নেই। ফলে পড়ালেখা শেষ করে দ্রুতই বয়স শেষ হয়ে যাওয়ায় তরুণরা হতাশায় ভুগছে। প্রতিনিয়ত বাড়ছে বেকারত্ব। সর্বশেষ বেতন কাঠামো অনুযায়ী সরকারি চাকরিজীবীদের কাজের প্রতি মনোযোগ বাড়াতে, ঘুষ-দুর্নীতি কমাতে বেতন বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ হারে। সে সঙ্গে বেড়েছে অন্যান্য সুযোগ-সুবিধাও। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, এতসব সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর পরও ঘুষ-দুর্নীতি না কমে উল্টো পাল্লা দিয়ে বেড়েছে। মানুষ যত পায়, ততই চায় আর এখানেও তা-ই হয়েছে। তাহলে তো স্বাভাবিকভাবে তরুণরা সরকারি চাকরির প্রতি আকৃষ্ট হবেই। কারণ, এখানে একদিকে আছে জব সিকিউরিটি, অন্যদিকে সামাজিক মর্যাদা। ভালো পরিবারে বিয়ের ক্ষেত্রে যা নিয়ামক ভূমিকা পালন করে। এছাড়া রয়েছে গাড়ি ও বাড়ির ঋণ, মোবাইল কেনার জন্য টাকা, নানা রকম ভাতা, পর্যাপ্ত ছুটি, পেনশন সুবিধা, গ্রেফতারে সরকারের অনুমতি প্রভৃতি। তাই তরুণরা উচ্চশিক্ষিত হয়েও পিয়ন পদে একটি চাকরির জন্য লাখ লাখ টাকা ঘুষ দিতেও আগ্রহী। কারণ, সরকারি চাকরি এখন ‘হীরার হরিণ’। দেশে সরকারি খাতে চাকরিজীবী ১৫ লাখেরও বেশি (সূত্র: অর্থ মন্ত্রণালয়), যা কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর মাত্র পাঁচ ভাগ। তারা সবাই পেনশন সুবিধা পান। অন্যদিকে, বেসরকারি খাতের ৯৫ শতাংশের মধ্যে মাত্র আট ভাগ ফরমাল বা আনুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত। তাদের কোনো পেনশন সুবিধা নেই। সরকারি খাতের নি¤œ থেকে উচ্চস্তরের কর্মকর্তারা আনুপাতিক হারে বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা পেলেও ব্যাংক বা বহুজাতিক কোম্পানি ছাড়া বেসরকারি খাতে বেতন-ভাতার ক্ষেত্রে স্তরভেদে সুযোগ-সুবিধার এমন আনুপাতিকতা নেই। এককভাবে পোশাক খাতেই রয়েছেন বিভিন্ন পদে প্রায় ৪০ লাখেরও বেশি চাকরিজীবী। পরিতাপের আরেকটি বিষয় হলো, কোম্পানি কর্তারা যেমন খুশি তেমন বেতন দিয়ে থাকেন। এই বেতন নির্ধারণের যেন কোনো নিয়ম-নীতি নেই। এদের হয়ে কথা বলার জন্য বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নেই কোনো ইউনিয়ন। নেই সরকারেরও মাথাব্যথা। প্রতিটি বিষয়েরই সঠিক বিচারের একটি মানদণ্ড থাকা উচিত। কাকডাকা ভোরে ওইসব নিচু ও মাঝারি পদের কর্মীরা বের হয়ে সকাল-সন্ধ্যা কাজ করে প্রতিষ্ঠানগুলোকে লাভবান করে দিচ্ছেন, দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। অথচ এরাই আবার বঞ্চিত হচ্ছেন। পোশাক-আশাকে নেহাত সুখী ও ভদ্র দেখালেও অদেখা শত কষ্ট, না পাওয়ার যন্ত্রণা ও অনিশ্চয়তার যন্ত্রণা তাদের কুরে কুরে খায়। বাজারের নিয়মানুযায়ী দক্ষতা বেশি হলে বেতনও বেশি হয়। যদি তা-ই হয়, তাহলে বাজার অর্থনীতিতে যারা বেশি অবদান রাখছেন, তাদের বেতন বেশি হওয়া উচিত। তবে বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে প্রতিটি খাতের ন্যূনতম মজুরি ও বেতন থাকা উচিত। একটি নির্দিষ্ট সময় অন্তর মূল্যস্ফীতির সঙ্গে ভারসাম্য রেখে বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি দরকার। অন্যথায় বৈষম্য মাত্রাছাড়া হয়ে যাবে। এদের যেমন নেই পেনশন সুবিধা, তেমনি নেই চাকরির নিশ্চয়তা; ঈদ ছাড়া নেই তেমন কোনো ছুটিও। একটা বয়সে হঠাৎ করে কারও চাকরি চলে গেলে তিনি সন্তান-সন্ততি নিয়ে খালি হাতে যাবেন কোথায়? তাদের জন্য অন্তত প্রভিডেন্ট ফান্ড, বিমা, গ্র্যাচুইটিসহ অন্যান্য সুবিধা থাকা উচিত।

সরকারের উচিত, বেসরকারি চাকরিজীবীদের চাকরি ও ভবিষ্যৎ সুরক্ষার জন্য একটি নীতিমালা প্রণয়ন করা। যেখানে একটি নির্দিষ্ট সময় পর আবেদনের ভিত্তিতে কর্মরত সব কর্মকর্তা-কর্মচারী স্থায়ী হয়ে যাবেন। অবসরের আগে সামান্য ভুল-ত্রুটিতে কারও চাকরি চলে যাবে না। বরং কোনো অপরাধের কারণে বিধি অনুযায়ী শাস্তি প্রদান করা যেতে পারে। এছাড়া সরকারের পরিচালনায় একটি ফান্ড থাকবে, যেখানে মাসিক (স্থায়ী চাকরিজীবীদের পদ ও বেতন অনুযায়ী) বেতনের ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রদেয় একটি অংশ জমা হবে। এই ফান্ড সরকারের দেখভাল-সংক্রান্ত ব্যয়ভারও বহন করবে। আর অবসরকালীন সময়ে এখানে জমাকৃত অর্থের সঙ্গে লভ্যাংশের একটি অংশসহ সবাই পাবেন। তখন দেখা যাবে লাখ লাখ বেসরকারি চাকরিজীবী এ নীতিমালার আওতায় চলে আসবেন। সবাই নতুন করে হাঁপ ছেড়ে বাঁচবেন। সরকারিতে অনেকটা চাপ কমবে আর চাকরিতে প্রবেশে তখন বেসরকারি ক্ষেত্রও অনেকটাই জনপ্রিয় হয়ে উঠবে বলে বিশ্বাস করি।

প্রকৌশলী ও লেখক

[email protected]

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..