বিশ্ব সংবাদ

বৈরুতে বিস্ফোরণে নিহত শতাধিক দুই সপ্তাহের জরুরি অবস্থা জারি

শেয়ার বিজ ডেস্ক : লেবাননের রাজধানী বৈরুতে ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনায় মৃতের সংখ্যা বাড়ছেই। এরই মধ্যে মৃতের সংখ্যা ১০০ ছাড়িয়ে গেছে। আহত হয়েছে প্রায় চার হাজার মানুষ। মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিলাসবহুল হোটেল, আবাসিক ভবন সবকিছু পরিণত হয়েছে অচেনা ধ্বংসস্তূপে। আহতদের চিৎকার আর নিখোঁজের স্বজনদের দীর্ঘশ্বাসে ভারি হয়ে উঠছে আকাশ। গত মঙ্গলবারের জোড়া বিস্ফোরণের এ ধ্বংসলীলার মধ্যে শহরটিতে দুই সপ্তাহের জন্য রাষ্ট্রীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে। বৈরুতকে দুর্যোগকবলিত শহর বলে ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। খবর: বিবিসি ও রয়টার্স।

মঙ্গলবার সন্ধ্যায় রাজধানী বৈরুতের বন্দর এলাকায় জোড়া বিস্ফোরণ ঘটে। যেখানে বিস্ফোরণ ঘটেছে, সেখানে বিস্ফোরক পদার্থ সংরক্ষণের অনেক গুদাম রয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, বিস্ফোরক দ্রব্যের ওই গুদামেই ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে। লেবাননের প্রেসিডেন্ট মিশেল আউন বলেন, ছয় বছর ধরে একটি গুদামে ২ হাজার ৭৫০ টন অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট অনিরাপদভাবে মজুত রাখা হয়েছিল। এটা অগ্রহণযোগ্য।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছে, বিস্ফোরণে পুরো বৈরুত শহর ভূমিকম্পের মতো কেঁপে উঠেছিল। ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিওতে দেখা যায়, বৈরুতের বন্দর এলাকা থেকে বড় গম্বুজ আকারে ধোঁয়া উড়ছে, এর কিছুক্ষণের মধ্যে বিকট বিস্ফোরণে গাড়ি ও স্থাপনা উড়ে যেতে দেখা যায়।

বিস্ফোরণের পরপরই বৈরুত যেন এক ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। এদিকে-সেদিকে পড়ে আছে ভাঙা কাচ। ভবনগুলো আগুনে পুড়ে গেছে। বিস্ফোরণের মূল এলাকা থেকে ৪ কিলোমিটার দূরে থাকা ভবনগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। লেবাননে চরম গৃহযুদ্ধ চলার সময়ও এতটা ধ্বংসযজ্ঞ দেখা যায়নি।

চিকিৎসা নিতে আশপাশের হাসপাতালগুলোয় নেওয়া হয়েছে কয়েক হাজার আহতকে। বিস্ফোরণে হাসপাতালগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এমন অবস্থায় চিকিৎসা দিতে হিমশিম খাচ্ছে তারা। বিস্ফোরণস্থলের দুই কিলোমিটারেরও কম দূরত্বে অবস্থিত সেন্ট জর্জ হাসপাতাল। সেখানকার এক চিকিৎসক বলেন, ‘আহতদের হাসপাতালে নিয়ে আসছে মানুষ, তবে আমরা তাদের ভর্তি করাতে পারছি না। তাদের রাস্তার ওপরে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। হাসপাতাল ভবন ভেঙে গেছে। ধ্বংস হয়ে গেছে জরুরি বিভাগ।’

বিস্ফোরণে আহতদের চিকিৎসা দিতে শহরের বাইরে নেওয়া হচ্ছে। কারণ, আহতদের সামাল দিতে ব্যর্থ হচ্ছে বৈরুতের হাসপাতালগুলো। দেশের উত্তর ও দক্ষিণের এলাকা এবং পূর্বে অবস্থিত বেক্কা উপত্যকা কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে সহায়তা চেয়ে অ্যাম্বুলেন্স ডাকা হয়েছে। লেবাননের রেড ক্রসের প্রধান জর্জেস কেট্টানেহ সম্প্রচারমাধ্যম মায়াদিনকে বলেন, ‘আমরা যা দেখছি তা বড় ধরনের এক বিপর্যয়। চারদিকে হতাহতদের দেখা যাচ্ছে।’ আহতদের বাঁচাতে মানুষের কাছে জরুরি ভিত্তিতে রক্তদানের আহ্বান জানিয়েছে রেড ক্রস।

বিস্ফোরণের পরপরই বন্দর এলাকায় নিখোঁজদের সন্ধানে স্বজনদের ভিড় জমাতে দেখা গেছে। ভাইয়ের খোঁজে আসা এক তরুণী নিরাপত্তারক্ষীদের কাছে বারবার খোঁজ জানতে চাইছিলেন। ভাইকে চেনাতে তার শারীরিক গঠনের বর্ণনা দিচ্ছিলেন। বলছিলেন, ‘তার নাম জাদ। তার চোখগুলো সবুজ।’ তবে নিরাপত্তারক্ষীরা তাকে ভবনের ভেতরে প্রবেশ করতে দিচ্ছিলেন না। আর ওই নারী বারবার তাদের কাছে অনুরোধ জানাচ্ছিলেন ভেতরে যেতে দেওয়ার জন্য। পাশেই আরেক নারীকে দেখা যাচ্ছিল স্বজনের খোঁজে এসে তার অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার অবস্থা। তিনিও এসেছিলেন ভাইয়ের খোঁজে। তার ভাইও বন্দরেই কাজ করতেন।

ওই এলাকায় নিয়োজিত এক সেনা সদস্য বলেন, ‘ভেতরে খুব খারাপ অবস্থা। মাটিতে মানুষের মৃতদেহ পড়ে আছে। এখনও মৃতদেহ উদ্ধার করে সেগুলোকে অ্যাম্বুলেন্স ওঠানোর কাজ চলছে।’ বন্দর এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত ভবনগুলোর ধ্বংসস্তূপ সরানো শুরু হলে মৃতের সংখ্যা উল্লেখজনকহারে বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী হামাদ হাসান বলেন, ‘অনেক মানুষ নিখোঁজ রয়েছে। জরুরি বিভাগের কর্মীদের কাছে এসে লোকজন তাদের প্রিয়জনের সন্ধান চাইছে। রাতে অনুসন্ধান অভিযান চালানোটা কঠিন। কারণ সেখানে বিদ্যুৎ নেই।’

লেবাননের প্রেসিডেন্ট তিনদিনের শোক ঘোষণা করেছেন। তিনি জানান, জরুরি তহবিল হিসেবে তার সরকার ১০০ বিলিয়ন লিরা বা ৬ কোটি ৬০ লাখ ডলার সহায়তা দেবে।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..