সারা বাংলা

বৈশাখ রাঙাতে ব্যস্ত মাদারীপুরের মৃৎশিল্পীরা

মেহেদি হাসান শুভ, মাদারীপুর: পহেলা বৈশাখকে ঘিরে মাদারীপুরের বিভিন্ন স্থানে বৈশাখী মেলার আয়োজন করা হয়েছে। মেলার চাহিদা মেটাতে ও মাটির তৈরি জিনিসপত্র বিভিন্ন স্থানে বাজারজাত করতে পরিবারের সবাইকে নিয়ে দিনরাত ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন জেলার সাতটি গ্রামের পালপাড়ার মৃৎশিল্পীরা।
বাঙালি জাতির অন্যতম ঐতিহ্য মৃৎশিল্প। এই শিল্পের চাহিদা বছরের অন্যসব সময়ে না থাকলেও পহেলা বৈশাখে মাটির তৈরি জিনিসপত্র ছাড়া যে চলেই না। তাই অন্য সময়ের চেয়ে একটু বেশিই ব্যস্ত সময় পার করতে হচ্ছে মৃৎশল্পীদের। তারা মনের মাধুরী মিশিয়ে মাটির তৈরি খেলনার আকৃতি দিচ্ছেন। মৃৎশিল্পীরা জানান, বাসনকোসনের চেয়ে খেলনা সামগ্রীর চাহিদা অনেক বেশি। মেলা, ঈদ, পূজাসহ বিভিন্ন উৎসবে এসব পণ্য বেশি বিক্রি হয়।
পালপাড়াগুলো ঘুরে দেখা যায়, মৃৎশিল্পীরা তৈরি করছেন মাটির গাছ, পাখি, ফুল, ফুলের টব, ফলমূলসহ বিভিন্ন বাসনকোসন। কেউ মাটি গুঁড়া করে কাদা করছেন, কেউ মাটি দিয়ে বিভিন্ন ধরনের হাঁড়িপাতিল তৈরি করছেন, কেউবা বিভিন্ন পশুপাখির আকৃতি তৈরিতে ব্যস্ত। আবার কেউ মাটির তৈরি জিনিসপত্রে রং-তুলি দিয়ে হরেক রকমের নকশা করছেন। অনেকে তৈরি পণ্যগুলো রোদে শুকাচ্ছেন। এই কাজ দ্রুত শেষ করতে মৃৎশিল্পীদের ছেলেমেয়েরাও অংশ নিয়েছে।
মাদারীপুর সদর উপজেলার ঘটমাঝি ইউনিয়নের পালপাড়া গ্রাম, কালকিনি উপজেলার থানার মোড় এলাকার পালপাড়া গ্রাম, ডাসার থানার ঘোষেরহাট বাজার এলাকার পালপাড়া গ্রাম, শিবচর উপজেলার ভদ্রাসন ইউনিয়নের পালপাড়া ও নলগোড়া এলাকার পালপাড়া গ্রাম এবং রাজৈর উপজেলার বদরপাশা ও খালিয়া পালপাড়া গ্রামে শতাধিক পরিবার মৃৎশিল্পকে ধরে রেখেছে।
সদর উপজেলার ঘটমাঝি ইউনিয়নের পালপাড়ায় প্রায় ৪০টি পরিবার বসবাস করে। তাদের অনেকেই এই পেশা ছেড়ে দিয়েছেন। এর মধ্যে মাত্র ১০টি ঘরে ঐতিহ্যকে আঁকড়ে ধরে আছেন এখনও। এই গ্রামের প্রবীণ মৃৎশিল্পী বিশ্বজিৎ পাল জানান, তিনি ছোটবেলা থেকে মাটির তৈরি তৈজসপত্রের কাজ করতেন। এখন তেমন একটা করেন না। জীবিকার জন্য কৃষিকাজ করেন। বৈশাখ এলে মেলায় কিছু মাঠির জিনিস বিক্রি হয়, তাই মাটির খেলনা বানাচ্ছেন।
মিনারা রানি নামে আরেক মৃৎশিল্পী জানান, আগে মাটি কিনে আনতে হতো না। এখন মাটি কিনে আনতে হয়। মাটিরও অনেক দাম। সারা দিন বাড়ির সব কাজ করার পাশাপাশি কিছু মাটির পাত্র বানান, তাতে ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার খরচ হয়।
কালকিনি উপজেলার থানার মোড় এলাকার পালপাড়া গ্রামের মৃৎশিল্পী রানী পাল জানান, প্রতিবারের মতো তিনি এবারও বৈশাখী মেলার জন্য হরিণ, গরু, ঘোড়া, হাতি, খরগোশ, উটপাখি, হাঁস, বক, টিয়া, গণ্ডারসহ নানা ধরনের প্রাণীর আকৃতি তৈরি করেছেন। এখন এসব শুকাতে দিয়েছেন। দু-এক দিনের মধ্যে সব তৈরি হয়ে যাবে।
এই গ্রামের প্রবীণ মৃৎশিল্পী সুশীল কুমার পাল জানান, ৫০ বছর ধরে মাটির এসব জিনিস তৈরি করছেন। বৈশাখ এলে কাজের চাপ বেড়ে যায়। এছাড়া বছরের বাকি দিনগুলো অনেক কষ্টে পার করতে হয়। তাই অনেকে এই পেশা এখন ছেড়ে দিয়েছে।
জেলা প্রশাসক ওয়াহিদুল ইসলাম জানান, জেলায় পাল সম্প্রদায়ের বেশ কিছু পরিবার মাটির সামগ্রী তৈরি করে, যা আমাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রকাশ। সরকার এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। তাদের কাজ করতে অর্থের প্রয়োজন হলে তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণের ব্যাবস্থা করা হবে। তাদের সামাজিক কোনো সমস্যা হলে তাদের সেদিক থেকেও সহযোগিতা করা হবে।

সর্বশেষ..