এফ আই মাসউদ : যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সমন্বিত সামরিক হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি, পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান গোলামরেজা রেজাইয়ান, সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান রহিম মুসাভি এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী আজিজ নাসিরজাদেহ নিহত হয়েছেন-এমন খবরে মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। হামলার পরপরই তেহরান ইসরায়েলের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিতে ড্রোন হামলা চালিয়েছে। পাল্টা হামলার জবাবে ইসরায়েলও পাল্টা প্রতিশোধের হুঁশিয়ারি দিয়েছে। ফলে সীমিত হামলা-পাল্টা হামলা যেকোনো সময় পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে রূপ নিতে পারে- এমন আশঙ্কা উড়িয়ে দিচ্ছেন না বিশ্লেষকেরা।
এদিকে তেল পরিবহনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছে ইরান। ইউরোপীয় ইউনিয়নের নেভাল মিশন এসপাইডেসের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস জানিয়ে দিয়েছে, ‘হরমুজ দিয়ে কোনো জাহাজ চলাচল করতে দেওয়া হবে না।’ তেল রপ্তানির জন্য বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রুট হলো হরমুজ প্রণালি। এটি উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর সবচেয়ে বড় তেল উৎপাদনকারীদের জন্য তেল রপ্তানির পথ। এখান দিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় তেল পাঠায় সৌদি আরব, ইরান, ইরাক ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। সরু এ সামুদ্রিক পথটি ওমান উপসাগর ও আরব সাগরকে যুক্ত করেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এ কর্মকর্তা বলেছে, ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে হরমুজ প্রণালি বন্ধের ব্যাপারে কোনো নির্দেশ দেয়নি। ইরান দীর্ঘ সময় ধরে বলে আসছে, যদি তাদের ওপর কোনো ধরনের হামলা হয় তাহলে তারা হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেবে।
হামলার পর আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়তে শুরু করেছে। গতকাল রোববার সকালে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৭৩ ডলারে দাঁড়ায়। চলতি বছরে এ পর্যন্ত দাম প্রায় ২০ শতাংশ বেড়েছে। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি যেখানে দাম ছিল ৬১ ডলার, তা এখন ৬৭ থেকে ৭৩ ডলারের মধ্যে ওঠানামা করছে। গত শুক্রবার একদিনেই দাম দুই শতাংশের বেশি বেড়েছে।
বাণিজ্যিক সূত্র জানিয়েছে, হামলার পর কয়েকটি বড় তেল কোম্পানি ও শীর্ষ ট্রেডিং হাউস হরমুজ হয়ে তেল পরিবহন সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে। ঝুঁকি প্রিমিয়াম ও বীমা ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় জাহাজভাড়াও বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাজার বিশ্লেষকেরা বলছেন, সংঘাত সীমিত থাকলে ব্রেন্টের দাম ৮০ ডলার পর্যন্ত যেতে পারে। তবে সরবরাহ দীর্ঘ মেয়াদে ব্যাহত হলে ১০০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছানোও অসম্ভব নয়। তেলের দাম বাড়লে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতিতে শূন্য দশমিক ৬ থেকে শূন্য দশমিক ৭ শতাংশীয় পয়েন্ট পর্যন্ত প্রভাব পড়তে পারে বলে অর্থনীতিবিদেরা আশঙ্কা করছেন।
ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার প্রভাবে আর্থিক বাজারেও অস্থিরতা বাড়ছে। ভিআইএক্স ভোলাটিলিটি সূচক এ বছর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বন্ডবাজারের অস্থিরতার সূচকও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, সংঘাত দীর্ঘ হলে মার্কিন ডলার শক্তিশালী হতে পারে, কারণ বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ সম্পদে ঝুঁকতে পারেন। তবে জাপানি ইয়েন ও সুইস ফ্রাঁ ঐতিহ্যগতভাবে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে কিছুটা সুবিধা পেতে পারে।
ইসরায়েলের মুদ্রা শেকেলও চাপের মুখে পড়তে পারে। অতীতে ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনার সময় শেকেল সাময়িকভাবে দুর্বল হলেও দ্রুত ঘুরে দাঁড়িয়েছে। তবে দীর্ঘ মেয়াদি সংঘাত হলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে বলে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ব্যাংকগুলো সতর্ক করেছে।
দেশ সরাসরি এই সংঘাতে জড়িত না হলেও জ্বালানি আমদানিনির্ভরতার কারণে বড় ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ প্রাথমিক জ্বালানি আমদানি করা হয়। অপরিশোধিত তেল, পরিশোধিত জ্বালানি ও এলএনজির বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসে এবং অধিকাংশ চালান হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়।
বর্তমানে দেশে তীব্র গ্যাস সংকট চলছে। গত ২৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশে দৈনিক গ্যাস উৎপাদন ছিল ১ হাজার ৭১৪ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি)। আমদানির মাধ্যমে অতিরিক্ত ৮৫০ থেকে এক হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছিল। তবুও শিল্প, বিদ্যুৎ ও আবাসিক খাতে চাহিদা পূরণ সম্ভব হচ্ছে না। এ অবস্থায় এলএনজি আমদানিতে বিঘ্ন ঘটলে বিদ্যমান সংকট তীব্রতর হবে।
জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, ঝুঁকি দুই ধরনের-মূল্যঝুঁকি ও সরবরাহঝুঁকি। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) ও এলএনজি আমদানিকারকদের ব্যয় বাড়বে। এতে সরকারের ভর্তুকির চাপ বাড়তে পারে। অন্যদিকে জাহাজ চলাচলে বিলম্ব হলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানি ঘাটতি তৈরি হতে পারে, যা শিল্পোৎপাদন ও রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ইরানের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য খুবই সীমিতÑবার্ষিক এক কোটি ডলারের কিছু বেশি। বিদায়ী ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ১ কোটি ৯ লাখ ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে, যার বড় অংশ পাটের সুতা। ইরান থেকে আমদানি হয়েছে মাত্র পাঁচ লাখ ডলারের পণ্য।
তবে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর মতে, সরাসরি বাণিজ্য কম হলেও পরিবহন ব্যয় ও জ্বালানি দামের ঊর্ধ্বগতির কারণে রপ্তানি খাত বড় চাপে পড়তে পারে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতে ইউরোপমুখী জাহাজ চলাচল দীর্ঘ পথ ঘুরে যেতে বাধ্য হলে সময় ও খরচ দুই-ই বাড়বে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রেজানুর রহমান জানিয়েছেন, জুন পর্যন্ত জ্বালানি তেল সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়েছে। কিছু চালান চীন, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও ইন্দোনেশিয়া থেকে আসবে, যা হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করবে না। ফলে স্বল্প মেয়াদে বড় ধরনের ঝুঁকি নেই বলে তিনি মনে করেন। তবে দীর্ঘমেয়াদি সংকট হলে বৈশ্বিক বাজারের প্রভাব এড়ানো কঠিন হবে।
এদিকে মার্চ মাসে দেশে জ্বালানি তেলের দাম অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। প্রতি লিটার ডিজেল ১০০ টাকা, কেরোসিন ১১২ টাকা, পেট্রল ১১৬ টাকা এবং অকটেন ১২০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকার ২০২৪ সালের মার্চ থেকে বিশ্ববাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি চালু করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সংঘাত যদি দ্রুত কূটনৈতিক পথে নিয়ন্ত্রণে আনা না যায়, তবে হরমুজ প্রণালি ঘিরে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধাক্কা দেবে। উন্নয়নশীল ও আমদানিনির্ভর দেশগুলো সবচেয়ে বেশি চাপে পড়বে। বাংলাদেশের জন্য বিকল্প সরবরাহ উৎস খোঁজা, দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি জোরদার এবং কৌশলগত জ্বালানি মজুত বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।
মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, তা নির্ভর করছে আগামী কয়েক দিনের ঘটনাপ্রবাহের ওপর। তবে স্পষ্ট, হরমুজ প্রণালিতে সামান্য বিঘ্নও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে, আর তার ঢেউ থেকে বাংলাদেশও পুরোপুরি নিরাপদ নয়।
প্রিন্ট করুন










Discussion about this post