প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

বৈশ্বিক বৈষম্য হ্রাসে জি২০-কে এখনই উদ্যোগী হতে হবে

 

হেলে থর্নিং স্মিট: প্রায় এক দশক আগে বিশ্ব অর্থনীতি মন্দার ঝুঁকি ও বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছিল। বিশ্ব অর্থনীতিতে আস্থা ফিরিয়ে আনতে নতুন ধরনের নেতৃত্ব তখন একদম অপরিহার্য হয়ে পড়েছিল। ঠিক এ কারণে ২০০৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা তার প্রথম বৈশ্বিক সম্মেলনে জি২০-কে সবচেয়ে কার্যকর অর্থনৈতিক ফোরাম হিসেবে এগিয়ে নিতে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী গর্ডন ব্রাউনের সঙ্গে একাত্ম হন। তাদের প্রচেষ্টায় গঠিত এ ফোরামটি তখনকার একটি বড় সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান এনে দিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু একই সঙ্গে আরেকটি বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার পথও রুদ্ধ করে দিয়েছিল।

বিশ্বের ১৯টি বৃহৎ অগ্রসর অর্থনীতির দেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন সহযোগে গঠিত হয় গ্রুপ টোয়েন্টি (জি২০)। এর আগে সাতটি উন্নত দেশের (কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, জাপান, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র) সমন্বয়ে গঠিত জি৭ গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক সমস্যা নিয়ে কাজ করতো। ওবামা-ব্রাউন ঐক্যের পর জি২০ সেসব দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেয়। ওবামা ও ব্রাউন ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছিলেন, চীন ও ভারতের মতো ক্রমবর্ধিষ্ণু শক্তিশালী অর্থনীতিকে বাদ দিয়ে কোনো বহুজাতিক সংগঠনই বিশ্ব অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার কার্যকর সমাধান খুঁজে পাবে না।

অন্যান্য বহুজাতিক সংগঠনের মতো জি২০-ও ভুলত্রুটির ঊর্ধ্বে নয়। তবু স্বীকার করতে হবে, সবচেয়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক এ বহুজাতিক সংগঠনটি ২০০৮-পরবর্তী অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় ভূমিকা রেখেছে। জোটের মধ্যে বড় অর্থনীতির দেশগুলোর অন্তর্ভুক্তি বাড়ানোর ফলে অস্থিতিশীল বৈশ্বিক বাজারে অনেকটা স্বস্তি ফিরে আসে। জি-২০ সে সময়ে একটি স্থিতিশীল অর্থনীতির গতিপ্রবাহ অব্যাহত রাখতে বড় ভূমিকা রেখেছিল।এক্ষেত্রে চীনের নেতৃত্ব বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। দেশটি সে সময়ে বৈশ্বিক অর্থনীতির অবনমনের পথ রুদ্ধ করেছিল।

এখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বৈষম্য মোকাবিলা। এবার জার্মানির হামবুর্গে অনুষ্ঠেয় জি২০-র বার্ষিক সম্মেলনকে এ চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে। বিশ্বের এক শতাংশ ধনীর হাতে কুক্ষিগত হয়ে আছে ৪০ শতাংশ সম্পদ। প্রবৃদ্ধির সুফলও বণ্টন করা হচ্ছে এমন এক উপায়ে, যা অর্থনৈতিকভাবে কার্যকর বা রাজনৈতিকভাবে স্থিতিশীল নয়। এ সংকট এক দিনে তৈরি হয়নি, বছরের পর বছর ধরে এ ধারা চলে আসছে। তবে সমস্যার গতি ত্বরান্বিত হয়েছে বৈশ্বিক মন্দার পরই। পরিস্থিতি সামলে উঠতে জি২০ তখন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এতে একদিকে উন্নত দেশের নির্বাচকমণ্ডলীর চোখ খুলে গেছে। তারা প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে, ক্ষমতা ধরে রাখতে চাইলে নেতাদের বিরোধ মিটিয়ে সমাধানের পথে আসতে হবে। অন্যদিকে দরিদ্র দেশ থেকে লাখ লাখ দেশান্তরি মানুষ জীবিকা ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার খোঁজে ঝুঁকি নিয়ে সাগর ও মরুভূমি পাড়ি দিচ্ছে।

এ অবস্থায় জি২০-র মূল দায়িত্ব হলো বিশ্বব্যাপী বৈষম্য হ্রাসকল্পে কাজ করা। ঠিক যেভাবে ২০০৮-০৯ সময়ের মহামন্দার সময়ে সংগঠনটি গুরুত্বের সঙ্গে সমাধানমুখী পদক্ষেপ নিয়েছিল। তখন ওবামা ও ব্রাউন যেমন বলিষ্ঠ নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, একইভাবে জার্মানির চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মেরকেলকেও ধনী ও দরিদ্রের মধ্যবর্তী ক্রমবর্ধমান দূরত্ব হ্রাসে এবং সামাজিক সংহতি ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জনে শক্তিশালী নেতৃত্ব দিতে হবে। ধনী ও দরিদ্রের মধ্যবর্তী ক্রমবর্ধমান দূরত্বই বিশ্ব অর্থনীতির জন্য বড় সমস্যা। এ সমস্যা মোকাবিলায় জার্মানির নেতৃত্বে বৈশ্বিক বৈষম্য সংকট মোকাবিলায় জি২০-কে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিতে হবে, যার মধ্যে তিনটি বিষয়ে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে।

প্রথমত, জি২০-কে জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের ব্যাপারে আন্তরিক ও প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হতে হবে এবং এ লক্ষ্যে কর্মকাণ্ডের গতি বৃদ্ধি করতে হবে। দারিদ্র্য বিমোচন, বৈষম্য নিরসন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য উন্নয়ন ও পরিবেশ রক্ষায় এসজিডি এক সাহসী ও অর্জনযোগ্য কর্মসূচি প্রণয়ন করেছে। কিন্তু দুবছর পার হয়ে গেলেও এখনও বেশিরভাগ দেশই এসডিজি অর্জনের ব্যাপারে গুরুত্ব দিচ্ছে না। জবাবদিহি বলতেও তথ্য সংগ্রহ ছাড়া কাজের কাজ কিছু হচ্ছে না। বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল ও সম্পদশালী দেশগুলোর সমন্বয়ে গঠিত জি২০-কে এসডিজি বাস্তবায়নের দায়িত্ব নিতে হবে। এ লক্ষ্যে এসডিজিকে জাতীয় নীতির অন্তর্ভুক্ত করতে হবে এবং সে অনুযায়ী সরকারি বাজেট প্রণয়ন ও বেসরকারি খাত নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, জি২০-কে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর কর্মকাণ্ড ও সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে, মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। গবেষণায় দেখা গেছে, বড় করপোরেশন ও ধনাঢ্য ব্যক্তিরা কর ফাঁকির কারণে প্রতিবছর দরিদ্র দেশগুলোয় ২০ হাজার কোটি ডলার খরচ হয়। অনেক ব্যবসায়ী নেতারা অবশেষে বুঝতে পেরেছেন যে তাদের ব্যবসার সফলতা ও বিশ্ব অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করে দারিদ্র্য নিরসনের ওপর। আর সময়ের সঙ্গে বৈষম্য যতই বাড়ছে, দারিদ্র্য নিরসন ততই কঠিন হয়ে পড়ছে। তাই এ বিরাট সমস্যা মোকাবিলা করতে ব্যবসায়ী সমাজকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে।

তৃতীয়ত, জি২০-কে ২০৩০ সালের মধ্যে সব শিশুর জন্য মানসম্মত শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। অসাম্য ও বৈষম্য মোকাবিলায় এটি হতে পারে একটি মোক্ষম অস্ত্র। যেমন, দরিদ্র দেশগুলোর প্রতিটি শিশুকে শিক্ষার সুযোগ দিতে পারলে ১৭ কোটি মানুষ দারিদ্র্য মুক্তি পাবে, যা বিশ্বের মোট দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ১২ শতাংশ।

শিক্ষার মান যে পর্যায়ে রয়েছে তা থেকে উত্তরণের জন্য এ খাতে ব্যয় ব্যাপক হারে বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বর্তমানে চলমান প্রকল্পগুলোতেও অর্থ বরাদ্দ বাড়াতে হবে। প্রাকৃতিক দুর্যোগকালে বা প্রত্যন্ত ও দরিদ্র অঞ্চলের শিশুরা যেন শিক্ষা থেকে বঞ্চিত না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষার অর্থায়নের জন্য আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। এতে সরকারি ও ব্যক্তিগত দাতাগোষ্ঠী শিক্ষার অর্থায়নে একত্রে কাজ করতে পারবে।

ডেনমার্কের সাবেক প্রধানমন্ত্রী

প্রজেক্ট সিন্ডিকেট থেকে ভাষান্তর

শামসুন নাহার রাখী