হাসান শিরাজি : বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের অস্থিরতার আঁচ লেগেছে আমাদের দেশের অর্থনীতিতেও। চলমান এই জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় দেশজুড়ে যখন নানা আলোচনা, ঠিক তখনই ব্যক্তিগত বা অফিশিয়াল গাড়ির আরাম ছেড়ে গণপরিবহন ব্যবহারের এক ইতিবাচক ও অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত তৈরি করছে দেশের কয়েকটি শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান। এই উদ্যোগগুলো কেবল জ্বালানি সাশ্রয়ই করছে না, বরং নিম্নআয়ের সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন দুর্ভোগ কমাতেও বড় ভূমিকা রাখছে।
জ্বালানি ব্যবহারে সাশ্রয়ী হতে নিজ নিজ জায়গা থেকে এগিয়ে এসেছে বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে সবচেয়ে প্রশংসনীয় ও সাহসী উদ্যোগটি নিয়েছে পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ)। জ্বালানি ব্যবহারে ৫০ শতাংশ সাশ্রয়ের একটি বিশাল লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে তারা।
গত রোববার গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে পিকেএসএফ জানায়, প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ সব প্রাধিকারভুক্ত কর্মকর্তা এখন থেকে অফিসের গাড়ির পরিবর্তে গণপরিবহন ব্যবহার করবেন। ঢাকা এবং ঢাকার বাইরের সব দাপ্তরিক কাজের জন্যই এই নিয়ম প্রযোজ্য হবে। শুধু যাতায়াতেই নয়, বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের লক্ষ্যে অফিস ভবনে এসি বা শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের ব্যবহারও সীমিত করেছে প্রতিষ্ঠানটি। শীর্ষ কর্মকর্তাদের এমন সাধারণ জীবনযাপন ও ত্যাগের মানসিকতা নিঃসন্দেহে একটি বড় বার্তা দেয়।
পিকেএসএফের পাশাপাশি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনও (ডিএসসিসি) সময়োপযোগী পদক্ষেপ নিয়েছে। তারা তাদের কর্মকর্তাদের পরিবহন ব্যয় এক ধাক্কায় ৩০ শতাংশ কমানোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে, যা জাতীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
সরকারি ও বড় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা যদি ব্যক্তিগত বা অফিশিয়াল গাড়ির ব্যবহার কমিয়ে দেন, তবে এর সরাসরি সুফল পায় সাধারণ মানুষ। প্রথমত, রাস্তায় গাড়ির চাপ কমে গিয়ে যানজট হ্রাস পায়। দ্বিতীয়ত, গণপরিবহনের জন্য জ্বালানি পাওয়া অনেক সহজ ও সাবলীল হয়। এর ফলে নিম্নআয়ের মানুষ, যাদের যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম বাস বা অন্যান্য লোকাল পরিবহন, তাদের দৈনন্দিন দুর্ভোগ অনেকটাই লাঘব হয়।
অর্থনীতিবিদ ও বিশিষ্টজনেরা মনে করেন, বিচ্ছিন্নভাবে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের এই উদ্যোগ অত্যন্ত সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য, তবে সংকট পুরোপুরি মোকাবিলায় এটিকে একটি জাতীয় রূপ দেওয়া প্রয়োজন। তাদের মতে, সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে যদি সব সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য ব্যক্তিগত বা অফিশিয়াল গাড়ির পরিবর্তে গণপরিবহন ব্যবহারের একটি সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়, তবে দেশ এই ভয়াবহ সংকট মোকাবিলায় অনেকটাই সফল হবে।
সংকট আসে, তবে সেইসঙ্গে আসে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ। পিকেএসএফ বা ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন যে পথ দেখিয়েছে, তা যদি দেশের অন্যান্য সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো অনুসরণ করে, তবে জ্বালানি সংকট আর কোনো আতঙ্কের বিষয় থাকবে না। শীর্ষ কর্মকর্তাদের এই সামান্য ত্যাগ সাধারণ মানুষের মনে যেমন স্বস্তি আনবে, তেমনি দেশের অর্থনীতিকেও করবে সুরক্ষিত। সবার সম্মিলিত ও দায়িত্বশীল আচরণের মাধ্যমেই আমরা একটি টেকসই ও সাশ্রয়ী আগামীর দিকে এগিয়ে যেতে পারি।
প্রিন্ট করুন











Discussion about this post