প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

ব্যক্তি বিনিয়োগ গুরুত্ব পাচ্ছে নতুন মুদ্রানীতিতে

শওকত আলী: স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশেও মন্দা রয়েছে ব্যক্তি বিনিয়োগে। নিয়মিত সুদহার কমলেও গতি আসছে না নতুন বিনিয়োগে। আর দেশের বিনিয়োগ না বাড়লে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন হয়ে পড়বে দুরূহ। যে কারণে এবারের মুদ্রানীতিতে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হতে পারে ব্যক্তি-বিনিয়োগ বাড়ানোর নতুন কৌশলে।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, সবকিছু ঠিক থাকলে ২৪ জানুয়ারি ঘোষণা করা হবে চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধের (জানুয়ারি-জুন) মুদ্রানীতি। গভর্নর ফজলে কবির এ মুদ্রানীতি ঘোষণা করবেন।

জানা গেছে, দেশে স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশে ব্যবসায়ীদের দাবি অনুযায়ী ঋণের সুদহার কমছে ধারাবাহিকভাবে। রাজস্ব আদায় বাড়া ও অস্বাভাবিক গতিতে সঞ্চয়পত্র বিক্রি বাড়ায় ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার পরিমাণ কমে গেছে। এতে করে সহজ হয়েছে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রাপ্তি। এত কিছুর পরও ব্যাংক ঋণে চাহিদা কম উদ্যোক্তাদের। বিনিয়োগে ভাটার কারণেই এমন অবস্থার তৈরি হয়েছে। যে কারণে ব্যাংকগুলোর কাছে প্রায় এক লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকার অলস তারল্য জমে রয়েছে।

বিনিয়োগ পরিস্থিতি চাঙা করতে না পারলে চলতি অর্থবছরে সরকার লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী প্রবৃদ্ধির সাত দশমিক দুই শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন দুরূহ হয়ে পড়বে বলে মনে করা হচ্ছে। আর এ পরিস্থিতি অনুযায়ী নতুন মুদ্রানীতি প্রণয়নের কাজ শুরু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। যেখানে স্থিতিশীল পরিস্থিতিতে কীভাবে বিনিয়োগে গতি ফেরানো যায়, সে বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়েই মুদ্রানীতি প্রণয়নের কাজ চলছে বলে জানা গেছে।

এবারের মুদ্রানীতি কেমন হওয়া উচিত জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ শেয়ার বিজকে বলেন, ‘মূল্যস্ফীতি যেহেতু নিচের দিকে রয়েছে, সেহেতু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচিত হবে সম্প্রসারণমূলক মুদ্রানীতি প্রণয়ন করা। এতে করে মূল্যস্ফীতি কিছুটা বাড়লেও ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে মানুষের। এতে করে বিনিয়োগও উৎসাহিত হবে। যেটা এ মুহূর্তে খুবই দরকার। এটি সরকারের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সহজ করে তুলবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, নতুন মুদ্রানীতি প্রণয়নের আগে এবারও ব্যাংকার, অর্থনীতিবিদ, সাবেক গভর্নর, ব্যবসায়ী ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের (স্টেকহোল্ডার) মতামত নেওয়া হচ্ছে। আগামী রোববার সন্ধ্যায় রাজধানীর লেকশোর হোটেলে স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হবে। ওই সভার মতামতের ভিত্তিতে আগামী মঙ্গলবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে বৈঠক হবে। এর আলোকে নতুন মুদ্রানীতির ধরন ও হাতিয়ারগুলো ঠিক করা হবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মূল্যস্ফীতি নিম্নমুখী থাকায় নতুন মুদ্রানীতিতে বিনিয়োগ উৎসাহিত করার কৌশল থাকবে। বেসরকারি ঋণের প্রবাহ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে। যাতে সরকার প্রক্ষেপিত হারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করা যায়। দেশের অর্থনীতিবিদরাও নতুন মুদ্রানীতিতে আগের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার পরামর্শ দেন। তারা বলছেন, বর্তমানে দেশে রাজনৈতিক পরিবেশ বিরাজ করলেও বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা পুরোপুরি কেটে গেছে তা নয়। অবকাঠামো ও গ্যাস পরিস্থিতির খুব একটা উন্নতি হয়নি। ফলে ঋণের সুদহার কমলেও নতুন প্রকল্পে বিনিয়োগের জন্য ঋণের চাহিদা করছেন না উদ্যোক্তারা। ফলে ব্যাংকিং খাতে উদ্বৃত্ত তারল্যের সমস্যা কাটছে না। তাই নতুন মুদ্রানীতিতে বিনিয়োগ আকর্ষণে ঋণের প্রবাহ বাড়ানোর ওপর জোর দিতে হবে। একই সঙ্গে বিনিয়োগ যাতে ঝুঁকিপূর্ণ খাতে না যায়, সেদিকেও সতর্কতা থাকতে হবে নতুন মুদ্রানীতিতে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, নতুন মুদ্রানীতিতে আগের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা দরকার। এতে ব্যক্তি বিনিয়োগ উৎসাহিত হবে। দেশে সার্বিকভাবে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশের অভাব রয়েছে। ফলে বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা কম রয়েছে। তাই বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণে ঋণপ্রবাহ বাড়াতে হবে এবং ঋণের সুদহার কমাতে হবে।

চলতি অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে সাত দশমিক দুই শতাংশ। জাতীয় প্রবৃদ্ধির এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। আর বেসরকারি বিনিয়োগ তখনই বাড়বে যদি বেসরকারি উদ্যোক্তাদের মধ্যে প্রয়োজনীয় ব্যাংক ঋণের চাহিদা তৈরি হয়। কিন্তু নানা কারণে বেসরকারি খাতে ঋণ চাহিদা কম রয়েছে। এ কারণে বেড়ে গেছে অলস অর্থের পরিমাণ। অন্যদিকে, মুদ্রানীতির অন্যমত কাজ হলো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা। চলতি অর্থবছরের বাজেটে মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে পাঁচ দশমিক আট শতাংশ। বিবিএসের তথ্যানুযায়ী, ডিসেম্বরে দেশে পয়েন্ট টু পয়েন্ট মূল্যস্ফীতির হার দাঁড়িয়েছে পাঁচ দশমিক শূন্য তিন শতাংশ, যা গত সাড়ে চার বছরের মধ্যে সর্বনি¤œ পর্যায়ে রয়েছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতি প্রণয়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা শেয়ার বিজকে বলেন, ‘মূলত দুটি বিষয়কে প্রাধান্য দিয়ে মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হয়। একটি হলোÑবাজারে দ্রব্যমূল্য ঠিক রাখতে মুদ্রার পরিমিত সরবরাহ করা। দ্বিতীয়ত, সরকার প্রক্ষেপিত হারে প্রবৃদ্ধি অর্জনে নজর দেওয়া।

তিনি বলেন, বর্তমানে দ্রব্যমূল্যে স্বস্তি থাকায় মূল্যস্ফীতি অনেকটাই নি¤œমুখী রয়েছে। ফলে নতুন মুদ্রানীতিতে ব্যক্তি বিনিয়োগ বাড়ানোর কৌশল নেওয়া হবে। যাতে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনে করা যায়। ব্যক্তি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ার প্রচেষ্টা নতুন বিনিয়োগ বাড়াতে সহায়তা করবে। এতে ব্যাংকের অলস অর্থও কমে আসবে।

আগের ধারাবাহিকতা থেকে বেরিয়ে চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধের (জুলাই থেকে ডিসেম্বর) জন্য কিছুটা সম্প্রসারণমুখী মুদ্রানীতি (চলতি মুদ্রানীতি) ঘোষণা করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এতে বিনিয়োগ উৎসাহিতে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ১৬ দশমিক ৬০ শতাংশ বাড়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়। আর চলতি বছরের জুন পর্যন্ত এ পরিকল্পনা সাড়ে ১৬ শতাংশের মধ্যে রাখার প্রক্ষেপণ করা হয়েছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা যায়, আগের বছরের নভেম্বর থেকে চলতি বছরের নভেম্বর পর্যন্ত বেসরকারি খাতে ঋণের জোগান বেড়েছে ১৫ দশমিক এক শতাংশ। এ হিসাবে ডিসেম্বর পর্যন্ত লক্ষ্যমাত্রার নিচেই রয়েছে বেসরকারি খাতে ঋণের জোগান। তাই নয়া মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতের ঋণের জোগান ১৬ থেকে ১৭ শতাংশের মধ্যে ধরা হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতি বিভাগের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা। তবে বেসরকারি খাতে ঋণের জোগান বাড়ার কৌশল নেওয়ার পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সতর্ক অবস্থানে থাকবে বাংলাদেশ ব্যাংক। বিশেষ করে ঋণপ্রবাহ যাতে অনুৎপাদশীল ও ঝুঁকিপূর্ণ খাতে ব্যবহার না হয়, সে জন্য নিবিড় তদারকি করার ওপর জোর দেওয়া হবে।

এদিকে, সরকারের ব্যাংক ঋণের চাহিদা কম থাকায় চলতি মুদ্রানীতিতে ডিসেম্বর পর্যন্ত সরকারি খাতে ঋণের জোগান ধরা হয় ১১ দশমিক ৯০ শতাংশ। চলতি বছরের জুন পর্যন্ত তা বেড়ে ১৫ দশমিক ৯০ শতাংশে উন্নীতের আশা করা হয়। কিন্তু ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের নেওয়া ঋণাত্মক ধারায় রয়েছে। বাজেটে চলতি অর্থবছরে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে ৪৩ হাজার কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংক মনে করছে, জুন পর্যন্ত সরকারের ব্যাংকঋণ লক্ষ্যমাত্রার অনেক কম থাকবে। তাই বেসরকারি খাতে চাহিদানুযায়ী ঋণপ্রবাহ বাড়ানো ব্যাংকগুলোর পক্ষে কোনো সমস্যাই হবে না। এছাড়া নতুন মুদ্রানীতিতে ডিসেম্বর পর্যন্ত রিজার্ভ ও ব্যাপক মুদ্রার লক্ষ্য ধরা হয় ১১ শতাংশ ও ১৪ দশমিক ৮০ শতাংশ। কিন্তু নভেম্বর পর্যন্ত রিজার্ভ মুদ্রার লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করলেও ব্যাপক মুদ্রার সরবরাহ লক্ষ্যমাত্রার মধ্যেই রয়েছে। তবে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত মুদ্রানীতিতে এ লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা আছে ১৪ শতাংশ ও ১৫ দশমিক ৫০ শতাংশ।