Print Date & Time : 3 July 2022 Sunday 6:45 pm

ব্যবসায় প্রধান বাধা দুর্নীতি অদক্ষ আমলাতন্ত্র ও ঋণ স্বল্পতা

নিজস্ব প্রতিবেদক: কভিডের অভিঘাতের পর ব্যবসা-বাণিজ্য পুনরুদ্ধার হতে শুরু করেছে। তবে এ পুনরুদ্ধার হচ্ছে অসমগতিতে। আর পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে তিনটি বিষয় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। এগুলো হলো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্নীতি, আমলাতন্ত্রের অদক্ষতা ও ব্যবসায়ীদের ঋণপ্রাপ্তিতে অপর্যাপ্ততা। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও নাগরিক সংগঠন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) এক গবেষণা প্রতিবেদনে এমনটি জানিয়েছে। এ গবেষণার জরিপে অংশ নেয়া ৬৮ শতাংশ উদ্যোক্তা ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে দুর্নীতিতে প্রধান প্রতিবন্ধকতা হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

রাজধানীর ধানমন্ডিতে সিপিডির নিজস্ব কার্যালয়ে গতকাল ‘বাংলাদেশ ব্যবসায় পরিবেশ-২০২১: উদ্যোক্তা জরিপের ফলাফল’ শীর্ষক এ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। সংবাদ সম্মেলনে জরিপের মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম।

সিপিডি গত বছরের এপ্রিল, জুন ও জুলাই এ তিন মাসে ঢাকা, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও ফরিদপুরের ৭৩টি প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তিদের ওপর এ জরিপ পরিচালনা করে। এর মধ্যে ৩৯টি বড়, ১৭টি মাঝারি, ১২টি ছোট এবং পাঁচটি ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠান ছিল। জরিপে অংশ নেয়া ৬৭ শতাংশ ব্যবসায়ীরা মনে করেন, অদক্ষ আমলাতন্ত্র ব্যবসার জন্য আরেকটি প্রতিবন্ধকতা। এছাড়া ৫৫ শতাংশ মনে করেন, অর্থায়নের সীমাবদ্ধতাও আরেকটি বড় সমস্যা ব্যবসার জন্য।

অনুষ্ঠানে গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের সিদ্ধান্ত মোতাবেক এ বছর বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা প্রতিবেদন প্রকাশিত হচ্ছে না। তাই আমরা এ পরিপ্রেক্ষিতে ‘বাংলাদেশ ব্যবসায় পরিবেশ ২০২১: উদ্যোক্তা জরিপের ফলাফল’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি প্রকাশ করছি। আমরা মূলত সব খাতকে এ জরিপের আওতায় এনেছি। জরিপে অধিকাংশ ব্যবসায়ীরা বলছেন, তাদের দুর্নীতি বড় প্রতিবন্ধকতা। আমরা তাদের মতামত বিশ্লেষণ করে দেখলাম, এ দুর্নীতির কারণে সব থেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ছোট ব্যবসায়ীরা, বড়রা কম ক্ষতিগ্রস্ত। তিনি আরও বলেন, আমরা দেখছি অর্থনীতির পুনরুদ্ধার হচ্ছে। তবে তা অসমগতিতে এগোচ্ছে। অনেক ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ী এখনও তাদের আগের অবস্থানে ফিরে যেতে পারেননি।’

জরিপে অংশ নেয়া ব্যবসায়ীদের ৪৫ শতাংশ মনে করেন, কভিডের কারণে সৃষ্ট ক্ষতি পুষিয়ে নিতে তাদের তিন বছরের বেশি সময় লাগতে পারে। তবে তাদের মধ্যে আট শতাংশ মনে করে, অবস্থা যদি অস্বাভাবিক না হয়, তাহলে তারা এক বছরের মধ্যে ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পারবে।’ এই পুনরুদ্ধার সহজ ও টেকসই করার জন্য ব্যবসায়ীরা দুর্নীতি বন্ধ করা, কর হার কমানো, অর্থায়নের

 সহজলভ্যতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি টিকা কার্যক্রমের ওপর জোর দিয়েছেন বলেও জানান তিনি।

সিপিডির এ জরিপে উঠে এসেছে ব্যবসায়ী তথা প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যয় কমানোর চিত্র। তাদের মধ্যে ২৮ শতাংশ প্রতিষ্ঠান তাদের কর্মী ছাঁটাই করে ব্যয় কমিয়েছে। ২২ শতাংশ ব্যয় কমানোর ক্ষেত্রে নতুন ক্রেতার সঙ্গে কাজ করেছে। ১৯ শতাংশ ব্যবসা সম্প্রসারণ করেছে এবং ১৬ শতাংশ নতুন বাজারে গিয়েছে, ১৫ শতাংশ নতুন পণ্য উৎপাদনে গিয়েছে।

খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘দুর্নীতির কারণে বড় ব্যবসায়ীরা যত বেশি ক্ষতির মুখে পড়েন, তার চেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েন ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা। আমরা জরিপে দেখলাম ৫২ শতাংশ বড় ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, দুর্নীতি তাদের কাছে ব্যবসার প্রধান প্রতিবন্ধকতা। আর ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের শতভাগ জানিয়েছে, দুর্নীতি তাদের জন্য প্রধান প্রতিবন্ধকতা। অর্থাৎ এ থেকে বোঝা যায়Ñদেশে নীতি সুবিধা বাস্তবায়নে বৈষম্য রয়েছে। ফলে ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের ব্যবসায় টিকে থাকার চ্যালেঞ্জও বেশি।’ তিনি আরও বলেন, ‘এই ব্যবসায় পুনরুদ্ধারের সময় টাকা পাচার রোধ করার পাশাপাশি আরেকটি বড় চ্যালেজ্ঞ হবে প্রযুক্তিগত সুশাসন নিশ্চিত করা।’

ব্যবসায়িক অবকাঠামো আগের তুলনায় উন্নত হয়েছেÑউল্লেখ করে সিপিডি জানায়, একসময় অবকাঠামোগত দুর্বলতাকে এক নম্বর সমস্যা বা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে ব্যবসায়ীরা উল্লেখ করতেন। এখন এটি নেমে এসেছে চার নম্বরে। এর অর্থ দেশে অবকাঠামো উন্নয়ন হচ্ছে। তবুও ৪৫ শতাংশ ব্যবসায়ী অবকাঠামোগত দুর্বলতাকে ব্যবসার প্রতিবন্ধকতা হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

সিপিডির জরিপ বলছে, করোনার পরিপ্রেক্ষিতে নতুন ব্যবসার সুযোগ দেখতে পাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। বিশেষ করে ডিজিটাল ফাইন্যান্স সেবা, দক্ষতা উন্নয়ন, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমতা, ডেটা ম্যানেজমেন্ট, রিসাইক্লিং, ইলেকট্রিক খাতসহ বিভিন্ন খাতে ব্যবসার সম্ভাবনা দেখছেন তারা। তবে আগামী দুই বছর বিশ্ব অর্থনীতি কেমন যাবে, তার ওপর নির্ভর করছে অনেক কিছু। কারণ বিশ্ববাজারে চাহিদা কমে গেলে বা ঋণ সংকট দেখা দিলে দেশের ব্যবসাও সংকুচিত হবে। তারা আরও বলছে, দক্ষ মানবসম্পদ গড়তে না পারা, স্বাস্থ্যসম্মত কর্মপরিবেশ ও কর্মীদের দক্ষ করে গড়ে তুলতে না পারা বর্তমান প্রেক্ষাপটে আরেকটি বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। যে কারণে কারখানা মালিকরা দক্ষ কর্মী নিয়োগ দিতে পারছে না।

জরিপে অংশগ্রহণকারীরা মোট ১২টি সুনির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর তাদের মতামত দেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্যÑপ্রতিষ্ঠান, পরিবেশ, অবকাঠামো, জনস্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা, শিক্ষা ও দক্ষতা, শ্রমবাজারের দক্ষতা এবং ব্যবসার উদ্ভাবন।

এর আগে সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে বক্তব্য দেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। তিনি বলেন, ‘জরিপে ব্যবসার পরিবেশ, অবকাঠামো, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা, সুশাসন ও আর্থিক ব্যবস্থাপনার বিষয়গুলো প্রত্যক্ষ করা হয়েছে। আমরা ব্যবসায়ীদের কাছে এ সময় প্রযুক্তি খাতে ব্যবসায়িক সম্ভাবনার কথা শুনেছি। তবে এখানে প্রযুক্তিগত সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে এবং প্রযুক্তির অপব্যবহার থামাতে হবে। সবার জন্য প্রযুক্তিগত সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।’