প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়নে পদক্ষেপ নিন

 

যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রকাশিত প্রভাবশালী সাময়িকী ফোর্বসের প্রতিবেদনে ব্যবসার পরিবেশের ক্ষেত্রে বিভিন্ন সূচকে বাংলাদেশের যে অবস্থান তুলে ধরা হয়েছে, তা আমাদের জন্য সুখকর নয়। তালিকাভুক্ত ১৩৯ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১১৭তম। এ থেকে বোঝা যায়, পার্শ্ববর্তী দেশগুলোয় যখন ছয়-সাত বিলিয়ন ডলার বিদেশি বিনিয়োগ আসছে, তখন এ দেশে মাত্র দুই বিলিয়ন ডলার আসার কারণ মূলত নেতিবাচক পরিবেশ। অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির কারণেই বিনিয়োগকারীরা আসতে চাচ্ছেন না এখানে। শুধু ফোর্বস নয়, ব্যবসার পরিবেশের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের এমন নেতিবাচক অবস্থা আগেও তুলে ধরা হয়েছে বিশ্বব্যাংকের ‘ডুয়িং বিজনেস’ ও বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের ‘বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা সূচক’-এ। একাধিক প্রতিষ্ঠানের গবেষণায় প্রায় একই রকম তথ্য সংকটের সত্যতাকে প্রমাণ করে। অনেক সময় দেখা যায়, এ ধরনের গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ হওয়ার পর নিজেদের বক্তব্য পেশ করে সরকার। তখন সেসব তথ্যকে অস্বীকার করার মনোভাবই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সেরকম কিছু করার সুযোগ রয়েছে সামান্যই।

বস্তুত, গত বছরের তুলনায় তালিকার অবস্থানে পরিবর্তন এলেও বাংলাদেশে ব্যবসার পরিবেশ উন্নত হয়নি। আগের দুই-তিন বছর যেমন রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ছিল, তাও এখন কেটে গেছে। ধারণা করা যায়, ওই সময়ের ক্ষয়ক্ষতির যে প্রভাব অর্থনীতিতে পড়েছে, তা কিছুটা হলেও উপলব্ধি করেছে আন্দোলনকারী দলগুলো। স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে, বিবেচিত সূচকগুলোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশের উন্নতি কি অসম্ভব? আমরা এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজে দেখতে বলবো সংশ্লিষ্টদের। আমাদের ধারণা, যেসব মানদণ্ডের নিরিখে এ প্রতিবেদন তৈরি করা হয়, সেসব ক্ষেত্রে পরিবেশের উন্নয়ন ঘটানো কঠিন কিছু নয়। এজন্য দরকার সরকারের আন্তরিকতা ও উপযুক্ত পদক্ষেপ।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম পরামর্শ দিয়েছেন, এ অবস্থায় সরকারের উচিত বিভিন্ন মৌলিক খাতে দ্রুত সংস্কার কার্যক্রম হাতে নেওয়া। আমরা আশা করবো, এসব পরামর্শের ব্যাপারে সরকার পক্ষ থেকে নেওয়া হবে আন্তরিক প্রচেষ্টা। এজন্য নীতিগত ক্ষেত্রে সংস্কার আনতে যে বুদ্ধিবৃত্তিক সমর্থন জোগানো দরকার, তাও আমরা চাই দেশি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে। এটা ঠিক, নীতিগতসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে সংস্কার ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো জোগানো হলেই বিদেশি বিনিয়োগ বাড়বে না। এ বার্তা সঠিকভাবে পৌঁছাতে হবে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে।

আমরা দেখেছি, নিকট অতীতে সরকার বেশ কিছু ব্যবসাবান্ধব সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এগুলোকে স্বাগত জানানোর পাশাপাশি বলতে চাই আরও যেসব ক্ষেত্রে বিভিন্ন ব্যবসায়িক সংগঠনের পক্ষ থেকে বিবেচনার দাবি তোলা হচ্ছে, সেগুলোও নেওয়া হোক বিবেচনায়। কোনো দেশে ব্যবসার পরিবেশ উন্নত হয় রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার পাশাপাশি সময় ও ব্যবসাবান্ধব নীতিকাঠামো গঠনের মধ্য দিয়েই। প্রতিবেদনে তালিকার ওপরের দিকে যেসব দেশ রয়েছে, সেগুলোর দিকে তাকালেই বিষয়টি সুস্পষ্ট হয়। একটি নির্দিষ্ট সময় পর জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠান ঘিরে আড়াই দশক ধরে দেশে অস্থিতিশীলতা যেভাবে ফিরে আসছে, সে ধারায়ও পরিবর্তন আনা দরকার। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা স্থায়ী না হলে শুধু অর্থনৈতিক নয়, অন্যান্য ক্ষেত্রেও উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়। কিছু সময় বিরতি দিয়ে অস্থিতিশীলতার পুনরাবৃত্তির অর্থ হলো দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণে নিরুৎসাহিত করা। এ ধারা থেকে বেরুনোর জন্য যেমন রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন, তাও আমরা সরকার এবং তার বাইরে থাকা রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে আশা করি। যে সময়ের মধ্যে নি¤œ-মধ্যম থেকে মধ্যম আয়ে দেশকে উত্তরণের লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে, তা পূরণেও কিন্তু এমন পদক্ষেপ নেওয়ার বিকল্প নেই। সর্বোপরি, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বাস্তবতা পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পুরনো নীতিকাঠামো ও মনোভাব নিয়ে আমরা বসে থাকতে পারি না। ব্যবসায়িক পরিবেশ উন্নয়নের স্বার্থে যেসব সংস্কার অনিবার্য, তা যত দ্রুত আনা যায় ততই মঙ্গল।