প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

ব্যবসা-বাণিজ্যের বিভিন্ন ধাপ সম্পর্কে জানুন

জীবিকা নির্বাহের জন্য মানুষ যেসব আর্থিক লেনদেন করে বা লাভ-লোকসান হয়, এমন কার্যাবলিতে নিযুক্ত থাকে, সেসব কাজকে সমষ্টিগতভাবে ব্যবসায় বলে। আর্থিক লেনদেন হয় না এমন কাজে ব্যস্ত থাকাকে ব্যবসায় বলে না। যেমন টিভি দেখা, উদ্দেশ্যহীনভাবে রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো, তাস খেলা, আড্ডা দেওয়া প্রভৃতি। আবার অর্থনীতির সংজ্ঞা বিবেচনায় নিলে  দেখা যাবে, জীবিকা নির্বাহের জন্য পণ্য ও সেবা উৎপাদন ও সরবরাহের সঙ্গে বহুবিধ পেশা রয়েছে এবং মানুষ এসব পেশার কোনো একটির সঙ্গে জড়িত। আর্থিক লেনদেন হয় এমন কিছু পেশা হলো, শিক্ষকের শ্রেণিকক্ষে পাঠদান, হাসপাতাল বা ব্যক্তিগত চেম্বারে চিকিৎসকের রোগী দেখা, ফার্মাসিস্টের ওষুধ উৎপাদন ও ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী ওষুধ বিক্রি, রোগীকে নার্স কর্তৃক ওষুধ সেবন, চা-বিক্রেতার চা পরিবেশন, হোটেলে কাজ করা প্রভৃতি। গুদামজাত, পরিবহন, বিমা, অগ্রিম বায়না

ও বিজ্ঞাপন প্রচার প্রভৃতি ব্যবসার অংশ হিসেবে গণ্য হয়।

ব্যবসার শ্রেণিবিভাগ মোটা দাগে ব্যবসায়িক কার্যাবলিকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়। এগুলো হলো ক. শিল্প বা কল-কারখানা; খ. বাণিজ্য।

শিল্প বা কল-কারখানা: ব্যবসায়িক কার্যাবলির যেসব অংশ কোনো পণ্যের উৎপাদন, আহরণ, রূপান্তর, প্রক্রিয়াজাত বা জমানোর সঙ্গে জড়িত থাকে, সেগুলোকে সমষ্টিগতভাবে শিল্প বলা হয়।

উৎপাদিত পণ্য বা সেবা কোনো কাজে ব্যবহৃত হবে তার ওপর ভিত্তি করে শিল্পকে নি¤œরূপে শ্রেণিবদ্ধ করা যায় ক. প্রাথমিক উৎপাদিত পণ্য বা প্রারম্ভিক পণ্য; খ. অর্ধ-সমাপ্ত উৎপাদিত পণ্য; গ. সম্পূর্ণরূপে প্রস্তুত উৎপাদিত পণ্য সম্পূর্ণরূপে প্রস্তুত পণ্যকে

দুই ভাগে ভাগ করা যায় মূলধনি বা

উৎপাদকের পণ্য ও ভোক্তার পণ্য/ভোগ্যপণ্য

প্রাথমিক উৎপাদিত পণ্য: কৃষি, বন, খনি, পশুসম্পদ ও মৎস্য খামার থেকে প্রাপ্ত পণ্যসমূহ প্রাথমিক বা প্রারম্ভিক পণ্য হিসেবে ধরা হয়। এ-জাতীয় পণ্যের উদাহরণ হলো : ধান/চাল, গম/আটা, তুলা/সুতা, আখ/চিনি, খাদ্যশস্য, কাঠ, ধাতব আকরিক, দুধ, মাছ, রেশম প্রভৃতি। ওষুধ উদ্ভিদ বা গাছপালা ও প্রাণী, অণুজীব, সামুদ্রিক প্রাণী থেকে প্রাপ্ত বিভিন্ন ওষুধ প্রারম্ভিক পণ্য হিসেবে গণ্য হয়।

অর্ধ-প্রস্তুত পণ্য: সম্পূর্ণ প্রস্তুত পণ্য হিসেবে ব্যবহার উপযোগী হওয়ায় আগে কোনো শিল্প-কারখানায় প্রস্তুত একটি পণ্যকে যখন অন্য কারখানায় প্রক্রিয়াজাত করতে হয়, তখন ওই পণ্যটিকে অর্ধ-প্রস্তুত পণ্য বলে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ক্যাপসুল শেল একটি কারখানায় তৈরি হয়। পরে ওষুধ দিয়ে এটিকে পূর্ণরূপে ব্যবহার উপযোগী করার জন্য ওষুধ কারখানার ক্যাপসুল ফিলিং সেকশনে নিয়ে কাজটি পুরোপুরি সম্পন্ন করতে হয়। এ রকম অর্ধ-প্রস্তুত পণ্যের আরও উদাহরণ হলোÑপিগ লৌহ, কাপড় তৈরির সুতা, কাগজ তৈরির পাল্প প্রভৃতি।

সম্পূর্র্ণ প্রস্তুত পণ্য: ভোক্তার ব্যবহারের জন্য সম্পূর্ণরূপে প্রস্তুত এমন পণ্য বা সেবাকে সম্পূর্ণ প্রস্তুত পণ্য বলে। সম্পূর্ণরূপে প্রস্তুত এমন পণ্যের উদাহরণ হলো: বিভিন্ন ধরনের ওষুধ, কাপড়, জুতা, চিনি, কাগজ, মেশিনপত্র বা কলকব্জা প্রভৃতি।

সম্পূর্ণ প্রস্তুত পণ্য বা সেবাসামগ্রীকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়: মূলধনি বা উৎপাদক পণ্য ও  ভোক্তার পণ্য বা উৎপাদিত পণ্য।

মূলধনি পণ্য বা উৎপাদক পণ্য: অন্য কোনো পণ্য তৈরি বা প্রক্রিয়াজাত করার জন্য ব্যবহƒত হয় এমন পণ্যকে মূলধনি পণ্য বা উৎপাদক পণ্য বলে। উদাহরণ কাঁচা লোহা, ছোট ছোট কলকব্জা ও যন্ত্রপাতি প্রভৃতি।

ভোক্তার পণ্য বা ভোগ্যপণ্য: ভোক্তার ব্যবহারের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত এবং আর অন্য কোনো রকম প্রক্রিয়াজাত করার প্রয়োজন নেই, এমন পণ্যকে ভোগ্যপণ্য বলে। উদাহরণÑট্যাবলেট, ক্যাপসুুল, সিরাপ, ইনজেকশন, মলম প্রভৃতি ওষুধ, শাড়ি, লুঙ্গি, জুতা-খড়ম,

সাবান, টিভি, রেডিও, ফ্রিজ, ওয়াশিং মেশিন, চেয়ার-টেবিল প্রভৃতি।

শিল্পের শ্রেণিবিভাগ

কী ধরনের পণ্য বা সেবাসামগ্রী তৈরি হয় বা উৎপাদিত হওয়ার ভিত্তিতে শিল্পকে চার ভাগে ভাগ করা যায়। এগুলো হলো জেনেটিক শিল্প, আহরণমূলক শিল্প, উৎপাদনমূলক শিল্প, নির্মাণশিল্প

জেনেটিক শিল্প: ‘জেনেটিকস’ বা বংশগতি শব্দ থেকে জেনেটিক শব্দটির উৎপত্তি। উদ্ভিদ, প্রাণী ও পাখির পুনরোৎপাদন ও বংশবৃদ্ধিকরণের সঙ্গে সম্পর্কিত বা জড়িত শিল্পকে জেনেটিক শিল্প বলে। যেমনÑচারা উৎপাদনের নার্সারি, গবাদি পশুর খামার, হাঁস-মুরগির খামার, মৎস্য চাষের খামার প্রভৃতি।

আহরণমূলক শিল্প: প্রাকৃতিক উৎস যেমন মাটি, বায়ু বা পানি থেকে কোনো পণ্য আহরণের সঙ্গে জড়িত শিল্পকে আহরণমূলক শিল্প বলে। যেমন: কৃষি, খনিজ তেল উত্তোলন, বনজ শিল্প, মাছ ধরা প্রভৃতি।

উৎপাদনমূলক শিল্প: পণ্য উৎপাদনে নিয়োজিত শিল্পকে উৎপাদনমুখী শিল্প বলে। উদাহরণÑওষুধ শিল্প, বস্ত্র শিল্প, পাট শিল্প, জাহাজ নির্মাণ শিল্প, চিনি শিল্প, ইস্পাত ও প্রকৌশল শিল্প। এ ধরনের শিল্প কারখানায় সাধারণত কাঁচামাল বা অর্ধপ্রস্তুত মাল থেকে সম্পূর্ণ প্রস্তুত পণ্য তৈরি করা হয়। উৎপাদনমুখী শিল্পকে আবার চার ভাগে ভাগ করা যায়।

বিশ্লেষণধর্মী শিল্প: কোনো বিশেষ ধরনের কাঁচামালকে বিশ্লেষণ করার সংঙ্গে যুক্ত শিল্পকে বিশ্লেষণধর্মী শিল্প বলে। যেমন: মাটির নিচে খনি থেকে উত্তোলন করা অপরিশোধিত তেলকে বিশ্লেষণ করার পর আংশিক পাতন পদ্ধতিতে এটি থেকে পেট্রল, ডিজেল, কেরোসিন, গ্যাসোলিন ও লুব্রিক্যাটিং তেল পৃথক করা হয়।

সংশ্লেষণধর্মী শিল্প: যে শিল্প-কারখানায় দুই বা ততোধিক কাঁচামালকে একত্রে মিশিয়ে প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে অন্য একটি নতুন মাল উৎপাদন করা হয় তাকে সংশ্লেষণধর্মী শিল্প বলে। যেমন: বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক দ্রব্য, ওষুধ, সাবান, কসমেটিকস, পেইন্টস, সার, কীটনাশক, সিমেন্ট প্রভৃতি।

প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প: এ-জাতীয় শিল্প-কারখানায় কাঁচামালকে বিভিন্ন স্তরে প্রক্রিয়াজাত করে সম্পূর্ণ প্রস্তুত পণ্য তৈরি করা হয়। যেমন: ওষুধ, কাগজ, কাপড়, চিনি ও ইস্পাত। শিল্প প্রক্রিয়াজাতকরণে বিশ্লেষণ ও সংশ্লেষণ উভয় পদ্ধতি প্রয়োগ

করা যেতে পারে। (চলবে)

 

অধ্যাপক, ফার্মাসিউটিক্যাল কেমিস্ট্রি বিভাগ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়