নিজস্ব প্রতিবেদক : দেশের বেসরকারি খাতের শীর্ষ মোবাইল ফোন অপারেটর গ্রামীণফোনের ব্যবসায়িক আয় গত বছরে সামান্য হ্রাস পেয়েছে। সর্বশেষ বছরে কোম্পানিটি ১৫ হাজার ৮০৬ কোটি টাকার রাজস্ব আয় করেছে, যেখানে এর আগের বছর ২০২৪ সালে এই অঙ্ক ছিল ১৫ হাজার ৮৪৫ কোটি টাকা। ফলে এক বছরের ব্যবধানে গ্রামীণফোনের মোট ব্যবসা কমেছে ৩৯ কোটি টাকা।
তবে রাজস্বের তুলনায় মুনাফার পতন ছিল আরও বেশি লক্ষণীয়। গত বছর শেষে গ্রামীণফোনের নিট মুনাফা দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৯৫৮ কোটি টাকায়, যা ২০২৪ সালে ছিল ৩ হাজার ৬৩১ কোটি টাকা। সে হিসাবে এক বছরে কোম্পানিটির মুনাফা কমেছে ৬৭৩ কোটি টাকা, যা শতাংশের হিসাবে প্রায় সাড়ে ১৮ ভাগ।
এদিকে গ্রামীণফোন শেয়ারহোল্ডারদের জন্য ১০৫ শতাংশ চূড়ান্ত নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। এর আগে কোম্পানিটি ১১০ শতাংশ অন্তর্বর্তীকালীন নগদ লভ্যাংশ বিতরণ করেছিল। ফলে সমাপ্ত হিসাব বছরে কোম্পানিটি শেয়ারহোল্ডারদের জন্য মোট ২১৫ শতাংশ লভ্যাংশ ঘোষণা করল।
২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর সমাপ্ত (জানুয়ারি-ডিসেম্বর) অর্থবছরের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ এ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। সর্বশেষ ঘোষিত লভ্যাংশ অনুযায়ী প্রতিটি ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের শেয়ারের বিপরীতে শেয়ারহোল্ডাররা ২১ টাকা ৫০ পয়সা নগদ লভ্যাংশ পাবেন।
গত মঙ্গলবার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) ওয়েবসাইট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
এর আগে সোমবার অনুষ্ঠিত কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদের বৈঠকে সর্বশেষ হিসাব বছরের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা ও অনুমোদনের পর লভ্যাংশ ঘোষণার এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
ঘোষিত লভ্যাংশ শেয়ারহোল্ডারদের অনুমোদনের জন্য কোম্পানির বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) আগামী ২০ এপ্রিল ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে অনুষ্ঠিত হবে। লভ্যাংশ পাওয়ার জন্য শেয়ারহোল্ডার নির্বাচন করতে রেকর্ড তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে আগামী ২৬ ফেব্রুয়ারি।
২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর সমাপ্ত হিসাব বছরে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) হয়েছে ২১ দশমিক ৯০ টাকা, যা আগের হিসাব বছরে ছিল ২৬ দশমিক ৮৯ টাকা।
আলোচ্য সময়ে কোম্পানির শেয়ারপ্রতি নিট অপারেটিং ক্যাশ ফ্লো (এনওসিএফপিএস) হয়েছে ৪৫ দশমিক ৬০ টাকা। আগের হিসাব বছরে যা ছিল ৪৫ দশমিক ৯১ টাকা। এ সময়ে কোম্পানির শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদ মূল্য (এনএভিপিএস) দাঁড়িয়েছে ৪১ দশমিক ৪৯ টাকা।
এই করপোরেট ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে মঙ্গলবার কোম্পানিটির শেয়ারের লেনদেনে কোনো মূল্যসীমা (সার্কিট ব্রেকার) প্রযোজ্য থাকবে না।
আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, গত বছর ব্যবসার চেয়ে কোম্পানিটির মুনাফা বেশি কমেছে মূলত ঋণের সুদসহ আর্থিক খরচ ও ডলারের বিনিময় মূল্যজনিত ব্যয় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়ে যাওয়ায়। গত বছর ঋণের সুদসহ আর্থিক খাতে কোম্পানিটির খরচ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৪১ কোটি টাকা। ২০২৪ সালে এই খাতে কোম্পানিটির খরচ ছিল ৪৯৯ কোটি টাকা। সেই হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে গ্রামীণফোনের আর্থিক খরচ বেড়েছে ১৪২ কোটি টাকা। একইভাবে ডলারের বিনিময় মূল্যের কারণে এক বছরের ব্যবধানে জিপির খরচ বেড়েছে ১৭ কোটি টাকা। গত বছর শেষে ডলারের বিনিময় মূল্যের কারণে কোম্পানিটির খরচ বেড়ে দাঁড়ায় ৭৭ কোটি টাকায়। ২০২৪ সালে যার পরিমাণ ছিল ৬০ কোটি টাকা।
ব্যবসা কমলেও ২০২৪ সালের চেয়ে গত বছর গ্রামীণফোন কর বাবদ প্রায় ২৫০ কোটি টাকা বেশি রাজস্ব দিয়েছে সরকারকে। গত বছর পরিচালন মুনাফা থেকে কর বাবদ কোম্পানিটি সরকারের কোষাগারে জমা দেয় ১ হাজার ৯৬৪ কোটি টাকা। ২০২৪ সালে যার পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৭২৩ কোটি টাকা।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত এই বহুজাতিক এ ক্যাটেগরির এই কোম্পানিটি প্রতিবছরই নিয়মিত লভ্যাংশ প্রদান করে আসছে। তবে ২০২৫ সালে ব্যবসায়িক মুনাফা ১৯ শতাংশ হ্রাস পাওয়ায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে কিছুটা মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। জানা গেছে, ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ গ্রামীণফোনের মোট গ্রাহক সংখ্যা প্রায় ৮ কোটি ৩৯ লাখ থেকে ৮ কোটি ৫১ লাখের মধ্যে। এছাড়া ২০২৫ সালের মে মাস নাগাদ এই সংখ্যা ৮৬ দশমিক ১৭ মিলিয়নে পৌঁছায়। এটি বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম শীর্ষ মোবাইল অপারেটর। ১৯৯৭ সালে যাত্রা শুরুর করে টেলিনর গ্রুপের অঙ্গসংগঠন গ্রামীণফোন।
২০০৯ সালে পুঁজিবাজারে যুক্ত হয় টেলিযোগাযোগ খাতে তালিকাভুক্ত বহুজাতিক কোম্পানি গ্রামীণফোন লিমিটেড, যা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়কালেই তালিকাভুক্তির উদ্যোগ নেয়া। গ্রামীণফোন বর্তমানে দেশের পুঁজিবাজারের সবচেয়ে বড় মূলধনি কোম্পানি।
এ বিষয়ে গ্রামীণফোনের কোম্পানি সচিব এস এম ইমদাদুল হকের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি ফোন রিসিভ করেনি।
প্রিন্ট করুন








Discussion about this post