মত-বিশ্লেষণ

ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদহারই ব্যবসায়ের একমাত্র প্রতিবন্ধক নয়

মোশারফ হোসেন

(গতকালের পর) চলতি ঋণের ক্ষেত্রে কেবল ঋণের উত্তোলিত অংশের ওপরই সুদ দিতে হয়। কিন্তু উপরিউক্ত সুদবহির্ভূত খরচগুলো ঋণের টাকা ব্যবহার না করলেও গ্রাহককে গুনতে হবে। আমরা ধরে নিচ্ছি, ‘কস্ট অব ডুয়িং বিজনেস’ কমাতে সরকার আন্তরিক। তাহলে ঋণের সুদ কমানোর পাশাপাশি উপরিউক্ত খাতের খরচগুলো কমানো উচিত নয় কি? আর আন্তরিকতার সন্দেহ দূর করতে ব্যাংকের আগে সরকার উদ্যোগী হয়ে এসব খরচ কমানোর ঘোষণা দিলেও তো ঋণগ্রহীতাদের অনেক বড় বোঝা কমে যেত। রেজিস্টার্ড মর্টগেজ (বন্ধকি) ও পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দলিল থাকার পরও ঋণের আগে-পরে ডজনখানেক চার্জ ডকুমেন্ট ও অঙ্গীকার সম্পাদন এবং তাতে ঋণগ্রহীতা ও গ্যারান্টরদের স্বাক্ষর প্রদান করতে হয়। এত ডকুমেন্টশন ঋণ প্রক্রিয়াকে অতিদীর্ঘ করে এবং ঋণগ্রহীতার ঋণের খরচ অনেক বাড়িয়ে তোলে। তাই প্রয়োজনীয় আইনি সংশোধন এনে স্ট্যাম্প ও রেজিস্ট্রেশন খরচ কমিয়ে, একটি স্থাবর সম্পত্তি একটি ঋণের বিপরীতে কেবল একবার রেজিস্ট্রেশনের বিধান করা যেতে পারে। এতসব চার্জ ডকুমেন্ট সম্পাদনের পদ্ধতিও বাতিল করা উচিত বলেই মনে করি। ঋণ আবেদন, ঋণ প্রস্তাব, মঞ্জুরিপত্র ও ঋণ হিসাবের বিবরণীভিত্তিক ঋণ প্রক্রিয়া প্রতিষ্ঠিত করা গেলে ঋণপ্রক্রিয়া অনেক সংক্ষিপ্ত হয়ে আসবে এবং ঋণগ্রহীতার খরচ এক-তৃতীয়াংশে নেমে আসবে। নারী উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রে ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত জামানতবিহীন ঋণ প্রদানের নির্দেশনা আছে। তাহলে সম্ভাবনাময় পুরুষ উদ্যোক্তা যারা জামানত প্রদান করে ঋণ নিচ্ছে, তাদের জামানত রেজিস্ট্রেশন খরচ ও রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া সহজীকরণ অত্যন্ত যৌক্তিক দাবি। এক কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণের সুদবহির্ভূত খরচ যেন পাঁচ হাজার টাকার বেশি না হয়। এজন্য সরকারকেই অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। পাশাপাশি ঋণ আদায় প্রক্রিয়ায় সরকার আন্তরিক ও কঠোর হলে দেশের অর্থনীতিতে ঋণের প্রবাহ বর্তমানের চেয়ে বহুগুণে বেড়ে যাবে নিশ্চিত। 

পাশাপাশি সুদহার বিষয়ে ব্যাংকের দায় ও সীমাবদ্ধতাও নীতিনির্ধারকদের মাথায় রাখতে হবে। ধরি, একজন ব্যবসায়ী ব্যাংক থেকে ঋণ নেবেন। ব্যবসায়ীকে ঋণ দিতে প্রয়োজনীয় অর্থ ব্যাংক কোথায় পাবে? এ অর্থ উৎপাদনের জন্য কি ব্যাংকের কাছে কোনো টাঁকশাল আছে? না, ইচ্ছামতো টাকা উৎপাদনের জন্য ব্যাংকের কাছে টাঁকশাল নেই। ব্যাংক টাকার মালিকও নয়, কেবল তত্ত্বাবধান করে। ব্যবসায়ীরা যে অর্থ ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়, সেই অর্থ ব্যাংক আগে জনগণ তথা আমানতকারীদের কাছ থেকে ঋণ নেয়। আমানতকারীরা বিনা খরচে এ অর্থ ব্যাংককে ধার দেয় না। মোটা অঙ্কের সুদ গুনতে হয় ব্যাংককেও। তবে মজার বিষয় হচ্ছে, ব্যাংকের অনেক ঋণ ফেরত না এলেও আমানতকারীদের আমানত ফেরত না দেওয়ার কোনো উপায় ব্যাংকের নেই। ব্যাংকের কোটি কোটি টাকার ঋণখেলাপি হয়ে অনাদায়ী হয়ে পড়ে থাকে বছরের পর বছর, কিন্তু আমানতকারীদের আমানত ফেরত প্রদানের ক্ষেত্রে ব্যাংকের আজ-কাল বলার কোনো সুযোগ নেই। ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা যাই হোক না কেন, ব্যাংক কর্তৃক আমানতকারীকে লাভসহ মূল আমানত ফেরত দিতে হয়। অন্যদিকে ব্যাংকের ঋণ যখন খেলাপি হয় তখন মূলধনও যায়, লাভও যায়! অর্থাৎ ব্যাংকের আমানত ও ঋণ যেন বিপরীত চরিত্রের অসম সম্পর্ক। ব্যাংক তার পুঁজির সরবরাহকারী আমানতকারীদের তোয়াজ করে আমানত আহরণ করে, অন্যদিকে সেই আমানতকে ঋণ হিসেবে দিয়ে ঋণগ্রহীতাদেরও পেছন পেছন ঘোরে। তাহলে আমানতকারী ও ঋণগ্রহীতা উভয়ের দায়িত্ব ও দায় সবই কি ব্যাংকের? আমানতকারীদের স্বার্থরক্ষা এবং ইচ্ছাকৃতভাবে যারা ঋণখেলাপি হয়েছে, তাদের দমন করার দায়িত্ব কি রাষ্ট্রীয়ভাবে আর কারোর নেই? এই দায়দায়িত্ব যদি আর কেউ না-ই নেবে, তাহলে বারবার ব্যাংকের গলা চেপে ধরতে চাওয়া হচ্ছে কেন? দায়িত্বশীলদের যতটা না ব্যাংক এমডিদের বেতন, ব্যাংকের সাজসজ্জা আর ব্যাংকের মুনাফা নিয়ে কথা বলতে শোনা যায়, তেমনটা খেলাপি ঋণ আদায় এবং ইচ্ছাকৃতভাবে যারা ঋণখেলাপি হয়েছে তাদের শাস্তি নিয়ে বলতে শোনা যায় না। তাই ব্যাংককে বোধহয় তার নিজের মতো থাকতে দেওয়াটাই ভালো। আর নিয়ন্ত্রণ করতে চাইলে তো বাংলাদেশ ব্যাংক আছেই। অযাচিত নিয়ন্ত্রণ ব্যাংক খাতের জন্য সুফল বয়ে আনবে না নিশ্চয়।

শেষ কথা হচ্ছে, মুক্তবাজার অর্থনীতিতে চাহিদা ও জোগানের ভিত্তিতে পণ্যের মূল্য নির্ধারিত হয়। তীব্র প্রতিযোগিতার কারণে উদ্যোক্তাদের তাদের পণ্য ও সেবার মান ও মূল্যে গ্রাহকের প্রয়োজন ও পছন্দকে অগ্রাধিকার দিতে হয়। বহু আগেই এদেশে নতুন ব্যাংকের প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে গেছে বলে নতুন ব্যাংকের লাইসেন্স পাওয়াটাকে তীব্র সমালোচনা করা হয়। মুক্তবাজার অর্থনীতির নীতি অনুযায়ী অপ্রয়োজনীয় ব্যাংকের আগমন দোষের কিছু নয়। যারা ভালো করবে তারা টিকে থাকবে, যারা পারবে না তারা ঝরে পড়বে। তাই সুদের হারে হস্তক্ষেপ এই বাজারনীতির পরিপন্থি। আমানতের জোগান এবং ঋণের চাহিদার ভিত্তিতেই সুদের হার নির্ধারিত হওয়া উচিত। আর ব্যাংকের নিয়মিত সুদ-আয়ে যদি হস্তক্ষেপ করতেই হয়, তাহলে ব্যাংকের খেলাপি ঋণ এবং অবলোপনকৃত অনিশ্চিত সুদ ও স্থগিত সুদ আদায়ার্থে ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের আইনের আওতায় আনতে হবে। নিরাপত্তা সঞ্চিতির হার না কমালেও ব্যাংকের করপোরেট করহার আরও কমানো যেতে পারে। এসব পদক্ষেপ নেওয়া গেলে ব্যাংকের আয় বাড়ার পাশাপাশি খরচ কমবে এবং ফলে ব্যাংকঋণের সুদ আয় কমাতে উদ্বুদ্ধ হবে। একই সঙ্গে ব্যাংকঋণ সংশ্লিষ্ট সরকারি ফি কমিয়ে সরকারও যদি নিজের আয়ে আরেকটু ছাড় দেয় এবং ঋণসংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর দুর্নীতি ও অনিয়ম কঠোর হস্তে দমন করে, তাহলে অবশ্যই ব্যাংকের ঋণগ্রহীতারা ঋণের প্রকৃত সুফল ভোগ করতে পারবে।

ব্যাংক কর্মকর্তা

সড়ংযধৎধভসধঁ.২০০১১৭Ñমসধরষ.পড়স

সর্বশেষ..