দিনের খবর প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

ব্যাংকঋণে আগ্রাসী সরকার

শেখ আবু তালেব: প্রকল্প বাস্তবায়ন ও ব্যয় মেটাতে আর্থিক খাত থেকে ধার করে সরকার। সম্প্রতি সরকারের ব্যাংক খাত থেকে ঋণ নেওয়ার পরিমাণ অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণে অর্থবছরের মোট লক্ষ্যমাত্রার ৯০ শতাংশই নেওয়া হয়েছে পাঁচ মাসের মধ্যে। বিশ্লেষকরা বলছেন, আগ্রাসীভাবে ব্যাংকঋণ নিচ্ছে সরকার। এভাবে চলতে থাকলে অর্থবছর শেষে ব্যাংকঋণ লক্ষ্যমাত্রার দ্বিগুণ হবে সরকারের।

উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন ও রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রতি অর্থবছর বাজেট ঘোষণা করে সরকার। এসব কর্মসূচি বাস্তবায়নে রাজস্ব আয়ই সরকারের ভরসা। এর বাইরে যে ঘাটতি থাকে, তা মেটাতে অভ্যন্তরীণ ও বহিঃউৎস থেকে ঋণ নেওয়া হয়। চলতি অর্থবছরে দেশের ব্যাংক খাত থেকে ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৪৭ হাজার ৩৬৩ কোটি টাকা। অবশিষ্ট ৩০ হাজার কোটি টাকা জাতীয় সঞ্চয়পত্র ও ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক খাত থেকে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

সঞ্চয়পত্র থেকে চাহিদা দেওয়ার পূর্বেই সরকার অর্থ পেয়ে থাকে। তবে উচ্চ সুদের কারণে ব্যাংকের পরিবর্তে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগে ঝুঁকে পড়েছিলেন আমানতকারীরা। সম্প্রতি এই সুদহারে লাগাম টানে সরকার। ফলে চলতি অর্থবছরে জাতীয় সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ কমে যায়। অন্যদিকে প্রতিনিয়তই কমছে সরকারের রাজস্ব আদায়ের হার।

ফলে অর্থের চাহিদা মেটাতে ব্যাংকমুখী হচ্ছে সরকার। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের শুরু থেকেই ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার প্রবণতা বৃদ্ধি পেতে থাকে সরকারের। অর্থবছরের প্রথম দিন থেকে গত ২১ নভেম্বর পর্যন্ত সরকার ব্যাংক খাত থেকে ৪২ হাজার ৬০৭ কোটি ৩২ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছে। অথচ চলতি বাজেটে সরকারের ব্যাংক খাত থেকে ৪৭ হাজার ৩৬৪ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। এ হিসাবে অর্থবছরের মাত্র পাঁচ মাসেই পুরো লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৯০ শতাংশ ব্যাংকঋণ নিয়ে ফেলেছে সরকার।

একদিকে সঞ্চয়পত্র বিক্রি কমে যাচ্ছে, অন্যদিকে সরকারের ব্যাংকঋণ বাড়ছে। সঞ্চয়পত্র বিক্রি বাড়লে অর্থব্যবস্থায় সমস্যা তৈরি করে। অপরদিকে ব্যাংক থেকে বেশি ঋণ নিলে বেসরকারি খাতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এই দুই সমস্যার বিষয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম শেয়ার বিজকে বলেন, সরকারের রাজস্ব আদায় কমে যাচ্ছে। একই সঙ্গে কমছে রপ্তানি আয়। জাতীয় পরিচয় ও কর শনাক্তকারী নম্বর ব্যবহার করায় জাতীয় সঞ্চয়পত্রেও বিনিয়োগ নেই আগের মতো। ব্যয় মেটাতে সরকারকে ব্যাংকমুখীই হতে হচ্ছে। এর ফলে উচ্চ খেলাপির ব্যাংক খাত থেকে বেসরকারি বিনিয়োগ কমে যাবে। যার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে সামষ্টিক অর্থনীতিতে।

জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গত অক্টোবরে সঞ্চয়পত্র বিক্রি কমে ৮২২ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। একক মাস হিসেবে নিট সঞ্চয়পত্র বিক্রির এ হিসাব সবচেয়ে কম। আগের অর্থবছরের একই মাসে যা ছিল চার হাজার ৪১৬ কোটি টাকা।

সরকারের ব্যাংকঋণ নেওয়ার প্রবণতা ও দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে এর প্রভাব বিষয়ে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি আট শতাংশের ওপরে বলে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে। উৎপাদন খাতের প্রবৃদ্ধি হচ্ছে ১৯ দশমিক পাঁচ শতাংশ। উৎপাদন বৃদ্ধি মানে পণ্যের বিক্রি বাড়ছে। তাহলে তো পণ্য বিক্রির পরিমাণও ধুমছে বাড়ার কথা। পণ্য বিক্রি যত বাড়বে, ভ্যাট আদায় তত০বেশি হবে। ভ্যাট সরকারের প্রত্যক্ষ আয়। কিন্তু সরকারের রাজস্ব চিত্র তা বলছে না। তাহলে ভ্যাট আদায়ের হার কমছে কেন?

তিনি বলেন, আসলে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে গেছে। বিনিয়োগে যাচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা। এজন্য ব্যবসায়ীদের ঋণ চাহিদা কমে গেছে। কেন কমছে, তা মাঠ পর্যায় থেকে বের করতে হবে। এ জন্য সরকারকেই বিনিয়োগ বাড়াতে হচ্ছে। বাধ্য হয়ে সরকার ব্যাংক থেকে ঋণ নিচ্ছে উচ্চহারে। সরকার যেভাবে ব্যাংকঋণ নিচ্ছে, তাতে অর্থবছর শেষে লক্ষ্যমাত্রার দ্বিগুণ ছাড়িয়ে যেতে পারে।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয় আট দশমিক ১৩ শতাংশ, চলতি অর্থবছরে তা আট দশমিক ২০ শতাংশের লক্ষ্য রয়েছে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য দিয়ে আহসান এইচ মানসুর বলেন, গত এক বছরে ভ্যাট আদায় নি¤œগতিতে রয়েছে। এক বছরে আদায়ের হার কমছে শূন্য দশমিক ৮৬ শতাংশ। রপ্তানি কমে গেছে ১৭ শতাংশ। উৎপাদন যাচ্ছে কোথায়Ñপ্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, এটি প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কারণ ব্যাখ্যা করে প্রবীণ এই বিশেষজ্ঞ জানান, আমাদের অর্থনীতি হয়তো নিম্নগতিতে যাচ্ছে, এখানেই আমার উদ্বেগ। দেশের অর্থনীতি সামগ্রিকভাবে ভালো যাচ্ছে না বলেও মনে করেন তিনি।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..