Print Date & Time : 17 April 2021 Saturday 1:48 am

ব্যাংকঋণে ৯ শতাংশ সুদহার কার লাভ, কার ক্ষতি

প্রকাশ: February 20, 2021 সময়- 05:07 pm

মোশারফ হোসেন: কয়েক মাস আগে ফেসবুকের বদৌলতে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের একজন উপপরিচালকের নেতৃত্বে পরিচালিত মোবাইল কোর্টের একটি অভিযানে দেখেছিলাম, ঢাকার মগবাজারের এক পাইকার ৯৭ টাকা (এলসি প্রাইস) দরে আমদানি করা প্রতি কেজি আদা বিক্রি করছেন ২৪৫ টাকায়। মোবাইল কোর্ট পরিচালক কর্তৃক জেল-জরিমানার ভয় দেখানোর একপর্যায়ে দোকানে প্রদর্শিত মূল্যতালিকায় এই আদার দাম পুনর্র্নির্ধারণ করা হয় ১২০ টাকায়!
একই সময়ে খুচরা বাজার থেকে এই আদাই আমি কিনেছিলাম সাড়ে ৩০০ টাকা কেজিতে। আবার ফেসবুকের কয়েকজন বন্ধু জানিয়েছিলেন, তাদের কেউ কেউ এই আদা কিনেছেন ৪০০ টাকা কেজিতে, আবার কেউ কিনেছেন ৫০০ টাকা কেজিতে! অথচ ২০ শতাংশকেও যদি স্বাভাবিক লাভ ধরা হয়, তাহলে এই আদার পাইকারি মূল্য ১২০ টাকার বেশি হওয়ার কথা নয়। এরপর খুচরা বিক্রেতাও যদি আরও ২০ শতাংশ লাভ ধরে আদার মূল্য নির্ধারণ করে, তাহলে প্রতি কেজি আদার খুচরা মূল্য হতে পারে ১৪৫ টাকার মতো। কিন্তু সেই আদা যদি ৫০০ টাকা কেজিতে (!) কিনতে হয়, তাহলে প্রতি কেজির এলসি প্রাইসের সঙ্গে প্রতি কেজির খুচরা মূল্যের পার্থক্য হয় ৪০৩ টাকা! এটা কি ব্যবসা নাকি রীতিমতো অস্ত্রশস্ত্রবিহীন ডাকাতি?
এই আদার আগে পেঁয়াজের অতি ঝাঁজ, তারপর আলুর দামে ডিগবাজি, আর এখন ভোজ্যতেলের তেলেসমাতির আমরা সবাই সাক্ষী। পিছিয়ে নেই চাল, ডাল, চিনি, আটা, মসলা, ওষুধসহ অন্যান্য নিত্যপণ্যের দামও। সামনে আসছে রমজান মাস। এই রমজানেও নিশ্চয় কোমরবেঁধে নামবেন একশ্রেণির ডাকু ব্যবসায়ী। রমজান মাস মুসলমানদের কাছে সংযমের; কিন্তু আমার মতো নির্দিষ্ট ও স্বল্প আয়ের অনেক সাধারণ ভোক্তার কাছে রমজান মাস আতঙ্কেরও মাস। আর ২০২১ সালে এই আতঙ্ক যেন একটু আগেই গ্রাস করছে আমাদের, কারণ রমজান আসার আগেই যে অসাধু ব্যবসায়ীদের কালো খেলা শুরু হয়ে গেছে!
ব্যাংকার হিসেবে ব্যবসায়ীদের নিয়ে আমার নিত্যকার ওঠাবসা। তবে আমি ছোট পাড়ার ব্যাংকার, অত বড় ব্যবসায়ী সমাজে আমার ভ‚মিকা হয়তো তুচ্ছতুল্য। তাই তাদের নিয়ে আমার কথা বলা হয়তো সাজে না। তবে দেশের বড় বড় শহরের জাঁদরেল ব্যাংকাররা তাদের জন্য অনেক কিছুই করেছেন, করছেন, আগামীতেও করবেন। সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংকাররা ব্যবসায়ীদের জন্য কী করেছেন, চলুন একটু সেদিকে দৃষ্টি দিই।
গত বছরের এপ্রিল থেকে ব্যাংকঋণের সুদহার ১৫ শতাংশ থেকে কমে ৯ শতাংশে নেমে আসে। সুদের হার কমানোর মূল ও প্রত্যক্ষ উদ্দেশ্য ছিল ঋণগ্রহীতাদের সুদ খরচ কমানো। এছাড়া ব্যাংকঋণে মানুষকে আগ্রহী করে তুলে মানুষকে ব্যবসা ও বিনিয়োগমুখী করে তোলাও অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল। পরোক্ষভাবে দেখলে ব্যাংকঋণে পরিচালিত শিল্পকারখানার ঋণের সুদ খরচ কমিয়ে এসব শিল্পকারখানায় উৎপাদিত পণ্যের উৎপাদন খরচ কমানো, তথা ভোক্তা পর্যায়ে দাম কমানোটাও উদ্দেশ্য। একইভাবে ট্রেডিং ব্যবসা করা পরিবেশক বা পাইকারদের কাছ থেকে কম দামে পণ্য কিনতে পারার পাশাপাশি নিজেদেরও সুদ খরচ কমে যাওয়ার সুবিধা কাজে লাগিয়ে খুচরা বিক্রেতারাও তাদের বিক্রীত পণ্যের দাম সুদ খরচ হ্রাসের সমপরিমাণ কমাবেন, এমনটাই প্রত্যাশিত ছিল। তাই এক্ষেত্রে ব্যাংকঋণের সুদহার কমানোর পরোক্ষ উদ্দেশ্য ছিল, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানো। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে কী হয়েছে বা হচ্ছে, সেটা একটু ভেবে দেখা প্রয়োজন।
বোতলজাত সয়াবিন তেলের প্রতি লিটার আগে বিক্রি হতো ১০৫ টাকা দরে। বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশনের ২০১৫ সালের এক হিসাবমতে, প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলে উৎপাদক, পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতার স্বাভাবিক লাভ যথাক্রমে চার টাকা, দুই টাকা ও দুই টাকা ধরা যায়। এই ১০৫ টাকায় তিন পক্ষের লাভ বাদ দিলে প্রতি লিটার সয়াবিন তেলের উৎপাদন খরচ পড়ে ৯৭ টাকা। তুলনামূলকভাবে ধারণা পেতে এই ৯৭ টাকা খরচের মধ্যে দুই টাকা (অর্থাৎ দুই দশমিক শূন্য ছয় শতাংশ) ব্যাংক সুদ ধরি। গত বছরের এপ্রিল থেকে সুদের হার ১৫ শতাংশ থেকে কমে ৯ শতাংশ হওয়ায় ঋণগ্রহীতা শিল্প ও ব্যবসার সুদ খরচ কমেছে প্রায় ৪০ শতাংশের কাছাকাছি। একইসঙ্গে চার শতাংশ সুদে প্রণোদনা ঋণের কথা বিবেচনা করলে সুদ খরচ প্রায় ৫০ শতাংশের কাছাকাছি কমেছে অনেকের। তাহলে প্রতি লিটার সয়াবিন তেলে সুদ খরচ এক টাকা কমে ৯৬ টাকা উৎপাদন খরচ হওয়ার কথা। উৎপাদকের পাশাপাশি তার পরিবেশকের (পাইকার) ৫০ পয়সা এবং খুচরা বিক্রেতার ৫০ পয়সা সুদ খরচও যদি কমে থাকে, তাহলে উৎপাদক, পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতার আগের মুনাফা বহাল রেখেই ১০৫ টাকার তেল ১০৩ টাকা খুচরা মূল্যে বিক্রি করলেই চলত। কিন্তু বাস্তবে তেমনটা হয়নি, যা হয়েছে সেটা হলো দাম কমার বদলে উল্টো ৩৩ শতাংশ বেশি দামে ১৪০ টাকা লিটার হিসেবে কিনতে হচ্ছে সয়াবিন তেল!
প্রতি লিটার সয়াবিন তেলের দাম দুই টাকা কমে যাওয়া উচিত ছিল বা সম্ভব ছিল, এমনটাও আমি বলি না। কারণ ঋণের সুদহার যখন ১৫-১৬ শতাংশ ছিল, তখনও বড় বড় শিল্পঋণের সুদহার সাধারণ সুদহারের চেয়ে কমই ছিল। কিন্তু পাইকার ও খুচরা বিক্রেতারা, যাদের ব্যাংক ঋণ আছে, তারা তো ৪০-৫০ শতাংশ সুদ খরচ কমার সুবিধা নিশ্চয় পেয়েছে। তাই পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতাদের সুদ খরচ কমার সুবিধা বিবেচনায় নেট মার্ক-আপ ঠিক রেখেই খুচরা মূল্য লিটারপ্রতি দু-এক টাকা কমিয়ে দেয়া যেত।
কিন্তু বাস্তবে এমনটা ঘটেনি। তাই তেলের বাজারেও এখন আগুন জ্বলছে। থেমে নেই অন্য পণ্যের বাজারও। আমার নিজ গ্রামে বাড়ি নির্মাণের জন্য গত বছরের অক্টোবরের শেষে যে রড ৫৭ হাজার টাকা টনে কিনেছি, সেই রড এক সপ্তাহ পরই নভেম্বরে আমি কিনেছি ৬২ হাজার টাকা টন দরে। তার দেড় মাস পরে কিনেছি ৬৮ হাজার টাকা টন করে! ভোগ্যপণ্য কি শিল্পপণ্য সবকিছুরই লাগামহীন ও নিয়ন্ত্রণহীন অবস্থা। ব্যাংকঋণের সুদ কমার কোনো প্রভাব যেন কোথাও নেই।
আসলে ব্যাংক ঋণভোগী শিল্প, ব্যবসায়ী ও সাধারণ ব্যক্তির একই রকম আচরণ লক্ষণীয়। দীর্ঘমেয়াদি গৃহঋণে কখনও কখনও মোট সুদ মূলধনের প্রায় সমান সমান হয়। অর্থাৎ গৃহঋণের মাসিক কিস্তির অর্ধেক মূলধন, অর্ধেক সুদ। তার মানে হচ্ছে, ১৫ শতাংশ সুদে ঋণ নিয়ে বাড়ি নির্মাণ করা বাড়িওয়ালার ১০ হাজার টাকার মাসিক কিস্তির মধ্যে পাঁচ হাজার মূলধন, পাঁচ হাজার টাকা সুদ খরচ। সুদের হার ১৫ শতাংশ থেকে কমে ৯ শতাংশ হওয়ার অর্থ হচ্ছে, সুদ খরচ ৪০ শতাংশ কমেছে। তাহলে পাঁচ হাজার টাকার ৪০ শতাংশ সুদ কমে এখন তিন হাজার টাকা হয়ে গেছে। অর্থাৎ ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে বাড়ি করা বাড়িওয়ালার এপ্রিল থেকে ঋণের কিস্তি দুই হাজার টাকা কমে আট হাজার টাকা হয়ে গেছে। এক্ষেত্রে তিনি এপ্রিল থেকে দুই হাজার টাকা বাসাভাড়া কমাতে পারতেন। কিন্তু গত বছরের এপ্রিল থেকে চলতি বছরের ফেব্রæয়ারি পর্যন্ত ১১ মাসে আমার নিজের ভাড়া বাড়ির বাড়িওয়ালাসহ কোনো বাড়িওয়ালা বাসাভাড়া কমিয়েছেন বলে আমার জানা নেই।
ব্যাংকঋণ নিয়ে যারাই শিল্পকারখানা চালাচ্ছেন, তারা কেউই সুদ খরচ কমার পরও তাদের উৎপাদিত কোনো পণ্যের দাম কমাচ্ছেন না। যারা খুচরা ও পাইকারি বিক্রেতা, তারাও কমাচ্ছেন না তাদের মুনাফার পার্সেন্টেজ। ফলে সুদ খরচ কমার সুবিধা শুধু ঋণ গ্রহীতারাই পাচ্ছেন। পরোক্ষ সুবিধা প্রাপ্ত হচ্ছে না সাধারণ ভোক্তারা। ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কমানোর বা নিয়ন্ত্রণের কোনো ম্যাকানিজমই যেন কাজ করছে না। দামের পাগলা ঘোড়া ছুটছেই।
গত বছর ইলিশের সিজনে কলকাতায় কয়েকজন মিলে শেয়ারে একটি ইলিশ কেনার খবর পত্রিকায় পড়েছি। আমাদের দেশে এতটা করুণ পরিস্থিতি তৈরি না হলেও নিত্যপণ্যের বাজারমূল্যের ক্রমাগত ঊর্ধ্বগতি সেদিকেই যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। তাই আমাদের দেশে অতি সম্প্রতি পেঁয়াজ, আদা, আলু ও কাঁচা তরকারির অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধিতে এক ব্যাংকার সহকর্মীকে আশঙ্কা প্রকাশ করে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিতে দেখেছি যে, ‘অদূর ভবিষ্যতে পেঁয়াজ, আলু ও কাঁচামরিচের মতো অতি প্রয়োজনীয় নিত্যপণ্য হয়তোবা ডিমের মতো হালি হিসেবে কিনতে হবে!’
মুক্তবাজার অর্থনীতিতে সুদের হারে হস্তক্ষেপ অসমর্থনযোগ্য। তাই ব্যাংক খাতের সুদহার নিয়ন্ত্রণে সরকারি মোড়লপনাকে অনেকেই ব্যাংক খাতের জন্য অকল্যাণকর হিসেবেই দেখছেন। তাদের মতে, ব্যাংকঋণের সুদহার আমানতের জোগান ও ঋণের চাহিদার ওপর ভিত্তি করেই নির্ধারিত হবে। তবে কারও কারও মতে, মুক্তবাজার অর্থনীতিতেও কখনও কখনও সরকারি নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন হয়। কারণ তা না হলে অসাধু ব্যবসায়ী ও মজুতদাররা পণ্যের মূল্য নির্ধারণে ডাকাতের ভ‚মিকায় অবতীর্ণ হয়। যেমনটা পেঁয়াজের ক্ষেত্রে আমরা দেখেছি, আদার ক্ষেত্রে দেখেছি; কিছুদিন আগে দেখেছি আলুর ক্ষেত্রে। এখন ভোজ্যতেলের ক্ষেত্রে। তাই কখনও কখনও দাম নির্ধারণে সরকারি হস্তক্ষেপ অনিবার্য হয়ে পড়ে।
তবে ব্যাংকঋণের সুদহার কি ওই পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল যে সরকারকে তার লাগাম টেনে ধরতে হলো? এমনটা বোধহয় নয়, কিন্তু এর পরও যেহেতু ব্যাংকঋণের সুদহারের সীমা বেঁধে দিয়ে ব্যাংককে যেভাবে সুদের হার কমাতে বাধ্য করা হয়েছে, ঠিক একইভাবে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে শিল্প, ব্যবসা ও সেবাপ্রতিষ্ঠানের মালিকদেরও সরকারি ও প্রশাসনিক তদারকির আওতায় না আনা হলে সাধারণ মানুষ ব্যাংকঋণের সুদহার কমার প্রকৃত সুবিধা ভোগ করতে পারবে না।
কিন্তু একটি প্রজ্ঞাপন এবং পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমেই কি এই নিয়ন্ত্রণ কায়েম করা যায়? বাস্তবে অনেকটা এমন উদ্যোগেই সীমাবদ্ধ থাকে বাজার নিয়ন্ত্রণ। অসাধু ব্যবসায়ীদের কারসাজি নিয়ন্ত্রণে র‌্যাবের ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলমকেই আমরা মিডিয়া ও পত্রিকায় দেখেছি এত দিন। এখন তিনিও নেই। কেউ কেউ হয়তো কাজ করছেন, কিন্তু আমাদের নজরে পড়ছে না। কিন্তু আমরা জানি, প্রতিটি উপজেলাতেই একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট থাকেন, আছেন ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারাও। কিন্তু তাদের সরব উপস্থিতি ও নিয়মিত বাজার পরিদর্শন চোখে পড়ে না। ফলে কোনো অভিযান চললেও কয়েক দিন পরেই তা শিথিল হয়ে পড়ে এবং অসাধু ব্যবসায়ীরা আবার তাদের স্বরূপে ফিরে আসে।
ওপরের অংশে উল্লেখ করেছি, সুদহার কমার উপকার পাচ্ছে কেবল ঋণগ্রহীতা ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানই। সামগ্রিক অর্থনীতি বা ভোক্তাপর্যায়ে এ সুবিধা নিশ্চিত হয়নি। পাশাপাশি অর্থনীতির কিছুটা ক্ষতিও সাধিত হচ্ছে এক অর্থে। কারণ সুদের হার কম হওয়ায় মানুষের ঋণের প্রতি ঝোঁক তৈরি হচ্ছে, অপ্রয়োজনীয় কারণে ঋণ নিতে চাচ্ছে। অন্যদিকে ভোক্তা ঋণ প্রাপ্তদের হাতে বাড়তি অর্থ চলে আসায় বিলাসী পণ্য এবং সামর্থ্যাতীত ও অপ্রয়োজনীয় পণ্যের ক্রয় বেড়ে গেছে, যা ওইসব পণ্যের দাম বাড়াতে তথা মুদ্রাস্ফীতি বাড়াতে সহায়তা করছে। তাই বিলাসী পণ্য ক্রয়ে ঋণের সুদহার কৃষি ও এসএমই ঋণের সুদহারের চেয়ে অন্তত দুই শতাংশ বেশি হওয়া উচিত। যেসব শিল্প বা ব্যবসার বিরুদ্ধে প্রতারণা এবং অনিয়মের প্রমাণিত অভিযোগ বা শাস্তি ও জরিমানার নজির পাওয়া যায়, তাদের জন্য আইন করে রেয়াতি সুদহার বন্ধ করতে হবে; বরং তাদের ঋণের সুদহারও সাধারণ সুদহারের চেয়ে অন্তত দুই শতাংশ বেশি হতে হবে।
ঋণের সুদহার কমিয়ে একটি পক্ষকে সুবিধা দিতে গিয়ে এক লাফে সুদহার প্রায় ছয় শতাংশ কমে যাওয়ায় একাধিক ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির তালিকায় যুক্ত হয়েছেন ব্যাংক ও স্বয়ং ব্যাংকাররাই। এমনিতেই করোনায় ব্যাংকের ব্যবসায় মন্দাভাব চলে এসেছে, তার ওপর ঋণের সুদহার কমে ৯ শতাংশ হয়ে যাওয়ায় ব্যাংক খাতের বার্ষিক সুদ আয় প্রায় ২৫ শতাংশ কমে গেছে। ২০২০ সালে দু-একটি ছাড়া অধিকাংশ ব্যাংকের পরিচালন মুনাফা আগের বছরের চেয়ে কমেছে। আগে ব্যাংকারদের নিজেদের জন্য যেসব ঋণ বাণিজ্যিক সুদহারের চেয়ে দু-তিন শতাংশ কমে মিলত, এখন ব্যাংকারদেরও সেসব ঋণ সাধারণ ঋণগ্রহীতার মতোই ৯ শতাংশ সুদে নিতে হচ্ছে, কমেছে কারও কারও বেতন, অনিশ্চিত হয়ে গেছে উৎসাহ বোনাস ও আর্থিক প্রণোদনা, থমকে গেছে প্রমোশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ ও নিয়মিত বিষয়গুলোও।
কয়েক লাখ ব্যবসায়ী এখন মুচকি হাসলেও ১০ কোটি আমানতকারীদের অধিকাংশেরই এখন পান্তাভাতে দিন পার করার মতো অবস্থা হয়ে গেছে। ঋণের সুদহার কমিয়ে ব্যবসায়ীদের যতটা সুবিধা দেয়া হয়েছে, ঠিক ততটাই অসুবিধায় ফেলা হয়েছে আমানতকারীদের। তাদের সুদ আয় প্রায় অর্ধেক কমে গেছে। আমানতকারীদের ব্যাংকের জীবনীশক্তি বলা হলেও বর্তমানে আমানতকারীরা একেবারেই উপেক্ষিত, তারা যেন অর্থনীতির কোনো পক্ষই নয়! কিন্তু আমানতকারীদের এমন উপেক্ষা বা অবমূল্যায়ন ব্যাংক খাতের জন্য ধ্বংসাত্মক হবে। তাই আমানতকারীদের ব্যাংকমুখী রাখতে তাদের আমানতের যোগ্য মূল্য দিতে হবে, তাদের সুদ আয় বাড়াতে হবে। তাই আমার মনে হয়, ব্যাংকঋণের সুদহার আরও দুই-তিন শতাংশ বাড়িয়ে আমানতের সুদহারও দুই-তিন শতাংশ বাড়িয়ে দেয়া যেতে পারে।

ব্যাংকার, মুক্ত লেখক