প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

ব্যাংকপাড়ায় ডলার নিয়ে লঙ্কাকাণ্ড!

নজরুল ইসলাম: ব্যাংকের চাহিদা অনুযায়ী কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলার সরবরাহ না করায় ঋণপত্র (এলসি) খোলায় বড় ধরনের সংকটে দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সার্কুলার অনুযায়ী, টাকার বিপরীতে প্রতি ডলারের দর ৮৬ টাকা ৭০ পয়সা। কিন্তু এই দরে দেশে একটি ডলারও পাওয়া যাচ্ছে না। কারণ আন্তঃব্যাংক ডলার বিনিময় দর এখন ৯৪-৯৫ টাকা। সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকগুলো এ দরে ডলার কেনাবেচা করছে। যদিও আমদানি ঋণপত্র (এলসি) খোলা হচ্ছে লোক দেখানো ৮৬ টাকা ৭৫ পয়সা বিনিময় হারে। কিন্তু এলসি নিষ্পত্তি হচ্ছে ৯৩ থেকে ৯৬ টাকা হারে। প্রয়োজনীয় ডলার বাজারে না পাওয়ায় অনেকেই সময়মতো এলসি খুলতে পারছে না বলে বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে।

জানা গেছে, পূবালী ব্যাংক এলসি নিষ্পত্তিতে ডলারের দর ধরছে ৯৫ থেকে ৯৬ টাকা। এছাড়া সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক (এসআইবিএল) ৯৪ থেকে ৯৬ টাকা, প্রিমিয়ার ব্যাংক ৯৪ থেকে ৯৫ টাকা, এক্সিম ব্যাংক ৯৪ থেকে ৯৫ টাকা এবং এনসিসি ব্যাংক ৯২ থেকে ৯৪ টাকায় এলসি নিষ্পত্তি করছে। ব্যাংকাররা বলছেন, ডলার সরবরাহে ফরেন একচেঞ্জ শাখার কর্মকর্তাদের নাভিশ্বাস উঠে যাচ্ছে। এলসি খোলা এখন বড়ই দুঃসাধ্য। 

বেসরকারি একটি বড় ব্যাংকের করপোরেট শাখার ব্যবস্থাপক বলেন, ‘বাজে অবস্থা চলছে। আমার ব্যাংকিং ক্যারিয়ারে এরকম অবস্থা দেখিনি। এলসি খুলতে না পারলে ব্যাংক ব্যবসা করতে পারবে না। পাশাপাশি বড় গ্রাহক হারাবে।’

আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ব্রিজ কেমিক্যাল লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাজমুল করিম বলেন, ‘রপ্তানি বাণিজ্যে ডলারের দর ৮৬ টাকা ৭০ পয়সা। আর আমদানি বাণিজ্যে ডলারের দর ৯৬ টাকা। এটা এক উদ্ভট বিষয়। আমদানি করতে গেলে এলসি খোলার সময় প্রতি ডলারের বিপরীতে অতিরিক্ত ৯ টাকা বেশি দিতে হচ্ছে। তারপর রয়েছে এলসি মার্জিনের কড়াকড়ি। অনেক পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে এলসির বিপরীতে ৫০ থেকে ৭৫ শতাংশ নগদ টাকা আগেই জমা দেয়ার নির্দেশনা জারি করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এত কড়াকড়ির মধ্যে ব্যবসা করা কঠিন। এছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যভেদে দাম বেড়েছে সর্বোচ্চ ৩০০ শতাংশ। এ অবস্থায় আগের চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি পুঁজি খাটিয়ে ব্যবসা করতে হচ্ছে।’

ইলেকট্রনিক্স পণ্য আমদানিকারক সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘রোজার আগে এলসি খুলেছি ৮৭ টাকা দরে। এখন তা ৯৫ টাকা। এক ডলারের বিপরীতে এক মাসের ব্যবধানে বাড়তি অর্থ গুনতে হচ্ছে ৭ থেকে ৮ টাকা। এছাড়া এলসি মার্জিনের কড়াকড়ি রয়েছে। সব মিলিয়ে আমদানি পণ্যে খরচ বাড়বে ২০ থেকে ২৫ শতাংশ। এখন ভোক্তা পর্যায়ে দাম বাড়বে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ।’

এ ব্যাপারে বিকেএমইএ’র নির্বাহী সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম শেয়ার বিজকে বলেন, ‘এক আমদানিকারক আমাকে জানিয়েছেন, আমদানি এলসি খোলার ক্ষেত্রে এক ডলারের বিপরীতে ব্যাংক ৯৫ টাকা নিচ্ছে। আর রপ্তানির ক্ষেত্রে এক ডলার ভাঙিয়ে পাওয়া যাচ্ছে ৮৫ টাকা ৮৫ পয়সা। অন্যদিকে ব্যাংক আমাকে বলছে, রপ্তানির বিপরীতে ডলারপ্রতি তারা ৮৫ টাকা ৪৯ পয়সা দেবে। ঈদের আগে ব্যাংকগুলো দিচ্ছিল ৮৫ টাকা পাঁচ পয়সা থেকে ১২ পয়সা। রেমিট্যান্স যারা পাঠাচ্ছিল তাদের দেয়া হয়েছিল সর্বোচ্চ ৮৫ টাকা ৩০ পয়সা। ডলারের দর বৃদ্ধিতে বাংলাদেশের কোনো নাগরিক লাভবান হচ্ছে না বরং জনগণ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। শুধু লাভবান হচ্ছে ব্যাংক।’

এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ইএবি) সভাপতি আব্দুস সালাম মূর্শেদী শেয়ার বিজকে বলেন, ‘আমরা সবাই কাঁচামাল আমদানি করছি,  প্রক্রিয়া করছি। সেগুলো দিয়ে পণ্য তৈরি করছি। বিদ্যুৎ বিল দিচ্ছি, শ্রমিকের মজুরি দিচ্ছি। তাই আমদানি-রপ্তানিতে ডলারের দর একই থাকা উচিত। ভারতে অকটেন এখনই ১১১ টাকা। সেই হিসেবে আমাদের এখানেও দাম বাড়বে। আমাদের আমদানিও লাগবে, রপ্তানিও লাগবে। আমদানি-রপ্তানির ক্ষেত্রে ডলারের দর একই থাকা উচিত।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘বর্তমানে আমাদের আমদানি ব্যয়বহুল হয়ে গেছে। অন্যদিকে রপ্তানির ক্ষেত্রে মূল্য সংযোজন তেমন বাড়েনি। এক্ষেত্রে আমদানি হয়ে পড়েছে অনেকটা মূল্যনির্ভর। আর রপ্তানি পরিণত হয়েছে পণ্যের পরিমাণনির্ভর খাতে। এতে করে আমাদের তৈরি পোশাকসহ অন্যান্য রপ্তানিমুখী খাতের উদ্যোক্তাদের সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। কারণ তাদের একদিকে কাঁচামাল ও মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানিতে বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে, অন্যদিকে পণ্য রপ্তানি করে তারা বাড়তি অর্থ তুলে নিতে পারছেন না।’

তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমানে আমদানি এলসি খোলা ও রপ্তানি মূল্য টাকায় রূপান্তর প্রক্রিয়ায় মুদ্রার বিনিময় মূল্যের পার্থক্য প্রায় ৯ টাকা। এই ব্যবধান নজিরবিহীন। এটা কোনোভাবেই কাম্য নয়। এ পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার জন্য অনেক আগেই উদ্যোগ নেয়া উচিত ছিল। তারপরও বাংলাদেশ ব্যাংক গত মঙ্গলবার বিলাস পণ্য আমদানি করার ক্ষেত্রে যে মার্জিন নির্ধারণ করে দিয়েছে, তা ইতিবাচক। এ ধরনের উদ্যোগ ডলারের বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হবে।’

এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি বেসরকারি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শেয়ার বিজকে বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংক ডলারের দাম নির্ধারণ করে দিলেও এটা চাহিদা ও সরবরাহের (ডিমান্ড অ্যান্ড সাপ্লাই) ওপর নির্ভর করে। মার্কেটে প্রকৃতপক্ষে ডলারের দাম ৯০ টাকার ওপরে। এ কারণেই এলসি খোলার সময় আমদানিকারকদের বেশি মূল্য গুনতে হয়। তাছাড়া আমদানি এবং রপ্তানিকারকদের ডলারের মূল্যে সব সময় কিছু না কিছু পার্থক্য থাকে।