প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

ব্যাংকারদের পুনর্বহালের নির্দেশনা উপেক্ষিত

জয়নাল আবেদিন: দেড় বছর আগে ব্যাংকের চাকরি হারিয়ে দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন শাহরিয়ার (ছদ্মনাম)। পুনর্বহালের আশায় আবেদন করেও কার্যত কোনো লাভ হয়নি। ঊর্ধ্বতন পর্যায় থেকে চাকরি হারানোয় যেতে পারছেন না অন্য ব্যাংকেও। বাধ্য হয়ে পদত্যাগ করা শাহরিয়ার এখন দিশাহারা। পুনর্বহাল প্রক্রিয়া শুরু হলেও ডাক আসছে না তার মতো হাজারো ব্যাংকারের। এ প্রক্রিয়া আর কতদিন দীর্ঘায়িত হবে, সে প্রশ্নের উত্তর এখনও অজানা।

কভিডকালে খরচ কমাতে কর্মকর্তাদের চাকরি ছাড়তে বাধ্য করেছে অনেক ব্যাংক। কিন্তু অর্থনীতি রক্ষার খাতিরে কর্মীদের এভাবে নিরুৎসাহিত না করার নির্দেশ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এর পরও এ কার্যক্রম ত্বরান্বিত করার জন্য ব্যাংকগুলোকে চিঠি দেয়া হয়েছে। কিছু ব্যাংক এ নির্দেশনা পরিপালন করে কর্মীদের পুনর্বহাল করতে শুরু করেছে। তবে এখনও বিবেচনায় নেয়নি একাধিক ব্যাংক। চাকরিতে পুনর্বহালে একাধিকবার আবেদন করেও কোনো উত্তর পাননি অনেক ব্যাংকার।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কভিডের শুরুর দিকে চাকরি হারিয়ে তারা সংকটে জীবন-যাপন করছেন। তাদের দ্রুত পুনর্বহালের ব্যবস্থা করা উচিত ছিল। কিন্তু কী কারণে এ কাজে গতি নেই, সেটা তদন্ত করে দেখা উচিত। ব্যাংকাররা বলছেন, যেসব কর্মকর্তাকে দুর্নীতির দায়ে চাকরিচ্যুত করা হয়েছিল, তারাও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ নির্দেশনার সুযোগ নিতে চাচ্ছে। ব্যাংক বরাবর আবেদন করে তারাও চাকরিতে পুনর্বহাল হতে চায়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এরই মধ্যে কর্মীদের নাম উল্লেখ করে ব্যাংকগুলোয় চিঠি পাঠিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। যেসব কর্মকর্তা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি অ্যান্ড কাস্টমার সার্ভিসেস ডিপার্টমেন্টে (এফআইসিএসডি) অভিযোগ করেছেন, তাদের পুনর্বহালের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

জানতে চাইলে অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি) চেয়ারম্যান ও ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম আরএফ হোসেন শেয়ার বিজকে বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা সব ব্যাংকেরই পরিপালন করা উচিত। চাকরি হারানো কর্মীদের আরও একটি সুযোগ দেয়া উচিত বলে আমি মনে করি। তিনি বলেন, এরই মধ্যে আমাদের ব্যাংক আবেদনের ভিত্তিতে ৭০ কর্মীকে পুনর্বহাল করেছে। তবে যারা ২০১৯ সালে চাকরি হারিয়েছেন, তাদেরও আবেদন করতে দেখা যাচ্ছে। করোনার আগে যারা দুর্নীতির দায়ে চাকরি হারিয়েছেন, তাদের পুনর্বাহল করা হবে না বলেও জানান এবিবি চেয়ারম্যান।

মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও এবিবির সাবেক চেয়ারম্যান শেয়ার বিজকে বলেন, আমরা পুনর্বহাল প্রক্রিয়া শুরু করেছি। গত মাসে ব্যাংক ক্লোজিং নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম। তবে আমাদের মানবসম্পদ বিভাগ (এইচআর) বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম বলেন, করোনায় যারা চাকরি হারিয়েছেন তাদের পুনর্বহালের নির্দেশনা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কিছু ব্যাংক তা পরিপালন করছে। তবে যারা নির্দেশনা অমান্য করছে, তাদের ব্যাংকে পরিদর্শন করা হবে। পাশাপাশি পরিদর্শন প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে।

প্রসঙ্গত, গত ১৬ সেপ্টেম্বর এক প্রজ্ঞাপনে বাংলাদেশ ব্যাংক উল্লেখ করে, প্রমাণিত কোনো অভিযোগ ছাড়া এখন থেকে ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাকরিচ্যুত করা যাবে না। করোনার এ সময়ে শুধু লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ বা অদক্ষতার কারণ দেখিয়েও কাউকে ছাঁটাই করা যাবে না। আর অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পরও করোনার এ সময়ে যাদের চাকরি থেকে বাদ দেয়া হয়েছে, আবেদন সাপেক্ষে তাদের পুনর্বহাল করতে হবে। শুধু তাই নয়, ২০২১ সালের শেষ দিকে ব্যাংকগুলোকে চিঠি দিয়ে কর্মীদের পুনর্বহালের নির্দেশনা দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। তারপরও কিছু ব্যাংক তা কর্ণপাত করছে না।

ওই প্রজ্ঞাপনে আরও বলা হয়, করোনার এ সংকটময় পরিস্থিতিতে ব্যাংক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাকরিচ্যুত করা হলে কর্মীদের মাঝে আতঙ্ক সৃষ্টি হবে। একই সঙ্গে মনোবল ও কর্মস্পৃহা কমবে। ভবিষ্যতে মেধাবী ও অভিজ্ঞরা ব্যাংকে যোগদানে অনীহা দেখাবে, দীর্ঘমেয়াদে ব্যাংক খাতের জন্য যা ক্ষতিকর হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এ রকম প্রেক্ষাপটে প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা এবং কর্মস্পৃহা অটুট রাখার স্বার্থে এসব নির্দেশনা দেয়া হলো। এরপর ভুক্তভোগীরা সংশ্লিষ্ট ব্যাংকে আবেদন করেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো ব্যাংক এ বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করেনি।

সূত্রমতে, ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক, চেয়ারম্যান আবার গভর্নরের দপ্তরে চিঠি দিয়েও কোনো সুফল পাননি হাজারও ভুক্তভোগী। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে হতাশাগ্রস্ত এসব ব্যাংকার উল্লেখ করেন, ‘দীর্ঘদিন যাবৎ সুখে-দুঃখে ব্যাংকের সঙ্গে ছিলাম। অনেকেই বিভিন্ন সময়ে বিভাগীয় প্রধান, শাখা ব্যবস্থাপক, জোনাল হেডসহ বিভিন্ন উচ্চপদে দায়িত্ব পালন করে এসেছি। বর্তমানে প্রায় সবাই চাকরিজীবনের মাঝামাঝি কিংবা শেষ প্রান্তে। প্রত্যেকের সন্তানেরা বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত। অনেকের গৃহনির্মাণসহ অন্যান্য ঋণের কিস্তি চলমান রয়েছে, যা বেতন-ভাতা থেকে নির্বাহ করি।’

‘কিন্তু দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে, করোনার এ সময়ে অযৌক্তিক, অন্যায় ও অমানবিকভাবে ব্যাংকের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ এবং শাখাপ্রধানসহ মধ্যম ও উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের টার্মিনেট করা, সার্ভিস বেনিফিটসহ আর্থিক সুবিধাদি থেকে বঞ্চিত করাসহ নানা ধরনের হুমকি ও ভয়-ভীতি দেখিয়ে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে।’

‘করোনার এ সময়ে যখন অন্যত্র চাকরি পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই, তখন কেউ-ই যে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করিনি বা পদত্যাগের নোটিস প্রদান করিনি, তা সহজেই বোধগম্য। এরই মধ্যে প্রত্যেক ভুক্তভোগী চাকরি পুনর্বহালে একাধিকবার পৃথক আবেদন করেছি, কিন্তু কোনো সাড়া পাচ্ছি না। এ অবস্থায় আমাদের আবেদনÑসবাইকে সসম্মানে পুনর্বহাল করা হোক।’

মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের একাধিক ভুক্তভোগী ব্যাংকার বলেন, চাকরি ফেরত পেতে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি আবেদন করেছি, কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো সাড়া পাইনি।

যমুনা ব্যাংকের কয়েকজন ভুক্তভোগী ব্যাংকার জানান, করোনার এ সময়ে প্রায় ২০০ কর্মকর্তাকে ছাঁটাই করেছে এবং বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়েছে যমুনা ব্যাংক। গত সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে চাকরি ফেরতের জন্য আবেদন করেছি। এখন পর্যন্ত কোনো সাড়া মেলেনি। সম্প্রতি দ্বিতীয়বারের মতো আবেদন করেছেন যমুনা ব্যাংকের ওইসব কর্মকর্তা। এরই মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংককেও জানিয়েছি।

একইভাবে ওয়ান ব্যাংকের দুই ভুক্তভোগী কর্মকর্তা জানিয়েছেন, চাকরি ফেরতের জন্য আবেদন করেছেন, কিন্তু এখনও কোনো সাড়া মেলেনি।

প্রসঙ্গত, ব্যাংকারদের অভিযোগের ভিত্তিতে বাংলাদেশ ব্যাংক গত বছর বেসরকারি খাতের ছয়টি ব্যাংকে কর্মী ছাঁটাইয়ের বিষয়ে বিশেষ পরিদর্শন করে। এতে উঠে আসে, ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২১ সালের আগস্টের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত এসব ব্যাংকের মোট তিন হাজার ৩১৩ কর্মকর্তা চাকরি ছেড়েছেন।