প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

সুদ আয়ের অনুপাত বাড়ছে

ব্যাংকের পরিচালন মুনাফায় নিট

শেখ আবু তালেব: ব্যাংকের প্রধান আয়ের উৎস সুদ। গত পাঁচ বছরে এই আয়ের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে ব্যাংকগুলোর। মূলত তহবিল ব্যবস্থাপনা খরচ কমিয়ে আনা, গ্রাহকদের বেশি সুবিধা দিতে প্রতিযোগিতা এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের নজরদারি বেড়ে যাওয়ায় এই হার বাড়ছে। ফলে গত পাঁচ বছর ধরেই ব্যাংক খাতের পরিচালন আয়ে সুদ আয়ের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতায় রয়েছে। বর্তমানে এই অনুপাত হচ্ছে ৫০ শতাংশ।
ব্যাংক খাতের গত পাঁচ বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করে পাওয়া গেছে এমন তথ্য। এ-সংক্রান্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৪ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে পরিচালন আয়ের সঙ্গে নিট সুদ আয়ের অনুপাত ছিল ৩০ শতাংশের একটু বেশি। এরপরের দুই বছর তা কিছুটা কমেছিল। কিন্তু ২০১৬ সালের জুন থেকেই এই হার বৃদ্ধি পেতে থাকে। এই সময়ে তা ছিল ৬০ শতাংশে। ২০১৭ সালে তা আবার কমে ৪৫ শতাংশে ও ২০১৮ সাল শেষে বেড়ে ৫০ শতাংশে উন্নীত হয়।
পাঁচ বছর আগে পরিচালন আয়ের ৭০ শতাংশই ছিল সুদবহির্ভূত আয়। এখন তা অর্ধেকে নেমে এসেছে। তথ্য বলছে, পরিচালন মুনাফার অর্ধেকই এখন সুদ আয় থেকে আসছে।
জানা গেছে, একেক ব্যাংক পরিচালন ব্যয়ের হিসাব একেক পদ্ধতিতে করে। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সিদ্ধান্ত নিয়েছে সব ব্যাংকের তহবিল ব্যয় ব্যবস্থাপনায় অভিন্ন সূত্র ব্যবহƒত হবে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক নীতিমালা প্রণয়নের কাজ করছে। এসব বিষয়ে ব্যাংকের পরিচালন ব্যয় কমে যাচ্ছে। অন্যদিকে ব্যাংক খাতে ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ থেকে সুদ আয় হওয়ায় পরিচালন মুনাফায় খাতটির নির্ভরতাও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
সুদ আয় বৃদ্ধির বিষয়ে বেসরকারি খাতের একটি ব্যাংকের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও) নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বর্তমানে ব্যাংকের হিসাব পদ্ধতিতে অনেক স্বচ্ছতা আসছে। ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে বছর শেষ হলেই। এজন্য সুদ আয়ও বৃদ্ধি পাচ্ছে। অন্যদিকে খেলাপি ঋণ থেকে আদায় কিছুটা হলেও বৃদ্ধি পাচ্ছে, তা যোগ হচ্ছে সুদ আয়ে। সম্প্রতি আমদানি বাণিজ্য কিছুটা কমে যাওয়ায় এ খাত থেকে ব্যাংকের আয়ও কমছে। অনলাইন সার্ভিসের একটি অংশ ফ্রি দেওয়া হচ্ছে। এতে সুদবহির্ভূত আয় কমছে ব্যাংকের। ফলে পরিচালন মুনাফায় সুদ আয়ের পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে।
প্রসঙ্গত, ব্যাংকের তহবিল ব্যবস্থাপনা ব্যয়, প্রকৃত মুনাফা ও পরিচালন মুনাফা হিসাব করা হয় বছর শেষে। যদিও ছয় মাস অন্তর বাংলাদেশ ব্যাংক এ-সংক্রান্ত বিষয়ে একটি খসড়া প্রতিবেদন তৈরি করে। কিন্তু চূড়ান্ত প্রতিবেদন তৈরি করে বছর শেষে। এই সময়ে আর্থিক ব্যবস্থার চূড়ান্ত হিসাব করা হয়। এজন্য কোনো ব্যাংকের পরিচালন মুনাফার সঙ্গে নিট সুদ আয়ের অনুপাত বছর শেষেই পাওয়া যায়।
ব্যাংক গ্রাহকদের কাছ থেকে সুদের বিনিময়ে আমানত সংগ্রহ করে। এই আমানত বিভিন্ন খাতে ঋণ হিসেবে দেয়। এর ব্যবস্থাপনায় ব্যাংকের একটি খরচ হয়। এই খরচের সঙ্গে মুনাফা যোগ করেই ব্যাংকঋণ দেয়। বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, কোনো বাংকের আমানত সংগ্রহ ও ঋণ দেওয়ার সুদ হারের মধ্যে ব্যবধান চার শতাংশীয় পয়েন্টের বেশি হবে না। অর্থাৎ স্প্রেড হতে হবে চার শতাংশ। যদিও অনেক ব্যাংকই তা মানছে না।
এদিকে ব্যাংকগুলো ঋণ সুদ থেকে আয়ের পাশাপাশি বিনিয়োগ আয়, বিভিন্ন সেবার বিপরীতে সার্ভিস চার্জ ও আমদানি-রফতানি বাণিজ্য থেকে কমিশন চার্জ পায়। এসব খাত থেকে প্রাপ্ত আয় পরিচালন আয়ে যোগ হয়। এ থেকে খরচ হিসেবে আমানত সুদ ব্যয় ও প্রশাসনিক খরচ বাদ যায়। এরপর যা থাকে তা হচ্ছে ব্যাংকের চূড়ান্ত পরিচালন মুনাফা।
বর্তমানে ব্যাংকগুলা ৯ থেকে ১২ শতাংশ সুদে আমানত সংগ্রহ করছে। এর সঙ্গে আরও চার শতাংশ পরিচালন ব্যয় যোগ হবে। ফলে ব্যাংকগুলোকে সর্বোচ্চ ১৬ শতাংশ সুদে ঋণ দিতে হবে। বর্তমানে রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলো এক অঙ্কে ঋণ দিতে পারছে মাত্র। কিন্তু বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলো এখনও দুই অঙ্কে ঋণ দিচ্ছে।
কারণ হিসেবে ব্যাংকাররা বলছেন, ব্যাংকের তহবিল ব্যয় ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সঙ্গতি রেখেই ঋণের সুদহার নির্ধারণ হয়। বর্তমানে ব্যাংকগুলোর তহবিল ব্যয় ব্যবস্থাপনা গড়ে ১০ শতাংশের মতো।
এক সময়ে ব্যাংকগুলো পরিচালন ব্যয়ে ছলচাতুরির আশ্রয় নিত। বিলাসী গাড়ি, আসবাব, ব্যাংকের শাখায় উচ্চ ব্যয় দেখিয়ে পরিচালন ব্যয় অনেক বেশি দেখানো হতো। ফলে চূড়ান্ত আয় কমে যেত। এসব বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের হস্তক্ষেপে তহবিল ব্যয় ব্যবস্থাপনায় অনেকটা নিয়ন্ত্রণ চলে এসেছে। গাড়ি ও আসবাব এবং শাখা স্থাপনের খরচে লাগাম টেনেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে ব্যাংক খাতে আমানতের পরিমাণ ছিল আট লাখ ৪০ হাজার ২৬৮ কোটি টাকা। ওই সময়ে ঋণের স্থিতি ছিল আট লাখ ৮৩ হাজার ৪১৬ কোটি টাকা। আর গত জুলাই শেষে আমানতের পরিমাণ দাঁড়ায় ১০ লাখ ৭১ হাজার ২৪ কোটি টাকা। আর ঋণের স্থিতি দাঁড়ায় ১২ লাখ ১০ হাজার ৩৬৬ কোটি টাকা।

সর্বশেষ..