প্রচ্ছদ শেষ পাতা

ব্যাংকের সিএসআর ব্যয়ের অর্ধেক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায়

জানুয়ারি-জুন প্রতিবেদন প্রকাশ

শেখ শাফায়াত হোসেন: চলতি বছরের শুরুতে আগাম কালবৈশাখী ঝড় ও বছরের মাঝামাঝি সময় সৃষ্ট বন্যায় উত্তরাঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ফসলহানির পাশাপাশি অনেক মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় প্রতিষ্ঠানের সামাজিক দায় (সিএসআর) থেকে ব্যাংকগুলোকে অর্থ সহায়তার পাশাপাশি ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করতে নির্দেশ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এতে ব্যাংকগুলো দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করে।
প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত সময়ে ব্যাংকগুলো তাদের সিএসআর ব্যয়ের ৫১ দশমিক ১৩ শতাংশ ব্যয় করেছে জলবায়ু ঝুঁকি তহবিলে। আলোচ্য সময়ে ব্যাংকগুলো সিএসআরে মোট ব্যয় করেছে ২৩৯ কোটি ৩৩ লাখ টাকা।
জানা গেছে, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশ এ দুটি খাতকে জলবায়ু ঝুঁকি তহবিল খাত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। টাকার অঙ্কে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় ব্যাংকগুলো ব্যয় করেছে ১১৯ কোটি তিন লাখ টাকা (মোট সিএসআরের ৪৯ দশমিক ৭৩ শতাংশ)। পরিবেশ উন্নয়ন খাতে ব্যয় করেছে তিন কোটি ৩৪ লাখ টাকা।
তথ্য ঘেঁটে দেখা যায়, গত জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ব্যাংকগুলো শিক্ষা খাতে ৫৬ কোটি সাত লাখ টাকা ব্যয় করেছে, যা তাদের মোট সিএসআর ব্যয়ের ২৩ দশমিক ৪৩ শতাংশ। আলোচিত সময়ে শিক্ষা খাতে সিএসআর থেকে সবচেয়ে বেশি ব্যয় করেছে ডাচ্-বাংলা ব্যাংক, ২৯ কোটি ২৫ লাখ টাকা।
গত দুই-তিন মাস ধরে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গুর প্রকোপ দেখা দেওয়ায় ডেঙ্গু রোগীদের সিএসআর থেকে সহায়তা প্রদানের নির্দেশনা দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, গত জুন পর্যন্ত স্বাস্থ্য খাতে ২৩ কোটি ২৮ লাখ টাকা ব্যয় করে দেশে ব্যাংকগুলো। কয়েকটি ব্যাংককে তাদের সিএসআর কার্যক্রমের অংশ হিসেবে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর একটি অংশকে মশারি কিনে দিতেও দেখা গেছে। স্বাস্থ্য খাতে ব্যাংকগুলো তাদের সিএসআরের ৯ দশমিক ৮৯ শতাংশ ব্যয় করে।
সামগ্রিকভাবে সবচেয়ে বেশি সিএসআর ব্যয় করেছে ডাচ্-বাংলা ব্যাংক। গত জুন পর্যন্ত ছয় মাসে এই ব্যাংকটি সিএসআরে ব্যয় করেছে ৪৬ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। এর পরেই আছে এক্সিম ব্যাংক। এই ব্যাংকটি সিএসআরে ব্যয় করেছে ৪১ কোটি ৯ লাখ টাকা। এককভাবে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা খাতে সবচেয়ে বেশি ব্যয় করেছে এক্সিম ব্যাংক, ৩৪ কোটি ৯৩ লাখ টাকা।
জানতে চাইলে এক্সিম ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ড. মোহাম্মদ হায়দার আলী মিয়া শেয়ার বিজকে বলেন, ‘মুনাফা করাই আমাদের একমাত্র উদ্দেশ্য নয়, প্রতিষ্ঠানের সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে সহযোগিতা করাও শরিয়াহ্ভিত্তিক ব্যাংকের একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য। তাছাড়া আমাদের ব্যাংকের পরিচালকরাও সিএসআরের বিষয়ে খুবই উদার ভূমিকা রাখছেন। এ কারণে সিএসআর খাতে আমরা অনেক ব্যাংকের চেয়ে এগিয়ে আছি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আমরা শীর্ষে আছি।’
সিএসআর ব্যয়ে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে মার্কেন্টাইল ব্যাংক। গত জুন পর্যন্ত এ ব্যাংকটি ব্যয় করেছে ১৫ কোটি ১৭ লাখ টাকা। এর মধ্যে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় ব্যয় হয়েছে ১১ কোটি ১৭ লাখ টাকা।
এরপরই রয়েছে শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংক। আলোচিত সময়ে এ ব্যাংকটি সিএসআরে ব্যয় করেছে ১২ কোটি ১৫ লাখ টাকা।
এরপর রয়েছে এনসিসি ব্যাংক। গত জুন পর্যন্ত এই ব্যাংকটি সিএসআরে ব্যয় করেছে ১১ কোটি চার লাখ টাকা।
আলোচিত সময়ে বাংলাদেশ ইসলামী ব্যাংক আট কোটি ৮৪ লাখ টাকা, ইউসিবিএল আট কোটি ৭৬ লাখ টাকা, ব্যাংক এশিয়া আট কোটি ১৬ লাখ টাকা, প্রাইম ব্যাংক আট কোটি ১৩ লাখ টাকা, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক ছয় কোটি ৬৪ লাখ টাকা, যমুনা ব্যাংক পাঁচ কোটি ৯৯ লাখ টাকা, ন্যাশনাল ব্যাংক পাঁচ কোটি ৮১ লাখ টাকা, আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক পাঁচ কোটি ৬৮ লাখ টাকা, পূবালী ব্যাংক পাঁচ কোটি ৫৫ লাখ টাকা সাউথইস্ট ব্যাংক পাঁচ কোটি ৩৯ লাখ টাকা, স্ট্যার্ন্ডার্ড ব্যাংক পাঁচ কোটি ২৯ লাখ টাকা, প্রিমিয়ার ব্যাংক পাঁচ কোটি ১৪ লাখ টাকা সিএসআর খাতে ব্যয় করেছে।
তথ্য ঘেঁটে দেখা যায়, আলোচিত সময়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় ১৭টি ব্যাংক সিএসআর থেকে কোনো ব্যয় করেনি। এই ব্যাংকগুলো হলো অগ্রণী ব্যাংক, বেসিক ব্যাংক, বিডিবিএল, কৃষি ব্যাংক, রাকাব, প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক, কমার্স ব্যাংক, কমিউনিটি ব্যাংক (সদ্য চালু হয়েছে), আইসিবি ইসলামী ব্যাংক, পদ্মা ব্যাংক, সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, ব্যাংক আল ফালাহ, কমার্শিয়াল ব্যাংক অব সিলন, হাবিব ব্যাংক, এইচএসবিসি, ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান, স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক ও উরি ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাসটেইনেবল ফাইন্যান্স ডিপার্টমেন্টের তৈরি করা সিএসআর-সংক্রান্ত ষাণ¥াসিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যাংকগুলোর জমা দেওয়া সিএসআর প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার আওতায় প্রধানত শীতার্তদের কম্বল বিতরণ, বন্যাদুর্গতদের সহায়তা প্রদান এবং অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য সহায়তা দেওয়া হয়। এর বেশিরভাগ ব্যয়ই প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলের মাধ্যমে ব্যয় করা হয়। ব্যাংকগুলো নিজস্ব ব্যবস্থাপনায়ও এ খাতে ব্যয় করেছে।
পরিসংখ্যান ঘেঁটে দেখা যায়, এর আগের ষাণ¥াসিকে ব্যাংকগুলো সিএসআরে ব্যয় করেছিল ২৭৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা। এর মধ্যে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় ব্যয় হয়েছিল ৮৪ কোটি তিন লাখ টাকা, যা ছিল ওই সময়ে মোট সিএসআর ব্যয়ের ৩০ দশমিক ২৮ শতাংশ।
অন্যদিকে গত জানুয়ারি-জুন সময়ে ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে মাত্র ১৮টি প্রতিষ্ঠান মোট এক কোটি পাঁচ লাখ টাকা সিএসআরে ব্যয় করেছে। বাকি আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো এ খাতে কোনো ব্যয় করতে পারেনি।

সর্বশেষ..