দিনের খবর প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

ব্যাংকের ১৩৫ কোটি টাকা বকেয়া রেখে এমডি লাপাত্তা!

চট্টগ্রামের লিজেন্ড গ্রুপ

সাইফুল আলম, চট্টগ্রাম: চট্টগ্রামের খেলাপি ব্যবসায়ী এসএম আবদুল হাই। তিনি লিজেন্ড গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি)। ব্যবসার প্রয়োজনে তিনি ঋণ নিয়েছিলেন সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেডের (এসআইবিএল) আগ্রাবাদ শাখা থেকে। ব্যাংকে দেওয়া গ্রাহকের ব্যবসায়িক ঠিকানা আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকার আসসালাম টাওয়ারের ১১ তলায়, যদিও সেই ঠিকানায় আছে এশিয়াটিক স্ট্যান্ডার্ড অয়েল লিমিটেড। অর্থাৎ ভুয়া ঠিকানার গ্রাহকের কাছে সোস্যাল ইসলামী ব্যাংকে খেলাপি পাওনা ১৩৫ কোটি টাকা। অপরদিকে তার বিরুদ্ধে থাকা বিভিন্ন ব্যাংকের চেক ও ঋণখেলাপির মামলা ও অভিযোগে গত দুই বছর ধরে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাকে খুঁজছে।

এসআইবিএল সূত্রে জানা যায়, ব্যাংকটির আগ্রাবাদ শাখা থেকে লিজেন্ড গ্রুপের কর্ণফুলী ইপিজেডের লিজেন্ড ট্রেক্সটাইল লিমিটেড এবং মাইলস ফেব্রিক্স লিমিটেডের নামে ঋণ নেওয়া হয়। প্রথমদিকে পাওনা পরিশোধ করলেও পরে অনিয়মিত হয়ে পড়ে ঋণের কিস্তি পরিশোধ। প্রতিষ্ঠান দুটির নামে নেওয়া ঋণ চলতি মাসের ১০ তারিখে খেলাপি হয়ে পড়ে। এ সময়ে লিজেন্ড গ্রুপের দুই সহযোগী প্রতিষ্ঠানের কাছে সুদাসলে মোট পাওনা দাঁড়ায় ১৩৫ কোটি ১৬ লাখ টাকা। আর এ পাওনা আদায়ে বেশ কয়েকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি বা তার প্রতিনিধিরা তেমন আগ্রহ দেখাননি।

এতে আইনানুসারে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ঋণের বিপরীতে বন্ধকিতে থাকা চট্টগ্রামের দক্ষিণ পতেঙ্গায় বিপুল পরিমাণে সম্পত্তি নিলামে বিক্রয়ে আগ্রহী ক্রেতা খুঁজছে। ব্যাংকটির আগ্রাবাদ শাখায় আগামী ১৫ মার্চ এসব সম্পত্তির নিলাম কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হবে।

সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড আগ্রাবাদ শাখা ব্যবস্থাপক সৈয়দ মোহাম্মদ সোহেল শেয়ার বিজকে বলেন, আবদুল হাইয়ের মালিকানাধীন লিজেন্ড টেক্সটাইল লিমিটেড এবং মাইলস ফেব্রিক্স লিমিটেডের কাছে আমাদের খেলাপি পাওনা আছে ১৩৫ কোটি টাকা, যা আদায়ে আমরা ঋণের বিপরীতে থাকা বন্ধকি সম্পত্তি নিলামে বিক্রয়ে উদ্যোগ নিয়েছি। তিনি ঋণ রি-শিডিউলের জন্য কোনো আবেদনও করেননি।

ব্যবসায়িক অদক্ষতা, ব্যর্থতা ও অনভিজ্ঞতায় তিন বছর আগে লিজেন্ড গ্রুপের এমডি খেলাপি হয়েছেন ন্যাশনাল ব্যাংক লিমিটেড আগ্রাবাদ শাখায়। এরপর একে একে এবি ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক ও সাউথ ইস্ট ব্যাংকে খেলাপি হন তিনি। আর এসব পাওনা আদায়ে গত দুই বছর ব্যাংক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাকে খুঁজে পাচ্ছে না। তার আগেই তিনি আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকায় আসসালাম টাওয়ারের ১১ তলার লিজেন্ড গ্রুপের অফিস সরিয়ে নেন।

ওই বাণিজ্যিক ভবনের কেয়ারটেকার ছগীর বলেন, লিজেন্ড গ্রুপ তো অফিস চার বছর আগে ছেড়ে চলে যায়। কিন্তু বিভিন্ন ব্যক্তি এ গ্রুপের খোঁজে এখনও এখানে আসে।

একাধিক বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি এলাকার বাসিন্দা এসএম আবদুল হাই কেডিএস গ্রুপের চেয়ারম্যান খলিলুর রহমানের জামাতা। আর খলিলুর রহমান ন্যাশনাল ব্যাংকের একজন উদ্যোক্তা পরিচালক। অর্থাৎ তার ব্যাংকের ঋণখেলাপি তালিকায় আছেন তার জামাতা এসএম আবদুল হাই।

আবদুল হাইয়ের মালিকানাধীন দুটি প্রতিষ্ঠানের কাছে ন্যাশনাল ব্যাংক আগ্রাবাদ শাখার মোট পাওনা প্রায় ১৭৮ কোটি টাকা। শুধু ন্যাশনাল ব্যাংক নয়, সাউথ ইস্ট ব্যাংকের পাওনা আছে ১৪৬ কোটি, এবি ব্যাংকের ৬৫ কোটি ও ইস্টার্ন ব্যাংকের দেড় কোটি টাকা। এখন পর্যন্ত পাঁচ ব্যাংকের খেলাপি পাওনার পরিমাণ ৫২৫ কোটি টাকা।

যদিও বছর দুয়েক আগে কৌশলে আস্তে আস্তে আড়ালে চলে যান লিজেন্ড গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এসএম আবদুল হাইসহ অন্য পরিচালকরা।

অপরদিকে সীতাকুণ্ড থানা সূত্রে জানা যায়, লিজেন্ড হোল্ডিংসের মালিক সৈয়দ মোহাম্মদ আবদুল হাই সাউথইস্ট ব্যাংক থেকে ১৪৬ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে পালিয়ে গেছেনÑএ অভিযোগে তার বিরুদ্ধে ব্যাংকের অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ গোলাম আজম ফারুক বাদী হয়ে সম্প্রতি সীতাকুণ্ড থানায় মামলাটি করেন।

এ বিষয়ে সীতাকুণ্ড থানার এসআই (তদন্ত) হারুন উর রশিদ শেয়ার বিজকে বলেন, অর্থ আত্মসাতের দায়ে ব্যবসায়ী এসএম আবদুল হাইয়ের বিরুদ্ধে সম্প্রতি সাউথইস্ট ব্যাংকের পক্ষে একটি মামলা করা হয়; মামলা নম্বর ৩০/১২/১৯। আর এ ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তার করার জন্য আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। আশা করছি খুব দ্রুত তিনি গ্রেপ্তার হবেন। 

অনুসন্ধানে জানা যায়, লিজেন্ড গ্রুপের মালিকানাধীন লিজেন্ড টেক্সটাইল, এলএম মাসিনারা এশিয়া লিমিটেড লিজেন্ড পাওয়ার প্লান্ট, লিজেন্ড ট্যাঙ্ক টার্মিনাল, ইমাজিন হোটেল লিমিটেড, মৃতিকা এগ্রো ফার্মস, লিজেন্ড ট্রেড সেন্টার প্রভৃতি নামে তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ছিল। এর মধ্যে কর্ণফুলী ইপিজেডে লিজেন্ড টেক্সটাইল, এলএম মাসিনারা এশিয়া লিমিটেড ও এস্টেথেটিকস ইলেকট্রনিকস লিমিটেড নামে তিনটি কারখানা বহু আগেই বন্ধ হয়ে যায়। এছাড়া লিজেন্ড পাওয়ার প্লান্ট, লিজেন্ড ট্যাঙ্ক টার্মিনাল, মৃতিকা এগ্রো ফার্মস, লিজেন্ড ট্রেড সেন্টার প্রভৃতি নামে প্রতিষ্ঠান অনেকটা কাগজে-কলমের প্রতিষ্ঠান।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..