দিনের খবর প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

ব্যাংকে এক কোটির বেশি হিসাব কৃষকের

শেখ শাফায়াত হোসেন: মাত্র ১০ টাকা জমা দিয়ে কৃষকদের ব্যাংক হিসাব খোলার সুযোগ দেওয়া শুরু হয়েছিল ৯ বছর আগে। এরপর চলতি বছর জুনে এ হিসাবসংখ্যা এক কোটি ছাড়ায়। গত সেপ্টেম্বর শেষে কৃষকের ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে এক কোটি ৮১ হাজার ৫৩৪টিতে। এ হিসাবগুলোয় পুঞ্জীভূত জমার পরিমাণ ছিল ৩৩৮ কোটি ১৯ লাখ টাকা।

কৃষকের খোলা ব্যাংক হিসাবগুলোর মধ্যে ২১ লাখ ৪৪ হাজার হিসাবে সরকারি ভর্তুকি জমা হচ্ছে। এ হিসাবগুলোয় সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পুঞ্জীভূত জমার পরিমাণ ছিল ৬৮ কোটি টাকা।

১০ টাকার হিসাবগুলোর মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০০ কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন তহবিল থেকে ঋণ বিতরণও হচ্ছে। কৃষকের ৪৭ হাজার ব্যাংক হিসাবে পুনঃঅর্থায়ন তহবিলসহ অন্যান্য ঋণের ১৫৫ কোটি টাকা বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়া ৪০ হাজার হিসাবের মাধ্যমে ১৭৮ কোটি টাকা রেমিট্যান্স বিতরণ করা হয়েছে। 

ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, আর্থিক অন্তর্ভুক্তির আওতায় সার্ভিস চার্জবিহীন হিসাব খোলার সুযোগ দেওয়ায় দেশের বেশিরভাগ কৃষকই ব্যাংকে হিসাব খুলতে সক্ষম হন। প্রথম ছয় বছরের মধ্যে এ ধরনে হিসাব ৯০ লাখ ছাড়িয়ে যায়। এরপর কৃষকের হিসাবসংখ্যা ৯৯ লাখে উন্নীত হতে সময় লাগে আরও আড়াই বছর। চলতি ২০১৯ সালের মার্চ শেষে এ খাতের মোট পুঞ্জীভূত হিসাবসংখ্যা ছিল ৯৯ লাখ ৯০ হাজার। গত জুনে প্রথমবারের মতো কৃষকের ব্যাংক হিসাব এক কোটির ঘর ছাড়াল।

তবে ২০১৫ সালে তথ্যগত বিভ্রাটে পড়ে বাংলাদেশ ব্যাংক এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করে, ওই বছরের জানুয়ারি-মার্চ সময়ে কৃষকের হিসাবসংখ্যা এক কোটি তিন লাখ ৭৪ হাজার ৫৯৩টি। ওই প্রতিবেদনের পরবর্তী সংখ্যায় বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছিল, ২০১৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন ব্যাংকের কাছ থেকে মাসিক ভিত্তিতে কৃষকের ব্যাংক হিসাবের তথ্য নিত। পরবর্তী সময়ে ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে ওই তথ্য নিতে শুরু করে। নতুন তথ্যে দেখা যায়, ২০১৫ সালের এপ্রিল-জুন সময়ে কৃষকের পুঞ্জীভূত মোট হিসাব ৮৫ লাখ ৯০ হাজার ৮৭৬টি। তথ্যে সঠিকতা বজায় রেখে বাংলাদেশ ব্যাংক এখনও ওই প্রতিবেদন ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করে যাচ্ছে।

তবে ২০১৬ সালের পর থেকে কৃষকের হিসাব বৃদ্ধির গতি কিছুটা থমকে ছিল। হিসাবসংখ্যা ৮৫ লাখ থেকে ৯৩ লাখে উন্নীত হতে সময় লেগে যায় ২০১৮ সালের জুন পর্যন্ত। গত ডিসেম্বরে তা বেড়ে ৯৮ লাখ ৮৬ হাজার ৮৪৭তে উন্নীত হয়।

মাত্র ১০ টাকায় কৃষকের হিসাব খুলতে প্রথম ২০১০ সালের ১৭ জানুয়ারি তফসিলি ব্যাংকগুলোকে নির্দেশনা দেন বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন গভর্নর ড. আতিউর রহমান। ২০১৬ সালের মার্চে তিনি গভর্নরের পদ ছাড়েন। ড. আতিউর রহমান সম্প্রতি শেয়ার বিজকে বলেন, ‘আমরা যখন আর্থিক অন্তর্ভুক্তির নীতি গ্রহণ করেছিলাম, তখন বিশ্বঅর্থনীতি একটি মন্দাবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। তখন অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতির কারণেই আমরা আমাদের অর্থনীতিকে অনেকটা স্থিতিশীল রাখতে পেরেছিলাম। আমরা এসএমইকে গুরুত্ব দিয়েছিলাম। তথ্য-প্রযুক্তিকে গুরুত্ব দিয়েছিলাম। মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মতো একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সেবা আজ দেশের অর্থনীতিকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে এসেছে। আমি আশা করব, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বর্তমান কর্তাব্যক্তিরা অন্তর্ভুক্তিমূলক কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা রক্ষা করে সামনে এগিয়ে যাবে।’

জানা গেছে, কোনো ধরনের সেবামাশুল না থাকায় ব্যাংকগুলো এক সময় এ কার্যক্রমে ঢিলেমি শুরু করে। অনেক ক্ষেত্রে হিসাবগুলো লেনদেনবিহীন হিসেবে পড়ে থাকে। পরে এ হিসাবগুলো চালু রাখার মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে আরও গতিশীল করার উদ্দেশ্যে কৃষককে সহজ শর্তে ঋণ দেওয়ার জন্য নিজস্ব উৎস থেকে ২০১৪ সালের দিকে বাংলাদেশ ব্যাংক একটি আবর্তনশীল পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠন করে। ওই তহবিল থেকে একজন কৃষক এককভাবে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা এবং দলগতভাবে সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকা ঋণ নিতে পারেন। গ্রাহক পর্যায়ে এ ঋণের সর্বোচ্চ সুদহার ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ।

এদিকে কৃষককে ব্যাংক হিসাব খোলার সুযোগ দেওয়ার পরপরই সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির উপকারভোগী, অতিদরিদ্র, মুক্তিযোদ্ধাসহ ব্যাংক সেবার বাইরে থাকা ছোট ছোট অনেক গোষ্ঠীকে সহজ শর্তে ব্যাংক হিসাব খোলার সুযোগ দেওয়া হয়। তবে এ ক্ষেত্রে ১০ টাকার পরিবর্তে ৫০ ও ১০০ টাকা জমা দিয়ে হিসাব খোলার সুযোগ দেওয়া হয়।

আর্থিক অন্তর্ভুক্তির আওতায় খোলা এসব হিসাবসংখ্যা বর্তমানে এক কোটি দুই লাখ ৫০ হাজার ২৭০টি।

এসব হিসাবের মধ্যে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির উপকারভোগীদের হিসাব ২৭ শতাংশ। অতিদরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচির হিসাব ১৩ শতাংশ। মুক্তিযোদ্ধাদের এক শতাংশ। অন্যান্য হিসাব ৯ শতাংশ। এই হিসাবগুলোর সঙ্গে কৃষকের হিসাব যোগ করলে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির আওতায় খোলা হিসাব দাঁড়ায় দুই কোটি তিন লাখ ৩১ হাজার ৮০৪টি।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..