দিনের খবর শেষ পাতা

ব্যাংক এশিয়ায় খেলাপি ভাটিয়ারি শিপ ব্রেকার্স

সাইফুল আলম, চট্টগ্রাম: জাহাজ ভাঙা ব্যবসায় একসময় নিয়মিত জাহাজ কাটত ভাটিয়ারি শিপ ব্রেকার্স লিমিটেড। কিন্তু কয়েক বছর ধরে অনিয়মিত হয়ে পড়েছে ব্যবসায়। গত এক বছরের একটিও পুরোনো জাহাজ আমদানি করেনি কোম্পানিটি। আর ব্যবসায়িক ব্যর্থতায় খেলাপি হয়েছে ব্যাংক এশিয়া লিমিটেড ভাটিয়ারি শাখায়। প্রতিষ্ঠানটির কাছে ব্যাংকটির পাওনা ২৯ কোটি টাকা। আর এ খেলাপি পাওনা আদায়ে ব্যাংক বন্ধকি সম্পত্তি নিলামের মাধ্যমে বিক্রির প্রক্রিয়া শুরু করেছে।   

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ও বাংলাদেশ শিপ ব্রেকিং অ্যান্ড রি-সাইক্লিং অ্যাসোসিয়েশন সূত্রে জানা যায়, ব্যবসায়ী মোহাম্মদ নাঈম শাহ ইমরান, মোহাম্মদ মোজাফফর হোসাইন চৌধুরী এবং মোহাম্মদ জামাল উদ্দিনের যৌথ মালিকানাধীন জাহাজ ভাঙার প্রতিষ্ঠান ভাটিয়ারি শিপ ব্রেকার্স লিমিটেড। জাহাজ ভাঙা ব্যবসার জন্য ব্যাংক এশিয়া লিমিটেডের ভাটিয়ারি শাখা থেকে ঋণ সুবিধা গ্রহণ করে। প্রথম দিকে লেনদেন নিয়মিত থাকলেও পরে অনিয়মিত হয়ে পড়ে। পাশাপাশি জাহাজ আমদানিও কমে যায়। ভাটিয়ারি শিপ ব্রেকার্স লিমিটেড সর্বশেষ ২০২০ সালের শুরুর দিকে ৩১ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি জাহাজ আমদানি করেছিল। এর আগের বছরেরও ৮৯ কোটি ৪৯ লাখ ব্যয়ে মাত্র একটি জাহাজ আমদানি করেছিল। এছাড়া মোহাম্মদ নাঈম শাহ ইমরানের মালিকানাধীন বেস্ট স্টিল লিমিটেড এবং বেস্ট স্টিল লিমিটেড ইউনিট-২ নামের জাহাজ ভাঙা প্রতিষ্ঠান দুটি গত দুই বছরের মধ্যে ভাঙার জন্য কোনো জাহাজ আমদানি করেনি।

অপরদিকে ব্যাংক এশিয়া লিমিটেডের ভাটিয়ারি শাখা সূত্রে জানা যায়, গত ৩১ মার্চ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির কাছে শাখাটির খেলাপি পাওনা ২৯ কোটি এক লাখ ৪৮ হাজার টাকা। আর এ পাওনার বিপরীতে সীতাকুণ্ড উপজেলার ভাটিয়ারি ও শাহ মাহমুদপুর মৌজায় মোট প্রায় ১১৭ ডেসিমেল জমি বন্ধকিতে আছে।

এ বিষয়ে ব্যাংক এশিয়ার দায়িত্বশীল কর্মকর্তা শেয়ার বিজকে বলেন, ভাটিয়ারি শিপ ব্রেকার্সের ব্যবসা ভালো যাচ্ছে না। এক বছরের বেশি সময় ধরে তাদের পুরোনো জাহাজ আমদানি ও কাটার কার্যক্রম বন্ধ আছে। তারা নিয়মিত ব্যাংকের পাওনা পরিশোধ করতে পারছেন না। এসব বিষয়ে নিয়ে তাদের সঙ্গে একাধিকবার মিটিং হলেও ব্যাংকের পাওনা পরিশোধ করেননি। সাম্প্রতিক সময়ে খেলাপি হয়ে পড়ে তাদের ঋণ। তাই পাওনা আদায়ে বন্ধকিতে থাকা জমি নিলামে বিক্রির প্রক্রিয়া চলছে। আগামী ৩ মে বন্ধকি সম্পত্তি নিলামে বিক্রি করা হবে।

তিনি আরও বলেন, ভাটিয়ারি শিপ ব্রেকার্সের পক্ষে থেকে রি-শিডিউলের যে প্রস্তাব দেয়া ছিল তা আইনসম্মত ছিল না। তারা যেসব কথা বলেছেন, সব ডাহা মিথ্যা কথা। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়মানুসারে ভাটিয়ারি শিপ ব্রেকার্স খেলাপি হয়েছে। অথচ ভালো ব্যবসার করার সময় ছিল। মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে জাহাজ ভাঙা স্ক্র্যাপের দাম টনপ্রতি বেড়েছে ১৫০ ডলারের মতো। তাদের দূরদর্শিতার অভাবে ব্যবসা নষ্ট হয়েছে। 

খেলাপি ঋণের বিষয়ে ভাটিয়ারি শিপ ব্রেকার্স লিমিটেড ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ নাঈম শাহ ইমরান শেয়ার বিজকে বলেন, গত বছরের প্রথম দিকে করোনা পরিস্থিতির সময়ে লোকসানে স্ক্র্যাপ বিক্রি করে ব্যাংকের পেমেন্ট করেছি। এরপর পরিস্থিতি বোঝার জন্য পুরনো জাহাজ আমদানি করিনি। কিন্তু বছরের শেষদিকে হঠাৎ করে আন্তর্জাতিক বাজারে জাহাজের দাম বেড়েছে গিয়েছিল। এর মধ্যে একটা পাঁচ হাজার টনের জাহাজ নেয়ার জন্য সব প্রক্রিয়া শেষ করেছিলাম। এলসি করার জন্য ব্যাংকে এক কোটি টাকা জমা দিয়েছিলাম। অথচ ব্যাংক সেই টাকাটা ঋণের সঙ্গে সমন্বয় করে ফেলে। ফলে আমি ১০ কোটি টাকা লাভ থেকে বঞ্চিত হলাম। অথচ এ লাভের টাকা দিয়ে ব্যাংকের ঋণ নিয়মিত থাকত। আমি আরও ব্যবসা করতে পারতাম। এখন ব্যাংকের কারণে আমার ব্যবসা বন্ধ। এছাড়া ঋণ খেলাপি হওয়ার আগেই আমি দুই থেকে পাঁচ শতাংশ ডাউন পেমেন্টে রি-শিডিউল করার জন্য প্রস্তাব দিয়েছিলাম। তাও ব্যাংক আমলে নেয়নি। অথচ বাংলাদেশ ব্যাংক করোনাকালে ঋণের ছয় কিস্তি দিতে না পারলে খেলাপি করা যাবে না বলে একটি সার্কুলার জারি করে, যা ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত বর্ধিত করেছে। অথচ গত ১ এপ্রিল খেলাপি করে সিআর মামলা করা হয়েছে। আর ১০ তারিখ নিলামে সম্পত্তি বিক্রি করার নোটিসও পত্রিকায় ছাপিয়ে দিয়েছে। এসব কাজ খুব অল্প সময়ে করেছে, যা পুরোপুরি রহস্যজনক। এভাবে আমাকে পথে বসিয়ে দিল ব্যাংক। অথচ ব্যাংক এশিয়া আমার সঙ্গে ব্যবসা করে অন্তত ৫০ কোটি টাকা লাভ করেছে। গত ১২/১৪ বছরের জাহাজ আমদানি থেকে কর-ভ্যাট দিয়েছি ২০০ কোটি টাকা। কিন্তু কঠিন সময়ে এক টাকাও প্রাণোদনা পাইনি। আমাদের দেখার কেউ নেই।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..