ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণ সাড়ে ১৮ হাজার কোটি টাকা

টেকসই অর্থায়ন

শেখ আবু তালেব: টেকসই অর্থায়নে উৎসাহিত করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এজন্য কয়েকটি খাতকে বেছে নেয়া হয়েছে। চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো টেকসই অর্থায়নে ঋণ বিতরণ করেছে সাড়ে ১৮ হাজার কোটি টাকা। চার লাখ ১৫ হাজার ৩৮৩ গ্রাহক এসব ঋণ নিয়েছেন। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে এমন তথ্য।

টেকসই অর্থায়নে শীর্ষে উঠে এসেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, ব্যাংক আল-ফালাহ্ ও ব্র্যাক ব্যাংক। অপরদিকে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে শীর্ষে উঠে এসেছে ইডকল প্রাইম ফাইন্যান্স, আইআইডিএফসি ও অগ্রণী এসএমই ফাইন্যান্স।

পরিবেশবান্ধব তথা সবুজে অর্থায়নে উৎসাহিত করার পর টেকসই অর্থায়নের দিকে ঝুঁকছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বিনিয়োগকে টেকসই অর্থাৎ নিরাপদে অর্থ ফিরিয়ে আনতে মূল প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এজন্য ব্যাংকগুলোকে কয়েকটি খাত নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। এসব খাতে ঋণ দেয়াকে টেকসই অর্থায়ন হিসেবে বিবেচনায় নেবে বাংলাদেশ ব্যাংক।

টেকসই অর্থায়নে উৎসাহিত করতে এ খাতের ঋণ বিতরণকে ক্রেডিট রেটিংয়ের আওতায় এনেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ফলে টেকসই অর্থায়ন খাতে ঋণ বিতরণ ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো এসব খাতে ঋণ বিতরণে মনোযোগী হয়েছে।

টেকসই অর্থায়নে উৎসাহিত করতে প্রথমবারের মতো প্রতিবেদন প্রকাশ করল বাংলাদেশ ব্যাংক। চলতি বছরের জুনায়ারি-মার্চ পর্যন্ত সময়ের প্রান্তিকে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ১৮ হাজার ৫২৭ কোটি টাকা। এটি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মোট বিতরণকৃত ঋণের সাত দশমিক ৯৭ শতাংশ।

টেকসই অর্থায়নের মধ্যে সবুজ অর্থায়নের পরিমাণ হচ্ছে এক হাজার ৯৮৬ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। এছাড়া টেকসই অর্থায়নের মধ্যে ব্যাংকের ঋণ বিতরণ হয়েছে ১৮ হাজার ১৫০ কোটি ৬১ লাখ টাকা। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ হচ্ছে ৩৭৬ কোটি ৪১ লাখ টাকা।

টেকসই অর্থায়নের খাতগুলো হচ্ছে কৃষি, সিএমএসএমই, সামাজিক দায়বদ্ধতাসম্পন্ন বাণিজ্যিক প্রকল্পে অর্থায়ন, পরিবেশবান্ধব ট্রেডিং খাতে অর্থায়ন প্রভৃতি। এসব খাতে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে চার লাখ ১৫ হাজার ৩৮৩ উদ্যোক্তা ঋণ নিয়েছেন, যার মধ্যে দুই লাখ ৮২ হাজার ৭৫৪ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান হচ্ছে গ্রামের।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্যাংক খাত থেকে নেয়া ঋণের ৯১ শতাংশই গিয়েছে কৃষি খাতে। আট শতাংশ গিয়েছে সামাজিক দায়বদ্ধতা রয়েছে এমন বাণিজ্যিক প্রকল্পে। এ হিসাবে দেখা যায়, ব্যাংকগুলো টেকসই অর্থায়ের প্রায় পুরোটাই বিতরণ করেছে কৃষি খাতে। অন্যান্য খাতের ব্যাংকের অবদান কম।

অপরদিকে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে বিতরণ করা ঋণের মধ্যে ৪৭ শতাংশ গিয়েছে কৃষি খাতে। সামাজিক দায়বদ্ধতা রয়েছে এমন বাণিজ্যিক খাতে বিতরণ করেছে ১৫ শতাংশ, পরিবেশবান্ধব পণ্য উৎপাদনে চলতি ঋণ দিয়েছে ৯ শতাংশ ও পরিবেশবান্ধব অর্থায়নে মোট ঋণের ২৭ শতাংশ।

এভাবে  খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, টেকসই অর্থায়নের জন্য মূলত কৃষিকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছে ব্যাংক। অন্যান্য খাতের প্রতি ব্যাংকের আগ্রহ নেই বললেই চলে। অপরদিকে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো টেকসই অর্থায়নের সব ক্ষেত্রেই বিনিয়োগ করেছে আনুপাতিক হারে।

ব্যাংক খাতকে টেকসই অর্থায়নের দিকে নিয়ে যেতে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও পরিবেশবান্ধব ব্যাংকিংকে উৎসাহিত করার গুরুত্বারোপ করেছেন অর্থনীতিবিদরা। এ নিয়ে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) উদ্যোগে একটি গবেষণা প্রতিবেদনও তৈরি করা হয়েছে সম্প্রতি।

প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা হয়েছে, টেকসই ব্যাংকিং কার্যক্রম ত্বরান্বিত করতে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। টেকসই ও সবুজ ব্যাংকিং কার্যক্রম বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে ব্যাংকার, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকের। ঋণ গ্রহীতা ও উদ্যোক্তাদেরও এ বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করতে হবে। টেকসই ব্যাংকিং নিশ্চিত করতে হলে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও পরিবেশ এ তিন ক্ষেত্রেই যথাযথ গুরুত্ব দিতে হবে। এজন্য দেশের ব্যাংক খাতে সুশাসন, নেতৃত্ব ও সামাজিক দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

সর্বশেষ..