মত-বিশ্লেষণ

ব্যাংক খাতের তারল্য সংকট ও কিছু কৌশলগত প্রতিকার

মোশারফ হোসেন: প্রান্তিক ও নিম্ন আয়ের মানুষকে মোবাইল ব্যাংকিং সুবিধা ব্যবহার করে ব্যাংক সেবার আওতায় নিয়ে আসা: প্রান্তিক ও নিম্ন আয়ের মানুষ তাদের সঞ্চিত অর্থ জমা রাখার জন্য ব্যাংকের কথা চিন্তা করে না। তারা তাদের নগদ অর্থ (হার্ড ক্যাশ) পকেট, পার্স, ওয়ালেটে রাখে অথবা ঘরের সিন্দুকে অলস ফেলে রাখে। তবে তাদের অনেকেই এখন বিকাশের মতো মোবাইল ব্যাংকিং হিসাব পরিচালনা করতে সমর্থ। তাই বিকাশ, রকেট এবং অন্য মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) প্রোভাইডারদের মাধ্যমে গার্মেন্ট শ্রমিক, রিকশাচালক, অটো ও বাসচালক, অন্যান্য পরিবহন শ্রমিক, কৃষক, গৃহিণী, বিধবা, গৃহকর্মী, ভিক্ষুক, দিনমজুর, হকার প্রভৃতি প্রান্তিক ও ব্যাংকিংয়ের আওতাবহির্ভূত মানুষের প্রতিদিনের উদ্বৃত্ত আয় তাদের ব্যাংকের সঞ্চয়ী বা স্কিম হিসেবে জমা দেওয়ার ব্যবস্থা করা গেলে ব্যাংকগুলোর তারল্য অনেকাংশে বাড়িয়ে তোলা সম্ভব হবে।
ধর্মীয়ভাবে সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠানের জন্য কাস্টমাইজড ডিপোজিট প্রডাক্ট: ধর্মীয়ভাবে সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠান, যেমন: মসজিদ, মাদরাসা, মাজার সাধারণত ব্যাংকিং ব্যবস্থা এড়িয়ে চলে; আর ব্যাংকিং করলেও সুদের বিবেচনায় প্রথাগত ব্যাংকের চেয়ে শরিয়াহ্ভিত্তিক ইসলামি ব্যাংকগুলোকেই অগ্রাধিকার দেয়। তাই প্রথাগত ব্যাংকগুলো শরিয়াহ্ভিত্তিক আমানতি পণ্য চালু করতে পারে, যেমন: মসজিদের অ্যাকাউন্টে ন্যূনতম মাসিক গড় ব্যালেন্স সংরক্ষণের শর্তে ব্যাংক কর্তৃক মসজিদের মাসিক বিদ্যুৎ বিল প্রদানের মতো কিছু সুদমুক্ত বৈশিষ্ট্য যুক্ত করে এসব প্রতিষ্ঠানের জন্য কাস্টমাইজড ডিপোজিট প্রডাক্ট ডিজাইন করতে পারে।
প্রবাসী, তাদের স্ত্রী এবং সন্তানদের জন্য ব্যাংকিং প্রডাক্ট ও সার্ভিসে বাড়তি ফিন্যান্সিয়াল এবং নন-ফিন্যান্সিয়াল ভ্যালু এডিশন: প্রত্যেক বছর শাখাভিত্তিক শীর্ষ পাঁচ রেমিট্যান্স প্রেরণকারী প্রবাসী বাছাই করে তাদের সার্টিফিকেট দিলে প্রবাসীরা সম্মানিত বোধ করবেন। প্রবাসীরা ব্যাংকের লো-কস্ট ডিপোজিটের অনেক বড় জোগানদাতা। তাই তাদের জন্য কিছুটা আর্থিক ছাড় ব্যাংকগুলো দিতেই পারে, যেমন: প্রবাসীদের মেধাবী সন্তানদের অসাধারণ একাডেমিক ফলের জন্য মেধাবৃত্তি প্রদানের মতো প্রণোদনামূলক ব্যবস্থা থাকলে প্রবাসী ও তাদের পরিবার ব্যাংকিং চ্যানেলে যুক্ত হতে আগ্রহী হবে। প্রবাসীদের জন্য প্রিমিয়াম সুদের (সাধারণ আমানতকারীদের সুদহারের তুলনায় দশমিক ৫০ শতাংশ থেকে এক শতাংশ বেশি সুদ) বিশেষ স্কিম চালু করা যেতে পারে। রেমিট্যান্সে সরকার ঘোষিত দুই শতাংশ ইনসেনটিভ দ্রুত বাস্তবায়নের পাশাপাশি প্রবাসীদের প্রেরিত রেমিট্যান্স আবগারি শুল্কমুক্ত করে প্রবাসী ও তাদের স্ত্রীদের ব্যাংক হিসাব অর্ধবার্ষিক রক্ষণাবেক্ষণ ফি’মুক্ত করলে অবশ্যই প্রবাসীরা হুন্ডিবিমুখ হবেন এবং নিঃসন্দেহে ব্যাংকিং চ্যানেলেই রেমিট্যান্স আসবে, যা ব্যাংকের তারল্য সংস্থান বাড়াবে।
প্রতিযোগিতামূলক আমানতি পণ্য উদ্ভাবন: বর্তমানে সঞ্চয়পত্র ও ডাকঘর আমানত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর প্রধান প্রতিযোগিতামূলক আমানতি পণ্য। ব্যাংকগুলোরও ডিফেন্সিভ আমানতি পণ্য, যেমন: মাসিক আয় প্রকল্প এবং ডাবল মানি স্কিম প্রভৃতি রয়েছে। তবুও ব্যাংকগুলোর কিছু আমানতি পণ্যের ঘাটতি রয়েছে। ডাক বিভাগ সাড়ে সাত শতাংশ সুদে সাধারণ সঞ্চয়ী হিসাব খুলছে, যেখানে ব্যাংকগুলো কেবল তিন থেকে চার শতাংশে এ অফার দিচ্ছে। ফলশ্রুতিতে শিক্ষিত কিন্তু মূল্যসংবেদনশীল গ্রাহকরা তাদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আমানত ডাকঘরে নিয়ে যাচ্ছেন। এমন বিশেষ কিছু গ্রাহক, যেমন: প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক, অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি, প্রবীণ নাগরিকদের জন্য এফডিআরের ন্যূনতম সুদহারে বিশেষ সঞ্চয়ী হিসাব চালু করা যেতে পারে, যার সুদ দৈনিক স্থিতির আলোকে ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে দেওয়া হবে।
সান্ধ্য ও রাত্রীকালীন ব্যাংকিং: ব্যাংকগুলো বিকাল ৪টার পর কোনো জমা গ্রহণ করে না। তাই বিকাল ৪টার পর ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের মধ্যে লেনদেন হওয়া অর্থ ব্যবসায়ীদের নিজ নিজ ক্যাশবাক্সগুলোয় অলস পড়ে থাকে, যা ব্যাংকে আনা যেতে পারে, যদি অন্তত রাত ১০টা পর্যন্ত নগদ গ্রহণের সুবিধা ব্যবসায়ীদের দেওয়া যেতে পারে। এজন্য শাখার ভেতরে বা বাইরে অথবা ব্যস্ত বাণিজ্যিক এলাকায় ক্যাশ রিসাইক্লিং মেশিন (সিআরএম) বা ক্যাশ ডিপোজিট মেশিন (সিডিএম) অথবা ছোট আকারের কালেকশন বুথ খোলা যেতে পারে, যা ২৪ ঘণ্টা অথবা রাতের একটি নির্ধারিত সময় পর্যন্ত চালু থাকবে।
পণ্য ও সেবা তথ্যের অডিওভিজুয়াল ডিসপ্লের জন্য শাখায় টিভি মনিটর স্থাপন: বেশিরভাগ গ্রাহক যারা স্বপ্রণোদিত হয়ে শাখায় আসেন, তারা তাদের প্রয়োজনীয় সেবাটি ছাড়া ব্যাংকের অন্য কোনো পণ্য বা সেবা সম্পর্কে জানতে চান না। আবার ব্যাংকাররাও ব্যস্ততার দরুন তাদের অন্য পণ্য বা সেবা সম্পর্কে অবহিত করতে সময় পান না। একজন গ্রাহক যিনি একটি চেক নগদায়ন করতে অথবা মাসিক বিদ্যুৎ বা গ্যাস বিল পরিশোধ করতে বা ফরেন রেমিট্যান্স উত্তোলন করতে ব্যাংকে আসেন, তিনি ব্যাংকের অন্যান্য পণ্য বা সেবার জন্যও সম্ভাব্য গ্রাহক হতে পারেন। কিন্তু মার্কেটিং এবং পাবলিসিটির অভাবে বর্তমান ও সম্ভাব্য উভয় শ্রেণির গ্রাহকই তাদের জন্য উপযোগী এমন অনেক ব্যাংকিং অফার সম্পর্কে অজ্ঞাত থাকেন। তবে শাখার অভ্যন্তরে যদি পুরো ব্যাংকিং সময়জুড়ে টিভি মনিটরের মাধ্যমে ব্যাংকের বিভিন্ন পণ্য ও সেবার অডিওভিজুয়াল বিজ্ঞাপন প্রচার করা যায়, তাহলে ব্যাংকে আগত গ্রাহক (অ্যাকাউন্টধারী এবং ওয়াক-ইন উভয় গ্রাহক) ব্যাংকের একাধিক সেবা ও স্কিম সম্পর্কে জানতে পারবেন। এটি প্রচার ও বিজ্ঞাপনের সহজ মাধ্যম হিসেবেও কাজ করবে। ব্যস্ত ব্যাংকাররা যাদের সকাল-সন্ধ্যা ডেস্কে গ্রাহকসেবা দিতে হয় এবং ব্যক্তিগত বিপণনের মাধ্যমে আমানত ও ব্যবসা হাসিল করতে হয়, তাদের জন্য এটি ‘এক ঢিলে দুই পাখি মারা’র মতো কাজ করবে। ব্যাংকের নিয়মিত পণ্য ও সেবা প্রচারের পাশাপাশি ব্যাংকিংয়ের নিয়মাচার অবহিতকরণ এবং গ্রাহক সচেতনতা বৃদ্ধি করা এ প্রক্রিয়া দ্বারা সহজতর হবে। ব্লু টুথভিত্তিক শ্রবণযোগ্য বার্তাও প্রচার করা যেতে পারে।
গ্রাহক উৎস শনাক্তকরণ: গ্রাহক পাওয়া যে কোনো বাণিজ্যের পূর্বশর্ত। অনেক শাখা পর্যায়ের ব্যাংকার জানেন না যে, তাদের সম্ভাব্য গ্রাহক কারা বা তারা কাদের কাছে যাবেন বা কাকে আমানতের জন্য নক করবেন। সুতরাং ব্যাংকের মার্কেটিং ও রিসার্চ বিভাগের নেতৃত্বে সব আঞ্চলিক প্রধান ও কয়েকজন অভিজ্ঞ ম্যানেজারের সমন্বয়ে গঠিত কমিটির মাধ্যমে বিশেষ বিশেষ গ্রাহককে বিভিন্ন উৎসে চিহ্নিত করা যেতে পারে, যাদের কাছে শাখাগুলো অ্যাপ্রোচ করে তাদের আমানত আহরণ বেগবান করতে পারবে।
প্রডাক্ট অ্যাম্বাসেডর ও কাস্টমার রিপ্রেজেনটেটিভ মনোনয়ন: কারও কাছ থেকে অর্থ ধার, গ্রহণ বা ঋণপ্রাপ্তির পূর্বশর্ত হচ্ছে ধার বা ঋণগ্রহীতা কর্তৃক ধার বা ঋণদাতার বিশ্বাস বা আস্থা অর্জন করা। আমানতদাররা হচ্ছেন ব্যাংকারের ধার বা ঋণদাতা। আমানতদারদের সঙ্গে আমানতি প্রডাক্ট-সংক্রান্ত সত্য এবং পূর্ণ তথ্য বিনিময়ের মাধ্যমে ব্যাংকারের প্রতি আমানতদারের আস্থা ও বিশ্বাস বাড়ে। তাই প্রত্যেক ব্যাংকারকে তাদের ব্যাংকের প্রডাক্ট সম্পর্কে যথাযথ জ্ঞান রাখতে হবে। তবে এটি দুঃখের বিষয় যে, অনেক ব্যাংকারেরই তার ব্যাংকের প্রডাক্ট সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞানের অভাব রয়েছে। ফলশ্রুতিতে তারা আমানতদারদের বিশ্বাস অর্জনে ব্যর্থ হন। তবে সব প্রডাক্টের ভাসা ভাসা জ্ঞান না নিয়ে একজন ব্যাংকারকে অন্তত একটি প্রডাক্টের মাস্টার হওয়া অধিক ভালো। তাই কোনো শাখার প্রত্যেক কর্মকর্তার মাঝে প্রডাক্ট নলেজ বাড়াতে অন্তত এক বা দুটি প্রডাক্টের জন্য শাখাভিত্তিক প্রডাক্ট অ্যাম্বাসেডর মনোনয়ন দেওয়া যেতে পারে। এছাড়া গ্রাহকদের সেগমেন্টভিত্তিক বিভাজন করে কর্মকর্তাদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া যেতে পারে, যাতে করে একজন কর্মকর্তা অন্তত এক বা একাধিক বিশেষ কাস্টমার গ্রুপের প্রতি অধিকতর মনোযোগী হতে পারে এবং তাদের সঙ্গে হার্ট-উইনিং রিলেশনশিপ তৈরি ও তা বজায় রাখতে সমর্থ হয়।
পুরোনো গ্রাহকের জন্য সহজ ও সংক্ষিপ্ত অ্যাকাউন্ট ওপেনিং ফরম (এওএফ): ব্যাংকের অনলাইন ডেটাবেজে প্রত্যেক গ্রাহকের তথ্য সংরক্ষিত থাকে। তাই পুরোনো কোনো একজন গ্রাহক (যার কোনো একটি হিসাব সংশ্লিষ্ট ব্যাংকে আছে) যদি একই ব্যাংকে আরেকটি হিসাব খুলতে আসেন, তাহলে তার অনলাইন কাস্টমার ইনফরমেশন ফরম (সিআইএফ) থেকে ওই গ্রাহক সম্পর্কে সব তথ্য পাওয়া সম্ভব। তাই কোনো বিদ্যমান গ্রাহক তার দ্বিতীয় বা তৃতীয় আরেকটি অ্যাকাউন্ট খুলতে এলে তার কাছ থেকে আবারও জাতীয় পরিচয়পত্র, ছবি প্রভৃতি গ্রহণ এবং ৮-১০ পৃষ্ঠার পুরো অ্যাকাউন্ট ওপেনিং ফরম (এওএফ) পূরণের প্রয়োজনীয়তা আছে বলে মনে হয় না। এসব ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ দুই পৃষ্ঠার সহজ ও সংক্ষিপ্ত অ্যাকাউন্ট ওপেনিং ফরম চালু করা যেতে পারে, যেখানে কেবল গ্রাহকের নাম ও বর্তমান সিআইএফ নম্বর, নমিনির নাম এবং সংশ্লিষ্ট প্রডাক্টের তথ্যই শুধু থাকবে। এছাড়া অনলাইনে বা মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে গ্রাহক নিজেই যদি নিজের হিসাব খুলতে পারেন, তাহলে ব্যাংকের গ্রাহকসংখ্যা দ্রুত বাড়বে এবং তা আমানত বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে। (শেষ)

ব্যাংক কর্মকর্তা, কিশোরগঞ্জ
[email protected]

সর্বশেষ..