প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

ব্যাংক খাতে প্রভিশন ঘাটতি ৯ হাজার কোটি টাকা

শেখ আবু তালেব: প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ ও যাচাই-বাছাই ছাড়াই আগ্রাসী ঋণ বিতরণকারী ব্যাংকগুলোর খেলাপি বাড়ছে। এর বিপরীতে বড় অঙ্কের অর্থ নিরাপত্তা সঞ্চিতি (প্রভিশন) রাখতে হচ্ছে। তবে মুনাফা থেকে এ ঘাটতি পূরণ করতে পারছে না ব্যাংকগুলো। ফলে ক্রমাগত তারল্য সংকটে পড়ছে এসব ব্যাংক।
গত জুন শেষে দেশের ব্যাংক খাতে প্রভিশন ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯ হাজার ২১৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে অর্ধেকের বেশিই রাষ্ট্রায়ত্ত চার ব্যাংক অগ্রণী, বেসিক, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকের। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যাংক খাতে প্রভিশন ঘাটতি বেড়ে যাওয়ায় বেড়ে যাচ্ছে ঝুঁকি।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুন শেষে ১৩টি ব্যাংক প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণ করতে পারেনি। এই সময়ে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ হচ্ছে ৯ লাখ ৬২ হাজার ৭৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি হয়েছে এক লাখ ১২ হাজার ৪২৫ কোটি টাকা।
আমানতকারীদের সুরক্ষা দিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যাংকগুলোকে সব ধরনের ঋণের বিপরীতে প্রভিশন রাখতে হয়। এক্ষেত্রে সাধারণ ঋণের বিপরীতে দশমিক ২৫ শতাংশ থেকে শুরু করে পাঁচ শতাংশ পর্যন্ত প্রভিশন রাখার নিয়ম রয়েছে। অন্যদিকে খেলাপি হওয়া ঋণের বেলায় নিম্নমান, সন্দেহজনক এবং মন্দ বা ক্ষতি মানে শ্রেণিকৃত
ঋণের বিপরীতে সর্বনিম্ন ২০, ৫০ ও ১০০ ভাগ হারে প্রভিশন রাখতে হয়। ব্যাংকগুলোর অর্জিত মুনাফা থেকে এ অর্থ কেটে রাখতে হয়। অবশ্য কয়েকটি ব্যাংককে বিশেষ বিবেচনায় ধাপে ধাপে প্রভিশন রাখার সুযোগ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
জানা গেছে, ১৩টি ব্যাংক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশিত হারে প্রভিশন রাখতে পারেনি। ব্যাংকগুলোর মোট প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৯ হাজার ২১৯ কোটি টাকায়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশিত শর্ত অনুযায়ী, গত জুন শেষে ব্যাংকগুলোকে ৭১ হাজার ২৪৩ কোটি টাকার প্রভিশন রাখার বাধ্যবাধকতা ছিল। কিন্তু ব্যাংকগুলো রাখতে পেরেছে ৬২ হাজার ২৩ কোটি টাকা। অবশ্য বেশকিছু ব্যাংকের প্রভিশন প্রয়োজনের চেয়ে বেশি রয়েছে।
জানা গেছে, ব্যাংক খাতের মোট প্রভিশন ঘাটতির মধ্যে ছয় হাজার ৮৫১ কোটি টাকাই রাষ্ট্রায়ত্ত চার ব্যাংকের। প্রভিশন ঘাটতিতে জুন শেষে শীর্ষে রয়েছে বেসিক ব্যাংক। এ ব্যাংকটির প্রভিশন ঘাটতি রয়েছে তিন হাজার ৭১ কোটি টাকা। এরপরই এক হাজার ৯৪২ কোটি টাকার ঘাটতি রয়েছে সোনালী ব্যাংকের। ঋণ কেলেঙ্কারিতে আলোচনায় থাকা জনতা ব্যাংকের কোনো প্রভিশন ঘাটতি নেই।
বেসরকারি ও বিশেষায়িত ব্যাংকের মধ্যে প্রভিশন ঘাটতির তালিকায় শীর্ষে নাম লিখিয়েছে এবি ব্যাংক। জুন শেষে ব্যাংকটির
প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে তিন হাজার ৫৯৩ কোটি টাকা। এছাড়া বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের ৫১১ কোটি, ন্যাশনাল ব্যাংকের ৭২২ কোটি, সোস্যাল ইসলামী ব্যাংকের ১০৩ কোটি, শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংক ১০০ কোটি, ট্রাস্ট ব্যাংকের ১৮৩ কোটি টাকা।
এদিকে মার্চের তুলনায় জুন শেষে প্রভিশন ঘাটতিতে থাকা ব্যাংকের সংখ্যা একটি বৃদ্ধি পেলেও টাকার অঙ্কে পরিমাণ কিছুটা কমেছে। আর গত ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকগুলোর মোট প্রভিশন ঘাটতির পরিমাণ ছিল ৯ হাজার ৩৭৫ কোটি টাকা।
আমানতকারীদের আমানত ব্যাংকের আর্থিক ঝুঁকি থেকে রক্ষার জন্য পর্যাপ্ত মূলধন রাখার বিধান রয়েছে। একই কারণে খেলাপি ঋণের বিপরীতে পর্যাপ্ত মূলধন রাখারও বিধান রয়েছে। কিন্তু ঋণের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ খেলাপি হওয়ায় এবং সে অনুযায়ী প্রভিশন সংরক্ষণ না করায় ব্যাংকগুলোর আর্থিক ঝুঁকি বেড়েছে। বিশেষ করে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোয় এ ঝুঁকির প্রবণতা বেড়েছে বেশি।
ব্যাংক খাতে ইচ্ছাকৃত খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি ব্যবসা মন্দা, ব্যাংক খাতে ঋণ কেলেঙ্কারি ও চলমান পরিস্থিতিতে ব্যাংকের এবার পরিচালন মুনাফা কমেছে। বেড়েছে ব্যাংকের খেলাপি ঋণ। সব মিলিয়ে এবার ব্যাংকের পরিচালন মুনাফা কমে গেছে। এর ওপর অতিরিক্ত প্রভিশন রাখতে গিয়ে অনেক ব্যাংকের প্রকৃত মুনাফা না হয়ে লোকসানের সম্মুখীন হচ্ছে বলে মনে করছেন ব্যাংকাররা।
জানা গেছে, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর শুধু প্রভিশন ঘাটতিই নেই। রয়েছে মূলধন ঘাটতিও। এজন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বিভিন্ন
সময়ে দায়ী করা হয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক কর্মকর্তাদের দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনাকে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষকে দায়ী করা হয়েছে, মূলত দক্ষ জনবলের ঘাটতিকে।
এজন্য মূলধন ঘাটতি মেটাতে সরকার প্রতি বছর জনগণের করের টাকায় এসব ব্যাংককে শত শত কোটি টাকা দিয়ে আসছে। অর্থ দেওয়ার পরও এসব ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা ভালো হচ্ছে না।
গত ফেব্রুয়ারি মাসে সরকারি চার ব্যাংকের পক্ষ থেকে মূলধন ঘাটতি মেটাতে সরকারের কাছে প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকা চাওয়া হয়। ওই সময় মূলধন ঘাটতি পূরণে সবচেয়ে বেশি সাত হাজার ৯৩৫ কোটি টাকা চেয়েছিল বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক। এর পরের অবস্থানে আছে জনতা ব্যাংক।
এছাড়া বেসিক ব্যাংকের দরকার চার হাজার কোটি টাকা এবং রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক চেয়েছিল ৭৭৫ কোটি টাকা। অন্যদিকে গ্রামীণ ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধনের সরকারি অংশ পূরণ করতে চেয়েছিল এক কোটি ১২ লাখ টাকা।
গত চার অর্থবছরে সরকারি ব্যাংকগুলোকে মূলধন ঘাটতি মেটাতে দেওয়া হয়েছে ১০ হাজার ৬৬৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেওয়া হয়েছে ব্যাংক বেসিককে। এ ব্যাংকটিকে মোট ঋণ দেওয়া হয়েছে তিন হাজার ৩৯০ কোটি টাকা। বরাদ্দের দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা সোনালী ব্যাংককে দেওয়া হয়েছে তিন হাজার তিন কোটি টাকা।
এছাড়া জনতাকে ৮১৪ কোটি টাকা, অগ্রণীকে এক হাজার ৮১ কোটি, রূপালীকে ৩১০ কোটি ও কৃষি ব্যাংককে ৭২৯ কোটি ৮৬ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে।

 

সর্বশেষ..