প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

ব্যাংক পরিচালনায় পিছিয়ে পড়ছেন চট্টগ্রামের উদ্যোক্তারা

ঋণখেলাপের দায়

সাইফুল আলম, চট্টগ্রাম: দেশের শিল্প-বাণিজ্য ও আমদানি-রফতানি ব্যবসায় চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের আধিপত্য দীর্ঘদিনের। সে সুবাদে এ অঞ্চলের ব্যবসায়ীরা দখল নেন ব্যাংকের মালিকানায়। তবে বর্তমানে ওই অঞ্চলটির ব্যবসায়ীরা ব্যবসা পরিচালনায় নানাভাবে বেকায়দায় রয়েছেন। বছরের পর বছর লোকসানে থাকায় অনেক ব্যবসায়ী ব্যাংকের ঋণ সময়মতো পরিশোধ করতে পারছেন না। এ কারণে কয়েক বছরে চট্টগ্রামের অন্তত এক ডজন শীর্ষ ব্যবসায়ীকে ঋণখেলাপের দায়ে ব্যাংকের পরিচালক পদ থেকে সরে যেতে হয়েছে, যা ব্যাংক খাতে বড় ধরনের আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ব্যাংক খাতে আলোচিত বিষয় ছিল ঋণ জালিয়াতি ও খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি। খেলাপি ঋণের দায়ে বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ীকে কারাবরণ করতে হয়েছে এবং এক ডজন শীর্ষ ব্যবসায়ীকে বিভিন্ন ব্যাংকের পরিচালক পদও হারাতে হয়েছে। এর মধ্যে চলতি মাসে মেঘনা ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ থেকে বাদ পড়েছেন এআরএল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আশিকুর রহমান লস্কর (মাহিন)। তিনি ব্যাংকের একজন উদ্যোক্তা পরিচালক ছিলেন।
জানা গেছে, দায়িত্বপ্রাপ্ত নতুন অর্থমন্ত্রী সংসদে শীর্ষ ৩০০ ঋণখেলাপির তালিকা প্রকাশ করেন। এর মধ্যে মেঘনা ব্যাংকের পরিচালক আশিকুর রহমান লস্করের মালিকানাধীন জাহাজ ভাঙা প্রতিষ্ঠান ‘মাহিন এন্টারপ্রাইজ’ শীর্ষ পাঁচে আছে। যা চট্টগ্রামভিত্তিক এআরএল গ্রুপের একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটি এবি ব্যাংকের আগ্রাবাদ শাখায় ৮২৫ কোটি টাকা ঋণখেলাপি। এ প্রতিষ্ঠানটির মার্কেন্টাইল ব্যাংক আগ্রাবাদ শাখা, ঢাকা ব্যাংক আগ্রাবাদ শাখা ও ইস্টার্ন ব্যাংক আগ্রাবাদ শাখায় বড় অঙ্কের দেনা রয়েছে বলেও জানা গেছে। সব মিলে মাহিন এন্টারপ্রাইজের কাছে বর্তমান পাওনা এক হাজার কোটি টাকারও বেশি।
একইভাবে দু’মাস আগে খেলাপি ঋণের দায়ে মিডল্যান্ড ব্যাংকের পরিচালক পদ থেকে বাদ পড়েন বাদশা গ্রুপের এমডি মোহাম্মদ ঈসা বাদশা মহসিন। চট্টগ্রামভিত্তিক বাদশা শিল্পগ্রুপের এই এমডির মালিকানাধীন দুটি প্রতিষ্ঠান এমএম ইন্টারপ্রাইজ ও ঝুমা এন্টারপ্রাইজের নামে ইস্টার্ন ব্যাংক, শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংক, মেঘনা ব্যাংকসহ একাধিক ব্যাংক থেকে ঋণ সুবিধা নেয়। কিন্তু সময়মতো পাওনা পরিশোধের ব্যর্থতায় ব্যাংকের খেলাপি তালিকায় উঠে আসে এ ব্যবসায়ীর নাম। এর মধ্যে ইস্টার্ন ব্যাংকে ১৫৬ কোটি টাকা, শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংকে ৫৬ কোটি ৪৪ লাখ ৪৪ হাজার ৩৪৭ টাকা এবং মেঘনা ব্যাংকে ৫৬ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ রয়েছে। সংসদে উপস্থাপিত শীর্ষ ৩০০ ঋণখেলাপি তালিকায় ঈসা বাদশার মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ঝুমা এন্টারপ্রাইজের নাম রয়েছে ১২৪ নম্বরে। ঝুমা এন্টারপ্রাইজের নামে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১২৬ কোটি টাকা।
এছাড়া সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ থেকে বাদ পড়েন চট্টগ্রামের সাদ-মুসা গ্রুপের এমডি মোহাম্মদ মহসিন। সাবেক ফারমার্স ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ থেকে বাদ পড়েন এহসান গ্রুপের এমডি আবু আলম, ক্রিস্টাল গ্রুপের এমডি মোরশেদ মুরাদ ইব্রাহিম, রাশেদ মুরাদ ইব্রাহিম এবং মাহজাবিন মোরশেদ। এছাড়া এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ থেকে বাদ পড়েন সিলভিয়া গ্রুপের পরিচালক কামরুন নাহার সাথী ও আরএসআরএমের চেয়ারম্যান মাকসুদুর রহমান। যদিও বর্তমানে তারা উদ্যোক্তা পরিচালক হিসেবে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোয় রয়েছেন। এছাড়া কয়েক বছর আগে ব্যাংকের পরিচালকের পদ হারাতে হয়েছে চট্টগ্রামের এমন ব্যবসায়ীদের মধ্যে রয়েছেন মোস্তফা গ্রুপের চেয়ারম্যান হেফাজুতুর রহমান। খেলাপি ঋণের দায়ে ওয়ান ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ থেকে বাদ পড়েন এই ব্যবসায়ী। তার ভাই মোস্তফা গ্রুপের এমডি জহির উদ্দিন বাদ পড়েন ব্যাংক এশিয়ার পরিচালনা পর্ষদ থেকে। এনসিসি ব্যাংক থেকে বাদ পড়েন ইমাম গ্রুপের এমডি মোহাম্মদ আলী ও তার ছেলে আলী ইমাম।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, বিভিন্ন ব্যাংকের পরিচালকের নামে দেড় লাখ কোটি টাকারও বেশি ঋণ রয়েছে। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা। আবার এমনও আছে, ব্যাংক চেয়ারম্যানও ঋণখেলাপির তালিকায় আছেন।
এ কারণে ব্যাংক কোম্পানি আইনের ১৭ ধারায় সংশোধন এনে ঋণখেলাপি ব্যাংক পরিচালকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া দরকার বলে মনে করছেন ব্যাংক খাত-সংশ্লিষ্টরা।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ব্যাংক পরিচালকদের একমাত্র ব্যবসা হতে হবে ব্যাংক ব্যবসা। তারা অন্য কোনো ব্যবসায় যেন জড়াতে না পারেন, সে ব্যবস্থা রাখা দরকার। তাহলেই পরিচালকরা ব্যাংক পরিচালনায় সচেতন হবেন।
সম্প্রতি চট্টগ্রামের এহসান গ্রুপের এমডি আবু আলম শেয়ার বিজকে বলেন, ‘ব্যবসায় লোকসানের কারণে আমি সময়মতো ন্যাশনাল ব্যাংকের কিস্তি দিতে পারিনি। ফলে ঋণখেলাপি হয়ে পড়ি। এতে আমাকে ফারমার্স ব্যাংকের পরিচালক পদ হারাতে হয়। তবে এরই মধ্যে আমি ন্যাশনাল ব্যাংককে বেশ কিছু টাকা পরিশোধের মাধ্যমে নিয়মিত গ্রাহকে পরিণত হয়েছি। এখন আমি উদ্যোক্তা পরিচালক হিসেবে ব্যাংকের সঙ্গে আছি।’
অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘এক ব্যাংকের পরিচালক অন্য ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে খেলাপি হলেও তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যায় না। ব্যাংক কোম্পানি আইনের ধারা-১৭ অনুযায়ী, এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার যে পদ্ধতি রয়েছে, তা বাস্তবসম্মত নয়। ওই ধারা অনুযায়ী কোনো ব্যাংকের পরিচালক ঋণখেলাপি হলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংককে অবহিত করবে এবং বাংলাদেশ ব্যাংক খেলাপি ওই পরিচালককে দুই মাসের মধ্যে যে ব্যাংকে পরিচালক হিসেবে আছেন সেই ব্যাংককে ওই খেলাপি পরিচালকের পদ বাতিলের নির্দেশ দেবে। এভাবে পরিচালক পদ থেকে অপসারণ একটি জটিল প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়। এরূপ ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সিআইবিতে (ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরো) তার নাম চিহ্নিত করার ব্যবস্থা থাকা দরকার। এ-ছাড়া হস্তান্তরযোগ্য দলিল আইনের ১৩৮ ধারায় উল্লিখিত অপরাধের জন্য জরিমানা ও সাজার পরিমাণও বাড়ানো প্রয়োজন।’

সর্বশেষ..