দিনের খবর প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

ব্যাংক সুদনির্ভর প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ

সাইফুল আলম, চট্টগ্রাম: দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) বিদায়ী ২০১৮-১৯ অর্থবছরে পাঁচ কোটি ৩৮ লাখ টাকা পরিচালন মুনাফা করতে সক্ষম হয়েছে। ওই অর্থবছরে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে মেয়াদি আমানতের (এফডিআর) সুদ বাবদ সিএসই আয় করেছে ৪৭ কোটি ৬৮ লাখ টাকা, যা প্রতিষ্ঠানটির পরিচালন মুনাফার আটগুণেরও বেশি। তবে এ ধরনের ক্ষণস্থায়ী আয়ে খুশি নন ট্রেকহোল্ডাররা। সময়মতো তারল্য সংকটে থাকা দুর্বল ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে আমানতের টাকা তোলা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেছেন তারা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মূলত সঠিকভাবে পরিচালনার ব্যর্থতা, ব্যবস্থাপনার অযোগ্যতা ও দক্ষ লোকবল ঘাটতির কারণেই ব্যবসায় ধারাবাহিক অবনতির কারণে সিএসই সুদ আয়ের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। সিএসই সূত্রে জানা যায়, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালন আয় ছিল ৩৪ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। এ সময়ে পরিচালন ব্যয় ছিল ২৯ কোটি ৩০ লাখ টাকা। এতে সংস্থাটির পরিচালন মুনাফা হয়েছিল প্রায় পাঁচ কোটি ৩৮ লাখ টাকা, যা আগের অর্থবছরে ছিল তিন কোটি ৬৫ লাখ টাকা।

অপরদিকে সিএসইর বিগত বছরগুলোর ধারাবাহিক মুনাফায় ৩৩টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে মোট ৪৪৬ কোটি টাকা জমেছে। এর পুরোটাই এফডিআর হিসেবে জমা আছে। এর মধ্যে এনসিসি ব্যাংকে ৩০ কোটি, আইএফআইসি ব্যাংকে সাড়ে ২৭ কোটি, মিউচুয়াল ব্যাংকে সাড়ে ২৭ কোটি, সাউথইস্ট ব্যাংকে ২৬ কোটি, আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকে ২৫ কোটি, মার্কেন্টাইল ব্যাংকে ২৪ কোটি, শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংকে সাড়ে ২১ কোটি, এক্সিম ব্যাংকে ২১ কোটি, যমুনা ব্যাংকে ২০ কোটি, ঢাকা ব্যাংকে সাড়ে ১৭ কোটি, ওয়ান ব্যাংকে ১৭ কোটি, ইউসিবিএলে ১৫ কোটি, প্রিমিয়ার ব্যাংকে ১১ কোটি, মধুমতি ব্যাংকে ১০ কোটি, ইউনিয়ন ব্যাংকে ১১ কোটি, ব্যাংক এশিয়ায় ১০ কোটি, সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার ব্যাংকে আট কোটি ৫০ লাখ, ব্র্যাক ব্যাংকে পাঁচ কোটি, ফার্স্ট সিকিউরিটিজ ইসলামী ব্যাংকে দেড় কোটি, এনআরবি ব্যাংকে এক কোটি ও এবি ব্যাংকে তিন কোটি টাকা এফডিআর রয়েছে সিএসই’র।

এছাড়া আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে আইডিএলসিতে ২০ কোটি, ফিনিক্স ফাইন্যান্সে সাড়ে ১৪ কোটি, লংকাবাংলা ফাইন্যান্সে ১৪ কোটি, ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ে ১৪ কোটি, ডেল্টা ব্র্যাক হাউজিংয়ে ১১ কোটি, বাংলাদেশ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানিতে ১০ কোটি, ইউনিয়ন ক্যাপিটালে ৯ কোটি, ইসলামী ফাইন্যান্সে পাঁচ কোটি, ইউনাইটেড ফাইন্যান্সে পাঁচ কোটি, প্রাইম ফাইন্যান্সে তিন কোটি ৫০ লাখ, আইপিডিসিতে দুই কোটি, মাইডাসে দুই কোটি, প্রিমিয়ার লিজিংয়ে দেড় কোটি ও ন্যাশনাল হাউজিংয়ে দুই কোটি টাকা এফডিআর রয়েছে সিএসই’র।

এই এফডিআরের বিপরীতে গত অর্থবছর সংস্থাটির সুদ আয় হয় ৪৭ কোটি ৬৭ লাখ ৬৮ হাজার টাকা, যা আগের অর্থবছরে ছিল প্রায় ৩৯ কোটি ১১ লাখ টাকা। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ৪৯০ কোটি ৫০ লাখ টাকা এফডিআর ছিল সিএসই’র। সে হিসেবে আগের থেকে এফডিআর কমেছে সিএসই’র।

সিএসইর ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুসারে, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের ৩২৬টি নিবন্ধিত কোম্পানি আছে। গত অর্থবছরে কোম্পানিগুলোর ২৪৭ কোটি ৪৬ লাখ ৭০ হাজার শেয়ার লেনদেন হয়। এর আগের বছরে ৩৫০ কোটি ৬০ লাখ দুই হাজার শেয়ার লেনদেন হয়েছিল। অর্থাৎ আগের বছরের শেয়ারের লেনদেন কমেছে ২৯ দশমিক ৪১ শতাংশ। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে কোম্পানিগুলোর লেনদেনকৃত শেয়ারের মূল্য ছিল আট হাজার ৪৮০ কোটি টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় ২২ দশমিক ৮০ শতাংশ কম। একই সময়ে সিএসই’র বাজার মূলধন ছিল তিন লাখ ২৯ হাজার ৩৩০ কোটি টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় পাঁচ দশমিক ৪৪ শতাংশ বেড়েছে।

জানা গেছে, এক দশক আগেও পুঁজিবাজারে লেনদেনের ১৪ শতাংশ ছিল সিএসইর দখলে। ধারাবাহিকভাবে তা কমে ২০১৮ সালে হয়েছে ছয় দশমিক ৩৯ শতাংশ। অপরদিকে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) পুঁজিবাজারে বাজার অংশীদারিত্ব ক্রমাগতভাবে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯৩ দশমিক ৬১ শতাংশে।

সিএসই’র ট্রেকহোল্ডারা বলছেন, ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা এবং যোগ্য ও দক্ষ লোকবল ঘাটতির কারণেই সিএসইর ব্যবসায় ধারাবাহিক অবনতি হচ্ছে। লেনদেনে ক্রমেই পিছিয়ে পড়ায় সিএসইর পরিচালন আয় ও মুনাফায় এর প্রভাব পড়ছে। কৌশলগত বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকেও সাড়া পাচ্ছে না দেশের দ্বিতীয় এই পুঁজিবাজারটি।

সিএসই একজন সাবেক পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে শেয়ার বিজকে বলেন, ‘সিএসই এখন ব্যাংক সুদনির্ভর প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। এ ধরনের আয় ক্ষণস্থায়ী। তাছাড়া কোনো কোনো ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে সঠিক সময়ে আমানতের টাকা তুলতে করতে পারবে কি না সন্দেহ আছে। ডিমিউচুয়ালাইজেশনের পর তো আরও অবস্থা খারাপ হয়েছে। এর জন্য তো পরিচালনা পর্ষদ দায়ী, তারা কী করছে?’

সাবেক ওই পরিচালক আরও বলেন, ‘সিএসই’র পরিচালকদের প্রতিষ্ঠানের লেনদেন কেমন দেখেন? তাদের অধিকাংশই এক দশক ধরে নিষ্ক্রিয়। একজন যোগ্য এমডি নিয়োগ দিতে পারছে না তারা। নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) অনেক ব্যর্থতা রয়েছে। তারা সিএসই ও ডিএসইকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে নানাভাবে বাধা সৃষ্টি করে।’    

সিএসইর ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক গোলাম ফারুক শেয়ার বিজকে বলেন, ‘সিএসই শুধু ব্যাংক সুদনির্ভর প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়নি। ব্যাংক সুদ আমাদের আয়ের অংশ। এটাকে আলাদাভাবে দেখার সুযোগ নেই। আমাদের মুনাফা বেড়েছে। ব্যবসা ভালো হচ্ছে। তবে ট্রেকহোল্ডারদের ব্যবসা ভালো হচ্ছে না। ট্রেকহোল্ডারদের অংশগ্রহণ কমেছে।’

সিএসই’র গতিশীলতা বাড়ানোর বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সিএসইকে প্রতিযোগিতামূলক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা ও প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। আমাদের যদি নেটিং সুবিধাটি দেওয়া হয়, তাহলে ইনকাম বর্তমানের চেয়ে তিনগুণ বাড়বে। এছাড়া স্মল ক্যাপ মার্কেট, ইটিএফসহ আরও অন্যান্য সেবা চালু করার জন্য আমরা প্রস্তুত আছি। আশা করছি আগামী বছর ভালো কিছু হবে।’

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..