দিনের খবর প্রচ্ছদ ফিচার শেষ পাতা

‘ব্যাট ওমেন’ কোথায়?


রতন কুমার দাস: ব্যাট ওমেনের বাংলা তরজমা হয়তো ‘বাদুড় মানবী’ হতে পারে। কিন্তু মারভেল সিরিজের কারণে জনপ্রিয় হয়ে ওঠা চরিত্রগুলো যেমন ব্যাটম্যান, ব্যাট ওমেন প্রভৃতি বাংলায় অনুবাদের চল নেই। তারা মূল নামেই আদৃত বাংলাভাষীদের কাছে।
তবে আলোচ্য ‘ব্যাট ওমেন’ মারভেল সিরিজের কোনো কমিকস কিংবা চলচ্চিত্রের পর্দা থেকে উঠে আসেনি। এ ধরাধামেরই মানুষ শি ঝেংলি যিনি চীনের নাগরিক। তিনি উহানের ভাইরোলজিস্ট বা ভাইরাসবিদ। তাকে বিশ্বের অন্যতম সেরা ভাইরাসবিদ বলা হয়। করোনাভাইরাস নিয়ে সেরা গবেষকদের একজন তিনি। সার্সের মতো প্রায় এক ডজন প্রাণঘাতী ভাইরাস আবিষ্কার করেছেন শি। ১৬ বছর ধরে বাদুড় নিয়ে গবেষণা করছেন তিনি। বিভিন্ন বাদুড়ের গুহায় দিনের পর দিন, রাতের পর রাত গবেষণা চালিয়েছেন। এসব কারণে ‘ব্যাট ওমেন’ তকমা পেয়েছেন।
করোনাভাইরাসের জিনও উন্মোচন করেছিলেন ‘ব্যাট ওমেন’। তার গবেষণালব্ধ ফল লুকিয়ে রেখেছে চীন দেশটির বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ উঠেছে। গত বছর চীনে অজ্ঞাত ভাইরাসে (করোনাভাইরাস) আক্রান্ত ব্যক্তিদের নমুনা নিয়ে কাজ করেন তিনি। ভাইরাসটি যে করোনা ও সার্স গোত্রের তা তিনি প্রকাশ করেন।
ভাইরাসটিকে নভেল করোনাভাইরাস হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। মাত্র তিন দিনে ব্যাট ওমেন এর জিনোম সিকোয়েন্সিং বা জিনের গঠন বিন্যাস করেন। কিন্তু তিনিসহ অন্য সব গবেষককে নতুন এ রোগের তথ্য প্রকাশ না করার নির্দেশ দেওয়া হয়। বলা ভালো, মুখ বন্ধ রাখার আদেশ দেওয়া হয়।
করোনাভাইরাস নিয়ে চীনের রাখঢাক, লুকোচুরি, তথ্য প্রকাশে অনীহা বিশ্ববাসীর নজরে আসে। তারা এটিকে মামুলি রোগ বলে উড়িয়ে দেয়; অথচ দেশটি জরুরি অবস্থা জারি করে উহানে, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে রাখে প্রায় দুই মাস। তারপরও রক্ষা পায়নি দেশটি। সঙ্গে আক্রান্ত হতে থাকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ। তথ্য আড়ালের কারণে সম্প্রতি এ অভিযোগের তীর নতুন করে ছোড়া হয়েছে চীনের দিকে।
চীনের সাংবাদিক জাও ইয়ু শি ঝেংলির সঙ্গে কথা বলেছিলেন। তখন অবশ্য ব্যাট ওমেন অবরুদ্ধ ছিলেন উহানে। তিনি জাওয়ের কাছে অভিযোগ করেছিলেন, আমার আবিষ্কার ধামাচাপা দেওয়া হয়েছে। জাও বলেন, আমরা জানতে পারি, শি গবেষণা সম্পন্ন করেন। ২ জানুয়ারি এ-সংক্রান্ত একটি পরীক্ষাও (টেস্ট) করেন; কিন্তু সব চেপে রাখার আদেশ জারি করা হয়। এক সপ্তাহ ধরে গুমোট পরিস্থিতি বিরাজ করে। পরে উহান ইনস্টিটিউট অব ভাইরোলজির পরিচালক ইয়ানি ওয়াং কর্মীদের কোনো তথ্য প্রকাশ করা থেকে বিরত থাকার আদেশ দেন।

কদিন পর চিকিৎসকরা স্থানীয় অধিবাসীদের নতুন ভাইরাসটি সম্পর্কে সতর্ক করতে থাকেন। ফলে তাদের কারারুদ্ধ করে রাখা হয়। এ প্রসঙ্গে পরিচালক ইয়ানি বলেন, ‘অনুপযুক্ত’ ও ‘ভুল তথ্য’ ছড়িয়ে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়ানোর অভিযোগে তাদের কারাগারে প্রেরণ করা হয়েছে। তিনি গণমাধ্যমের সামনে কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ-সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন।
সপ্তাহখানেক পর সাংহাইয়ের কজন গবেষক একটি ‘ওপেন অ্যাকসেস’ প্ল্যাটফর্মে তাদের গবেষণা তুলে ধরেন। এখানে তারা একজন আক্রান্ত ব্যক্তির নমুনায় নতুন করোনাভাইরাসের উপস্থিতি দেখান। এর দুদিনের মাথায় তাদের গবেষণাগারটি সংশোধন বা শুদ্ধিকরণের উদ্দেশ্যে বন্ধ করে দেওয়া হয়। প্রসঙ্গত, ওপেন অ্যাকসেস প্ল্যাটফর্মে যে কোনো গবেষক বিনা খরচে তার প্রকাশনা প্রকাশ করতে পারেন, এটি বিশ্বস্বীকৃত।
গত বছরে ডিসেম্বরের মাঝামাঝিতে করোনাভাইরাসের প্রথম রোগী পাওয়া যায়। তিনি উহানের বণ্যপ্রাণী কেনাবেচার বাজারে কাজ করতেন। ধারণা করা হয়, করোনাভাইরাস এ বাজার থেকে ছড়িয়েছে। যাহোক, আক্রান্ত ব্যক্তিকে মধ্য চীনের একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তার শ্বাসযন্ত্রে মারাত্মক ইনফেকশন বা সংক্রমণ ছিল। ফ্লু ধারণা করে চিকিৎসা দেওয়া হলেও ব্যর্থ হন ডাক্তাররা। ২৭ ডিসেম্বর উহানের সরকারি স্বাস্থ্য বিভাগ নতুন করোনাভাইরাসের আগমন হয়েছে বলে তথ্য প্রকাশ করে।
তিন দিন পর দুজন ডাক্তার লি ওয়েলিয়াং ও এই ফেন উইচ্যাট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন ভাইরাস নিয়ে পোস্ট দেন। লিকে গুজব ছড়ানোর অভিযোগে সতর্ক করে পুলিশ। পরে তিনি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হন এবং মৃত্যুবরণ করেন ফেব্রুয়ারিতে। আর এই ফেন গুম হয়ে যান। তিনি একটি গণমাধ্যমে প্রশাসনের কড়া সমালোচনা করেন।
একই সঙ্গে করোনাভাইরাসের প্রকোপ সম্পর্কে আগাম বার্তা প্রকাশের দায়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সুযোগ-সুবিধা কমিয়ে দেওয়া হয়। গুম হওয়ার আগে চীনা ম্যাগাজিন রেনইয়ুকে ফেন বলেছিলেন, সুপারভাইজার ও সহকর্মীদের নতুন করোনাভাইরাস সম্পর্কে অবহিত করার জন্য লাঞ্ছিত হয়েছি।
১ জানুয়ারি ৩০ ব্যক্তির দেহে করোনার উপস্থিতি পায় উহানের স্বাস্থ্য বিভাগ। বণ্যপ্রাণী কেনাবেচার বাজারটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। এর সঙ্গে বন্ধ হয়ে যায় প্রায় ৭৬ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য, কাজ হারায় প্রায় এক কোটি চার লাখ মানুষ। তবে ব্যাট ওমেন সরাসরি বাজারটির দোষ দেখতে পাননি। একই দিনে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (হু) স্থানীয় অফিসে রহস্যময় রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের সম্পর্কে জানানো হয়।
এরপর পাল্টে যেতে থাকে চীনের দৃশ্যপট। প্রভাব পড়ে প্রতিবেশী দেশগুলোয়। ওই সময়ে চীনের বাইরে প্রথম রোগী পাওয়া যায় থাইল্যান্ডে। যুক্তরাষ্ট্রেও একজন রোগী পাওয়া যায়। তবু চীন তথ্য গোপন করে; নতুন কোনো রোগী নেই উহানে বলে তথ্য প্রকাশ করে। অথচ উহানের পর হুবেই প্রদেশের আরও কয়েকটি স্থানে ছড়িয়ে পড়ে করোনাভাইরাস। ইউরোপেও সে প্রকোপ আছড়ে পড়ে।
চীনা কর্তৃপক্ষ তাদের গোঁ ধরে রাখে। মানুষ থেকে মানুষে এ রোগ ছড়িয়ে পড়ার কোনো ‘স্পষ্ট প্রমাণ’ নেই বলে প্রচার চালিয়ে যেতে থাকে। তবে তারা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে; হাসপাতালগুলো রোগীতে সয়লাব হয়ে যায়। আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা হুহু করে বাড়তে থাকে।
কদিনের মধ্যে চীনের প্রধান শাসন বিশেষজ্ঞ ডা. ঝং নানশ্যান রোগটি মানুষ থেকে মানুষে ছড়ানোর বিষয়টি প্রকাশ করেন। ২৩ জানুয়ারি উহান লকডাউন করা হয়; পরদিন ছিল দেশটির নতুন বছরের ছুটির দিন। এ কারণে উহানের লাখ লাখ মানুষ কোনো পরীক্ষা ছাড়াই দেশটির বিভিন্ন প্রান্তে পাড়ি জমায়।
কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ভাইরাসটি দেশ থেকে দেশে ছড়িয়ে পড়ে। এখন বিশ্বের প্রায় সব দেশ ও অঞ্চল আক্রান্ত এ রোগে। চীনের বাইরে অনেক দেশে লকডাউন, কারফিউ চলছে; অথচ উহানের লকডাউন উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে (প্রায় ৭০ দিন পর)। এখন চীন বাদে প্রায় সব দেশে অস্বাভাবিক পরিস্থিতি বিরাজ করছে। দেশটিতে এখন স্থানীয় পর্যায়ে রোগী বাড়ছে না, বাইরে থেকে আসা রোগীদের মাধ্যমে কিছুটা ছড়াচ্ছে। বিদেশ থেকে আসা ব্যক্তিদের জন্য অনেক প্রদেশে ২৮ দিনের বাধ্যতামূলক কোয়ারেন্টাইন চালু করেছে। এর মধ্যে কোয়ারেন্টাইন সেন্টারে ১৪ দিন, পরের ১৪ দিন ঘরে থাকতে হচ্ছে। চীন বর্তমানে বিভিন্ন দেশে করোনা পরিস্থিতি সামলাতে আগ্রহী।
৫৫ বছর বয়সী ব্যাট ওমেন পড়ালেখা করেছেন উহান ইউনিভার্সিটিতে। পরে উহান ইনস্টিটিউট অব ভাইরোলজিতেও পড়াশোনা করেন। কাজ করতেন এখানেই। বেশ কদিন ধরে তাকে প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। তার গবেষণাও আড়ালে রয়ে গেছে। অথচ এর মধ্যেই হয়তো করোনাভাইরাসের পরীক্ষা, ওষুধ ও টিকার রহস্য লুকিয়ে রয়েছে।
উহানে বাদুড়বাহিত রোগের উপস্থিতি নিয়ে সন্দিহান ছিলেন ব্যাট ওমেন। তার গবেষণায় দেখা গেছে, চীনের দক্ষিণাঞ্চলীয় গুয়াংডং, গুয়াংঝি ও ইউনান করোনাভাইরাস ঝুঁকিতে রয়েছে। এ অঞ্চলে প্রাণী থেকে মানুষে বিশেষ করে বাদুড় থেকে করোনা ছড়াতে পারে, উহান থেকে নয়। তাহলে কি ল্যাব (পরীক্ষাগার) থেকে দুর্ঘটনাক্রমে ছড়িয়েছে ভাইরাসটি, শঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
বনরুই কিংবা বণ্যপ্রাণী কেনাবেচার বাজার থেকে করোনাভাইরাস ছড়িয়েছে কি না, সে তত্ত্ব বাদ দিয়ে ব্যাট ওমেন ও তার গবেষণা উন্মুক্ত করার আরজি জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। অনেকের ধারণা, উহানের বন্যপ্রাণী কেনাবেচার বাজার থেকে ছড়িয়েছে করোনা। প্যাঙ্গোলিন বা বনরুই থেকে করোনাভাইরাস এসেছে বলে মনে করেন অনেকে। স্তন্যপায়ী প্রাণী বনরুই চোরাইপথে পাচার হয়ে থাকে। এর মাংস চীনাদের কাছে ভীষণ প্রিয়। এর গায়ের আঁশ দিয়ে ওষুধ তৈরি করা হয়। চীনে পাচার হওয়া বনরুইয়ের মধ্যে দুই ধরনের করোনাভাইরাস পাওয়া গেছে, যা বর্তমান মহামারির সঙ্গে সম্পর্কিত। এর সঙ্গে যোগ হতে পারে হর্সশু প্রজাতির বাদুড়। তবে ঠিক কীভাবে ভাইরাসটি এসব জন্তুর দেহ থেকে অন্য প্রাণীর দেহে; আবার মানুষ থেকে মানুষে কিংবা সরাসরি মানুষের দেহে এসেছে তা অমীমাংসিত রয়ে গেছে। অবশ্য ব্যাট ওমেনের কাছে পাওয়া যাবে সঠিক তথ্য এমন অভিমত বিশ্বের তাবৎ বিজ্ঞানীর।


সায়েন্টিফিক আমেরিকান অবলম্বনে

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন
ট্যাগ ➧

সর্বশেষ..